• Tuesday, October 24, 2017
logo
add image
চসিকের কর নিয়ে ফুঁসে উঠছে চট্টগ্রামবাসী

চসিকের কর নিয়ে ফুঁসে উঠছে চট্টগ্রামবাসী

জুবায়ের সিদ্দিকী:: চট্টগ্রাম নগরীর ভুমি মালিকরা সিটি কর্পোরেশনের শেষ হওয়া এসেসমেন্ট (গৃহ মুল্যায়ন) বাতিল করতে সাতদিনের আল্টিমেটাম দিয়েছে। দাবী না মানলে নগর ভবন (মেয়র কার্যালয়) ঘেরাও এবং পরবর্তীতে চট্টগ্রাম শহর অচলেরও হুমকি দেন তারা। গত ২৯ সেপ্টেম্বর শুক্রবার নগরীর কতমতলী আবুল খায়ের মেম্বারের বাড়ির সামনে আয়োজিত গন সমাবেশ থেকে এ হুমকি দেওয়া হয়। চট্টগ্রাম করদাতা সুরক্ষা পরিষদের ব্যানারে এ গনসমাবেশ অনুষ্টিত হয়। বিকাল ৩টায় শুরু হয় সমাবেশ। চলে একটানা সাড়ে চারটা পর্যন্ত।

সমাবেশ শেষে নগরীর বিভিন্ন সড়কে বিক্ষোভ করেন তারা। সমাবেশে চসিকের বর্তমান পর্ষদের কাউন্সিলর (এনায়েত বাজার ওয়ার্ড) মোহাম্মদ সলিম উল্লাহ অংশ নেন। তবে তিনি মঞ্চে উঠেননি এবং বক্তব্য দেননি। সমাবেশে অংশ নিয়ে এনায়েত বাজার ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আবদুল খালেক বলেন, সাবেক মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে গতকাল কথা হয়েছিল। এলাকার সাবেক কাউন্সিলর হিসেবে কথা বলেছি। বলেছেন, তাকে আমরা সাবেক কাউন্সিলররা এবং এলাকার পক্ষে যদি স্মারকলিপি দিই, তাহলে সেই স্মারকলিপির ভিত্ত্বিতে তিনি গনজমায়েত করবেন। জানতে চাইলে কাউন্সিলর সেলিম উল্লাহ বলেন,’ আমি মঞ্চে উঠিনি। এলাকায় ছিলাম। এলাকার লোকজনকে বলেছি আপীল করার জন্য।

সমাবেশ থেকে করদাতা সুরক্ষা পরিষদের নেতৃবৃন্দ চসিকের কাছে চার দফা দাবী জানানো হয়। এগুলো হ”েছ, পৌরকর আদায়ে সদ্য গেজেট হওয়া এসেসমেন্ট বাতিল করা, এসেসমেন্ট করার সময় ভাড়ার ভিত্ত্বিতে যে কর নির্ধারন করা হয়েছে তা বাতিল করে পুর্বের ন্যায় বর্গফুটের ভিত্ত্বিতে মুল্যায়ন করে কর পুননির্ধারন করা। সমাবেশ থেকে এসেসমেন্টে জড়িত কর্মকর্তারা অনিয়ম করেছেন দাবী করে তাদের অনিয়ম ও দুর্নীতি তদন্তে কমিটি গঠনেরও দাবী জানানো হয়। সমাবেশ থেকে চতুর্থ দাবী জানানো হয়, নগরীর বেহাল সড়কগুলোর দ্রুত মেরামত শুরু করা। দাবী আদায়ে কর্পোরেশনকে সাতদিনের সময় দিয়ে বিভিন্ন কর্মসুচী ঘোষনা করেন করদাতা সুরক্ষা পরিষদের সচিব অধ্যাপক আমীর উদ্দিন।

