• Tuesday, October 24, 2017
logo
add image
মিয়ানমারে হত্যাযজ্ঞের এক আদীম উৎসব

মিয়ানমারে হত্যাযজ্ঞের এক আদীম উৎসব

জুবায়ের সিদ্দিকী : বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর প্রতিবেশি রাষ্ট্র হচ্ছে মিয়ানমার। এ দেশটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীন অনেক সমস্যার অন্যতম কারন। লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা অধিবাসীকে নিজ দেশ ত্যাগ করে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য করেছে সে দেশের সরকার ও সেনাবাহিনী। ৭০’এর দশক থেকেই রোহিঙ্গাদের উপর অত্যাচার-নির্যাতন চলছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে শরনার্থী হয়ে তাদের অনুপ্রবেশ তখন থেকেই। চিন, রাশিয়া, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও তুরস্ক সহ বড় দেশগুলোর তাগিদে এই উদ্বাস্তু জাতির বাসস্থানের দায় চেপেছে বাংলাদেশের উপর।

ইতিহাস ঘেঁটে যানা যায়, ১৯৮৯ সালে ইউনিয়ন অব বার্মা থেকে ইউনিয়ন অব মিয়ানমারে পরিবর্তিত হয়। বার্মা নামটি এসেছে দেশটির সর্ববৃহৎ সম্প্রদায় বামার থেকে। দেশটির রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে উগ্রপন্থী বৌদ্ধ বিক্ষুদের দাম্ভিকতা মিয়ানমার এককালে একাধিক ছোট ছোট স্বাধীন রাষ্ট্রে বিভক্ত ছিল। ১০৪৪ সালে রাজা অনরথ পাগান নামক রাষ্ট্রের সিংহাসনে বসেন। তিনি ছোট ছোট রাষ্ট্রগুলোকে একত্রিত করে একচ্ছত্র রাজত্ব প্রতিষ্টা করেন। বাগান প্রদেশটি হয় তার রাজধানী। উগ্র বৌদ্ধধর্মে অনুরক্ত এই রাজা শহর জুড়ে মন্দির ও গ্যাগোডা নির্মান করেন।

ত্রয়োদশ শতকের শেষের দিকে পাগান রাজত্ব ভেঙ্গে পড়ে। ১৬৩৫ সালে রাজা থালুন দেশটি দখল করেন। এরপর কংবং রাজবংশের রাজা বোধপোয়া ও তার নাতি অলংপায়া বার্মার সফল শাসক ছিলেন। নিরবিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বার্মায় কখনও ছিল না। যার সুযোগ নিতে ভুল করেনি দখলবাজ ব্রিটিশরা। ৬০ বছরে ৩টি অ্যাংলো বার্মিজ যুদ্ধের পর ১৮৮৬ সালে বার্মাকে ব্রিটিশ শাসনের অধীনে ভারতের অংশ করা হয়। ব্রিটিশরা বিভিন্ন গোষ্ঠিতে বিভক্ত বার্মার জনগনকে নিয়ন্ত্রনে রাখতে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়কে সামরিক ও স্থানীয় প্রশাসনে নিয়োগ দিতে থাকে। সংখ্যালঘুদের বিডম্বনা সেখান থেকেই। গত শতাব্দীর বিশের দশকে বার্মার সুশীল সমাজ ও বৌদ্ধ ভিক্ষুরা ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে।

