• Monday, October 23, 2017
logo
add image
সাদকাতুল ফিতর : রোজার ভুলবিচ্যুতির প্রতিকার

সাদকাতুল ফিতর : রোজার ভুলবিচ্যুতির প্রতিকার

আ ব ম খোরশিদ আলম খান-
রমজানের শেষ দশক নাজাতের পর্ব। নাজাতের দশকে এসে আমাদের ভেবে দেখতে হবে আমরা কতটা নিবিষ্ট চিত্তে ইবাদত বন্দেগির মাধ্যমে রোজার দিনগুলো কাটিয়েছি। সিয়াম সাধনা, নামাজে তারাবিহ, কোরআন শরিফ ও দরুদ শরিফ তেলাওয়াতসহ পুণ্যকর্মের মাধ্যমে আমাদেরকে বাকি ৮/৯টি দিন কাটাতে হয়। মাহে রমজানের একটি করণীয়ও যেন ছুটে না যায় রোজাদারকে সেদিকে সজাগ থাকতে হবে। মাহে রমজানের মাসব্যাপী সিয়াম সাধনা ও ইবাদত বন্দেগিতে মানুষের অংশগ্রহণের নানা নিয়ম পদ্ধতি নির্ধারিত।

অজ্ঞতা বা ভুলবশত রোজার নিয়ম-পদ্ধতির ব্যতিক্রম চর্চা যে কারো দ্বারা সংগঠিত হতেই পারে। ইচ্ছা ও অনিচ্ছায় মানুষ ইসলাম চর্চা ও রোজা নামাজ আদায়ে যতোই ভুল-বিচ্যুতি করুক-তার চূড়ান্ত প্রতিকার কিন্তু শুধু শাস্তিই নির্ধারিত নয়। ভুল-বিচ্যুতির মার্জনা লাভের নানা উপায় সুনির্দিষ্টভাবে শিখিয়ে দিয়েছেন উম্মতের করুণাধারা মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ (দ.)।

উম্মত কিভাবে পরিত্রাণ চাইবে তা প্রিয় নবীজীকে (দ.) কুরআনের মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ্ পাক। জীবন চলার পথে কৃত অপরাধ ও ভুল-বিচ্যুতির দায় এড়াতে পবিত্র কুরআনে অনুশোচনার ধরন ব্যক্ত হয়েছে এভাবে: রাব্বানা জালাম্না আন্ ফুসানা ওয়া ইন্ লাম তাগ্ফির লানা ওয়া তারহামনা লানাকুনান্না মিনাল খাসেরীন- ‘হে প্রভু আমি নিজ আত্মার ওপর অবিচার করেছি, তুমি যদি আমাকে ক্ষমা না কর তবে আমি ক্ষতিগ্রস্তই থেকে যাবো’ আল্লাহ্র কাছে এভাবে প্রার্থনা জানালে প্রত্যুত্তর আসে- ইন্নাল্লাহা গাফুরুর রাহিম- ‘বান্দারা নিশ্চয়ই জেনে রাখো তোমার প্রভু আল্লাহ্ তো অতিশয় ক্ষমাশীল ও দয়ালু।’

কুরআন মজিদের অন্য একটি আয়াতে মানুষের যাবতীয় অপরাধের নি®কৃতির অব্যর্থ দিক নির্দেশনা পেশ করে আল্লাহ্ পাক বলেন, ওয়ালাও আন্নাহুম ইজ্ জালামু আন্ফুসাহুম জাউকা ফাস্তাগফারুল্লাহা ওয়াস্ তাগ্ফারা লাহুমুর রাসূলু লাওয়াজাদুল্লাহা তাওয়াবার রাহিমা-‘তোমাদের কেউ যখন নিজের ওপর জুলুম করে বসবে তোমরা আল্লাহ্র কাছে পরিত্রাণ চাইবে এবং প্রিয় রাসূলের (দ.) শরণাপন্ন হবে, তিনি যদি তোমাদের ক্ষমা করেন তবে অবশ্যই আল্লাহ্র ক্ষমা ও অনুগ্রহের আশা রাখতে পার।’ মাহে রমজানে পুণ্যের সুযোগ ও হাতছানি অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি।

আর এই রহমত মাগফেরাত ও নাজাতের মাসটিকে উদাসীনতা ও অবহেলায় কাটিয়ে দেওয়ার শাস্তিও খুবই মর্মন্তুদ। রোজা তারাবিহ্, সাহ্রি ইফতার, নামাজ প্রভৃতি ইবাদত বন্দেগি আমরা সঠিকভাবে পালন করেছি স্থিরচিত্তে তা বলা যাবে না। ইচ্ছাকৃত ও অনিচ্ছায় বহুভাবে আমাদের নানা দুর্বলতা ও ইবাদতে শৈথিল্য প্রকাশ পেয়েছে।