কর্মসুচীর মধ্যে রয়েছে, প্রথম দফায় আগামী ৮ অক্টোবর সকাল ১০ টায় উত্তর পাঠানটুলি, উত্তর আগ্রাবাদ, দক্ষিণ আগ্রাবাদ, পাঠানটুলী, পশ্চিম মাদারবাড়ি এবং গোসাইলডাঙ্গা ওয়ার্ডের কাউন্সিলর অফিস ঘেরাও। ওয়ার্ড কাউন্সিলর কার্যালয় ঘেরাও কর্মসুচীর মধ্যে দাবী আদায় না হলে চসিকের ৮টি রাজস্ব সার্কেল অফিস ঘেরাও করার ঘোষনা দেন তিনি। তিনি বলেন, দাবী আদায় না হলে নগর ভবন ঘেরাও করা হবে। প্রয়োজনে চট্টগ্রাম অচল করে দেব। আমরা দেখিয়ে দিতে চাই, আন্দোলনের মাধ্যমে দাবী আদায় সম্ভব। তিনি সংবাদ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে রাজস্ব সার্কেল অফিস ঘেরাও সহ অন্যান্য কর্মসচুী জানিয়ে দেওয়া হবে বলে সমাবেশে ঘোষনা দেন। এতে সভাপতিত্ব করেন পরিষদের সভাপতি নুরুল আবছার। বক্তব্য রাখেন আনোয়ারুল কবির, কাজী শহিদুল হক। সঞ্চালনা করেন হাসান মারুফ রুমী। নুরুল আবছার মেয়রকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনি পিএম (প্রধানমন্ত্রী) বলুন, এই ট্যাক্স দিতে পারব না।

এ সময় তিনি বলেন, সোজা আঙ্গুলে ঘি না উঠলে আঙ্গুল বাঁকা করতে হয়। তিনি ভবন মালিকদরে উদ্দেশ্য করে বলেন,’ আপনারা ঘুমিয়ে থাকলে হবে না। সন্তানদের জন্য জায়গা রেখে যাচ্ছেন। এগুলোকে বাঁচাতে হবে তো। এ সময় তিনি পরবর্তী আন্দোলন চালানোর জন্য ওয়ার্ড পর্যায়ে কমিটি গঠন, মানববন্ধন এবং গনঅনশন করার আহবান জানান। মো: রহিম উল্লাহ বলেন, গলাকাটা ট্যাক্স ধার্য করা হয়েছে। যতক্ষন পর্যন্ত পুর্বের ন্যায় ট্যাক্স ধার্য করা হবে না, ততক্ষন পর্যন্ত দেব না। খুরশিদ আলম বলেন,’ অবৈধ এসেসমেন্টের মাধ্যমে ট্যাক্স নগরবাসীর উপর চাপিয়ে দিয়েছেন। আমরা মেয়রকে বাধ্য করব এই ট্যাক্স বাতিল করতে। হাসান মারুফ রুমী বলেন, সুশৃঙ্খলভাবে আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে। কোন উস্কানীতে আমরা পা দেব না।

এই আন্দোলন বন্ধ করার জন্য মেয়রের পক্ষ থেকে ষড়যন্ত্র হবে। কিš‘ আমরা দৃড় থেকে এবং সাংগঠনিক প্রজ্ঞা নিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাব। দাবী আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাব। গনজোয়ারে আমরা অসাধ্যকে সাধন করেছি অতীতে। এবারও করব। সমাবেশে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের ব্যনারেও ভবন মালিকরা অংশ নেন। বক্তারা বলেন, সকলের আপত্তি উপেক্ষা করে চসিক জবরদস্তিমুলক হোল্ডিং ট্যাক্স আদায়ের জন্য এসেসমেন্ট সম্পন্ন করে গেজেট প্রকাশ করেছে। এ এসেসমেন্ট মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত নাগরিকের মাথায় বজ্রপাতের শামিল।

কর নির্ধারনের প্রচলিত পদ্ধতি বাদ দিয়ে ভাড়ার উপর এসেসমেন্ট করার কারনে হোল্ডিং ট্যাক্স অসহনীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বক্তারা আরও বলেন, চট্টগ্রাম শহরের অধিকাংশ সড়ক বর্ষা আর জোয়ারের পানিতে ডুবে থাকে। রাস্তঘাটের বেহাল দশা। যানজটে নাকাল নগরবাসীর জীবন। ড্রেনের ময়লা পানি পেরিয়ে কোমলমতি শিশুরা স্কুলে যায়। এ দৃশ্য বড়ই অমানবিক। নাগরিকদের জাহান্নামে ঠেলে দিয়ে, নুন্যতম নাগরিক সুবিধা না বাড়িয়ে গলাকাটা করারোপ মরার উপর ঘাঁড়ার ঘার শামিল। আগ্রাবাদের বাসিন্দা হাজী আবদুল হালি জানান, তার ৫ তলা বিশিষ্ট দুটি ভবন। একটিতে আগে এসেসমেন্ট ভেলু ছিল ৪০ হাজার টাকা। নতুন এসেসমেন্টে তা হয়েছে ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা। আরেকটি ভবনের ভেলু ছিল ৬০ হাজার টাকা।