সংসার ত্যাগী বৌদ্ধ ভিক্ষুদের দেশ রাজনীতি নিয়ে মাতামাতি তখন থেকেই। ১৯৩৫ সালে রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইউনিয়নের যোগদানে এই আন্দোলন হয় আরও গতিশীল। এ সময় অং সান নামে এক তরুনের উত্থান ঘটে। তিনি ছিলেন আইনের ছাত্র, ছাত্র ইউনিয়নের কার্যকরী সদস্য ও ম্যাগাজিন সম্পাদক। সফল ছাত্র ধর্মঘট ও প্রানবন্ত বিক্ষোভ কর্মসুচীর মাধ্যমে অংসান পুরো জাতির সমর্থন অর্জন করে। ১৯৩৮ সালে তিনি রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করে রাজনৈতিক দলে যোগ দেন। অং সান কে বলা হয় বার্মিজ জাতীয়তাবাদী প্রথম নেতা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে অং সান ২৯ জন সহচরকে নিয়ে জাপানে গিয়ে সামরিক প্রশিক্ষন নেন। এরা ’থার্টি কমরেডস’ নামে পরিচিত।

জাপানিরা অংসানকে প্রতিশ্রুতি দেয় যে, তারা ব্রিটিশদের পরাজিত করতে সক্ষম হলে বার্মার স্বাধীনতা হস্তান্তর করবে। জাপানের পক্ষ হয়ে অং সান বিট্রিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন! কিন্তু মত পরিবর্তন করে বিচক্ষন অং সান জাপানকে পরাজিত করার জন্য ব্রিটিশদের সহযোগিতা দেবার জন্য চুক্তি করেন। শর্তা থাকে বার্মার পুর্ন স্বাধীনতা। অং সানের পেছনে বার্মাবাসীর সমর্থন ছিল। যদিও কিছু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কাছে তিনি বিতর্কিত ছিলেন। তিনি নিয়মিত বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাত করতেন এবং বার্মার অধিবাসীদের মধ্যে ঐক্য স্থাপনে সচেষ্ট ছিলেন। ব্রিটিশদের প্রশ্রয়ে বার্মায় রাজনৈতিক দলগুলো জাতীয় নির্বাচনে যায়। অং সানের গঠিত এএফপিএফএল বিপুল সংখ্যগরিষ্টতা লাভ করে।

বিরোধী দল স, মাও ও তুন এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন বয়কট করে। বিজয়ী দলের নেতা অং সান নতুন সংবিধান প্রনয়ন শুরু করেন। ১৯৪৭ সালের ১৯ জুলাই একটি অরক্ষিত সভায় অংসান সহ পরিষদের ৬ সদস্যকে গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেয় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। এর পর অংসানের কেবিনেট সদস্য ইয়ু ন্যুকে অংসানের শুন্যস্থানে বসানো হয়। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারী বার্মা শেষ পর্যন্ত স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষিত হয়। কুসংস্কারাচ্ছন্ন, বিদেশী বিদ্বেষী ও নির্দয় নে উইন পরবর্তী তিন দশকে উন্নয়নশীল বার্মাকে পরিবেশ, সংস্কৃতি ও অর্থনীতি সবদিক দিয়ে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যান। ১৯৮৮ সালের জুলাইয়ে নে-উইন ঘোষনা দেন যে তিনি ক্ষমতা ছাড়বেন। মুক্তির আশায় রেঙ্গুনের রাস্তায় জনতার ঢল নামে।

সবাইকে অবাক করে দিয়ে ৮ জুলাই সেনাবাহিনী নারী পুরুষ ও শিশুদের উপর নির্বিচারে গুলি চালায়। ঘটনায় মাত্র ৪ দিনে ১০ হাজার মানুষ নিহত হয়। অনেকে সীমান্তবর্তী এলাকায় পালিয়ে যায়। অশান্ত অবস্থায় বার্মায় স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা অং সানের কন্যা অং সান সুচি অসুস্থ মাকে দেখতে দেশে আসেন। তিনিও রাজনীতিতে পা রাখেন। সুচির জনপ্রিয়তা দেখে জান্তা তাকে তাকে গৃহবন্দী করা করেন। ১৯৯০ সালের ২৭ মে প্রতিশ্রুত নির্বাচনে সুচির দল ৮২ ভাগ ভোট পেয়ে জয়ী হন। কিন্তু সামরিক জান্তা ক্ষমতা ছাড়তে অস্বীকৃতি জানায়। আমেরিকা ও বৃটেনের চাপের মুখে ২০১০ সালে সুচি মুক্তি পান।

বার্মায় সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা জাতির মানুষদের উপর অত্যাচার নিপীড়ন চলছে গোড়া থেকেই। এর পেছনে মুল কারন তাদের বহিরাগত ভাবা। ১৯৩০ সালে বৃটিশ শাসনামরে আরাকানে যে লোক গননা হয়, তাতে দেখা যায় জনসমষ্টির শতকরা ৩৬ ভাগ হল মুসলমান। রোহিঙ্গাদের মধ্যে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক এবং ভারতের বিভিন্ন প্রাদেশিক ভাষার প্রভাব রয়েছে।

সেনাবাহিনী ও সংখ্যাগুরু বার্মীজদের গনহারে হত্যা, ধর্ষন, জ্বালাও-পোড়াও এর কারনে রোহিঙ্গারা নিজ দেশ থেকে বিতাড়িত। এ অপকর্মে গনতন্ত্রের নেত্রী নামধারী সুচি রোহিঙ্গা ইস্যুতে একদম চুপ। বর্তমান অবস্থা সবচেয়ে ভয়াবহ। স্বামীকে বেঁধে স্ত্রীকে গনধর্ষনের পর গাছের সঙ্গে বেঁধে আগুন লাগিয়ে দেয়া, ধারালো অস্ত্র দিয়ে টুকরো টুকরো করা হচ্ছে অঙ্গ প্রত্যঙ্গ।

শিশুদের ছুড়ে মারা হচ্ছে শুন্যে। বেশি নির্যাতন করা হচ্ছে যুবকদের। অনেকের যৌনাঙ্গ কেটে নেওয়া হচ্ছে। যুদ্ধে প্রতিপক্ষের হাতেও অস্Í্র থাকে। নিরস্ত্র ও নিরপরাধ রোহিঙ্গা জনগোষ্টির উপর উগ্র বৌদ্ধ বিক্ষু ও মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নৃশংসতা সকল অমানবিকতাকে হার মানিয়েছে। ভারত, রাশিয়া. আমেরিকা ও ইসরাইলের প্রত্যক্ষ সমর্থনে নির্বিচারে রোহিঙ্গা নিধন চলছে। তুরস্ক, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া যথেষ্ট সমবেদনা দেখালেও কার্যকর ভুমিকা কেউ নিচ্ছে না। অপরদিকে সীমান্তবর্তী দেশ হওয়ায় লাখে লাখে রোহিঙ্গা ঢুকে পড়েছে বাংলাদেশে।

যেভাবে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের মাটি আঁকড়ে ধরছে আর সেভাবেই মিয়ানমার সরকার ফিরে যাবার পথ রুদ্ধ করে দিচ্ছে। সীমান্তে বসানো হয়েছে মাইন। বাড়িঘর, গাছপালা সব কেটে নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে। এতে করে ভবিষ্যতেও এই দেশের অবস্থা কি হয় বলা যায় না। পৃথিবীর রাজনীতি থেকে দীর্ঘকাল আঁড়ালে থাকা উগ্র বৌদ্ধ সন্ত্রাসীদের চারনভুমি মিয়ানমার এখন এক মুর্তিমান আতঙ্ক। আরাকানে এখন যা ঘটছে তার জন্য দায়ী মিয়ানমার সেনাবাহিনী। নেপথ্যে কলকাটি নাড়ছেন বৌদ্ধ সন্ত্রাসীরা।

রোহিঙ্গারা আরাকানে বহুদিন ধরে বাস করছেন। যেসব শরনার্থী আসছেন তাদের বেশিরভাগ নারী। সঙ্গে আসছেন তাদের সন্তানরা। তাদের বয়স এত অল্প যে, অনুমান করা যায় এরা জন্মেছে আরাকানে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী তারা জন্মসুত্রে আরাকানী নাগরিক।

Leave a reply