এটি বর্তমানে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করা হয়েছে। এই ভবনটির বিপরীতে ৭৮ লাখ টাকার ব্যাংক ঋন রয়েছে তার। মহুরী পাড়ার বাসিন্দা মো: সোলাইমান জানান, তার ৫ তলা বিশিষ্ট ভবনের সাবেক ভেলু ছিল ৪০ হাজার টাকা। যা বর্তমানে ৬ লাখ ৩৩ হাজার টাকা করা হয়েছে। সেমিপাকা ভবনের মালিক আলাউদ্দিন বলেন,৭ হাজার টাকার ¯’লে ৭২ হাজার টাকা হয়েছে এসেসমেন্টে। রিপন বলেন,আমাদের ভবনের ভেলু ছিল ৩২ হাজার টাকা। নতুন এসেসমেন্ট হয়েছে ৬ লাখ ৭২ হাজার টাকা।

এ অবস্থায় নগরীর সব বাড়ির মালিকের। ধনী দরিদ্র সবার কাধে চাপানো হয়েছে অযৌক্তিক ও অমানবিক ট্যাক্সের বোঝা। নগরীর এক তৃতীয়াংশ মানুষ বছরের ছয়মাস থাকেন পানিবন্ধী। জনদুর্ভোগ-দুর্দশার শীর্ষে থাকা এই চট্টগ্রাম শহরের অর্থেকের বেশি ওয়ার্ডের ভাড়াঘর ছয়মাস ধরে খালী পড়ে আছে। অপেক্ষাকৃত নিম্নাঞ্চলের ভুমি মালিকদের অবস্থায় সবচেয়ে করুন। না পারছে বাসাবাড়িতে থাকতে, না পারছে ছেড়ে যেতে। ছয়মাসের জনদুর্গতি লাগবে কোন কাজ করতে পারেনি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন। জলাবদ্ধতা স্থায়ী হয়েছে শহরে।

প্রতিদিন জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হচ্ছে শহরের অনেক এলাকা। রাস্তাঘাটের চিত্র সবচেয়ে খারাপ। এ অবস্থায় চসিকের যুক্তিহীন ট্যাক্স আরোপে ক্ষুদ্ধ হয়ে উঠেছে মানুষ। অধিকাংশ ভুমি মালিকরা ফের গৃহকর ইস্যুতে ফুঁসে উঠছে। তাদের মতে, পৌরকর আদায়ের লক্ষ্যে সম্প্রতি শেষ হওয়া চসিকের এসেসমেন্ট করের পরিমান পুর্বের চেয়ে অস্বাভাবিকহারে বাড়ানো হয়েছে। ভবন মালিকরা বলছেন, ৫ বছর পুর্বে এসেসমেন্ট করার সময় বর্গফুটের মুল্যায়ন ভিত্তিক জেনারেল এসেসমেন্টের মাধ্যমে করের যে আওতা বাড়িয়েছিলেন সাবেক মেয়রগন নতুন মুল্যায়নে তা ফলো করা হয়নি। নতুন মুল্যায়নে ভবন ভাড়া দিলে কত আয় হতো সে হিসেব করে কর ধার্য করা হয়েছে। মুলত এই কারনেই করের পরিমান পুর্বের তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে।

তবে চসিকের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের দাবী, ইচ্ছে করে কর বাড়ানোর সুযোগ কর্পোরেশনের নেই। আইন মেনেই কর ধার্য করা হয়েছে। এসেসমেন্ট শেষে প্রস্তাবিত ভ্যালুর বিষয়ে কারো আপত্তি থাকলে আপিল করার সুযোগ আছে। সুত্র মতে, পঞ্চবার্ষিকী কর পুর্নমুল্যায়ন শেষে তা গত ৩১ আগষ্ট জনস্মুখে প্রকাশ করা হয়। করো আপত্তি থাকলে করদাতাদের ৩ অক্টোবরের মধ্যে আপিল করতে আহবান জানানো হয়। যার প্রেক্ষিতে চসিকের ৮টি রাজস্ব সার্কেলের বিপরীতে ১২ হাজার ৮৯৬টি আপিল আবেদন জমা পড়েছে। এদিকে নগরবাসীর কথা বিবেচনা করে করদাতাদের আপিলের সময়সীমা ৩ মাস বৃদ্ধির জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রনালয়ে অনুমতি চেয়ে চিঠি দিয়েছে চসিক। এদিকে এসেসমেন্ট শুরুর পর থেকেই কর বাড়ানোর অভিযোগ উঠেছিল বিভিন্ন মহল থেকে। সাবেক মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীও অভিযোগ করেছেন। সর্বশেষ এসেসমেন্ট কর ধার্যের পর হোল্ডিং মালিকদের নোটিশ দিয়েছে চসিক।

এর পর থেকে অসন্তোষের মাত্রা বাড়তে শুরু করেছে। তাদের অভিযোগ, যাদের ভাড়াঘর নেই এবং নিজেরা বসবাস করেন, তাদের বাসাবাড়িও ভাড়ার টাকা হিসেবে মুল্যায়ন করা হয়েছে। এদিকে, সম্প্রতি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে দেয়া স্থানীয় সরকার মন্ত্রনালয়ের চিঠিতে বলা হয়েছে,’ সিটি কর্পোরেশন (কর ) বিধি ১৯৮৬ এর ১৯ এবং ২০ মুলে সিটি কর্পোরেশনের অধীক্ষেত্রে ভুমি ও ইমারত সমুহের বার্ষিক মুল্য নির্ধারন (এসেসমেন্ট) এর বিধান রয়েছে।

উক্ত বিধিমালার বিধি ২১ অনুযায়ী প্রতি ৫ বছর পর এসেসমেন্ট হালনাগাদের বাধ্যবাদকতা রয়েছে। আদর্শ কর তফসিল ২০১৬ অনুযায়ী হোল্ডিং কর ও অন্যান্য ফি সমুহ আরোপ করা হয়। যা সিটি কর্পোরেশনের রাজস্ব আয়ের প্রধান উৎস। মন্ত্রনালয়ের নির্দেশিত বিধি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বিধি ১৯ এ বলা হয়েছে, ভবন ও ভুমির উপর কর এবং বিদ্যুতায়ন রেইট এবং আবর্জনা অপসারন রেইট আদায় করতে পারবে সিটি কর্পোরেশন। বিধি ২০ এ বলা হয়েছে, বাৎসরিক মোট ভাড়া হতে দুই মাসের ভাড়া বাদ দিয়ে বার্ষিক মুল্য নির্ধারন করতে হবে। ভবনের বিপরীতে ব্যাংক ঋনের সুধ থাকলে তা বাৎসরিক মুল্যায়ন থেকে বাদ যাবে। সুত্র মতে, এসেসমেন্ট শেষে নগরীতে মোট হোল্ডিং রয়েছে ১ লক্ষ ৮৫ হাজার ২৪৮টি।

যা পুর্বের তুলনায় ২৮ হাজার ৭০২টি বেশি। এসেসমেন্ট হোল্ডিং গুলোর বিপরীতে চলতি অর্থ বছরে ৫৫৯ কোটি টাকা পৌরকর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারন করা হয়েছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে আদায় হয়েছিল ১০৩ কোটি ৪৪ লাখ ১৮ হাজার ৫৩৭ টাকা। ভুমি মালিকদের অভিযোগ, বিগত দিনে কোন মেয়রের আমলে এমন উ”চহারে করের বোঝা চাপানো হয়নি। বর্তমান মেয়র আইনের দোহায় দিচ্ছেন, তবে কি বিগত দিনের কোন মেয়রই আইন মানেননি !

Leave a reply