রোজা নামাজের হুকুম-পদ্ধতি যথার্থভাবে পালনে আমরা হয়তো ব্যর্থ হয়েছি। আমাদের কথাবার্তা, উঠা বসা, চলাফেরা ও জীবনাচারে রোজার দিনগুলোতে বহু অনিয়ম ও ভুল-বিচ্যুতি যে সংঘটিত হয়েছে তা তো ধরেই নিতে পারি। কিন্তু যখনই ভুল পথে পা বাড়িয়েছি, ইবাদত রিয়াজতে অমনোযোগিতা ও উদাসীনতা আসায় পরক্ষণেই অনুতপ্ত হয়েছি, তখন আল্লাহ্র ঘোষিত ক্ষমা ও অনুগ্রহের প্রত্যাশায় উন্মুখ থাকি আমরা।

মাহে রমজানে আমাদের দ্বারা যতো অন্যায়, অপরাধ ও ভুল-বিচ্যুতি হয়েছে তার প্রতিবিধানে সচেষ্ট না হলে আল্লাহ্র নির্ধারিত শাস্তি আমাদের পেতেই হবে। পাপের কারণে জাহান্নামের ভয়াবহ শাস্তির দুঃসংবাদে আমরা বিচলিত হই, অনুতপ্ত হই, কৃত অপরাধ থেকে মার্জনা কিভাবে সম্ভব তা ভেবে হতাশ হয়ে পড়ি। এই হতাশা ও অনুশোচনা যতোই তীব্র হবে ততোই মঙ্গল। বলা হয়েছে ‘আন্ নাদামাতু তাওবাতুন’- অনুশোচনাই হচ্ছে তাওবা। সচরাচর আমরা দেখি যে, ভুলের জন্য লজ্জিত অনুতপ্ত ও দুঃখবোধ করলে যে কেউ তাকে রেহাই দিতে পারে।

আর আল্লাহ্র কাছে অনুশোচনাই বেশি পছন্দনীয়। প্রিয় নবী (দ.), আউলিয়া কেরামের উসিলায় যখন কেঁদে কেঁদে আল্লাহ্র কাছে কৃত পাপরাশির ক্ষমা চাওয়া হয় তখন আল্লাহ্ পাক বলেন- ইন্নাল্লাহা তাওয়াবার রাহিমা- ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ পাক মানুষের তাওবা গ্রহণে অতিশয় দয়ার্দ্র।’ মাহে রমজানের শেষ মুহূর্তে এসে আল্লাহ্র দরবারে কান্নাকাটি করে কৃত অপরাধ ও ভুলের প্রতিকার চাইতে হবে। নতুবা ইবাদত ও সিয়াম সাধনার ভুল-ত্রুটির জন্য আল্লাহ্ পাকের কাছে অপরাধীই হয়ে থাকতে হবে আমাদের।

রোজার ভুল-বিচ্যুতির দায় থেকে রক্ষা পেতে আল্লাহ্ পাক আমাদের সামনে সাদ্কাতুল ফিতর বা ফিতরা আদায় অত্যাবশ্যকীয় করেছেন। ফিতরা প্রদান করা ওয়াজিব। হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত: রাসূল (দ.) জাকাতুল ফিতরকে রোজাদারের বেহুদা কথা ও কাজ এবং পাপ থেকে পবিত্র করা এবং নিঃস্ব অসহায় মিসকিনদের খাবারের উদ্দেশ্যে ওয়াজিব করেছেন। যে ব্যক্তি তা ঈদের নামাজের পূর্বে আদায় করে সেটি আল্লাহ্র কাছে কবুল হয়। আর যে ব্যক্তি তা ঈদের নামাজের পর আদায় করে তা অন্যান্য দান সদকার মতো বিবেচিত হবে (আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ, হাকেম)।

এবার সরকারি সংস্থা ইসলামিক ফাউন্ডেশন ফিতরার সর্বনিম্ন হার নির্ধারণ করেছে জনপ্রতি ৬৫ টাকা। অন্য দিকে দেশের শীর্ষস্থানীয় দ্বীনি সংস্থা আন্জুমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়ার শরিয়া বোর্ডও ফিতরার হার নির্ধারণ করেছে ৬৫ টাকা। কেউ ইচ্ছে করলে আরো বেশি পরিমাণে ফিতরা প্রদান করতে পারবে। এতে ইসলামী শরিয়তে কোনো বাধা নেই। বরং জাকাত ফিতরা বেশি দেওয়া মানে গরিবের উপকারে এগিয়ে আসা। মনে রাখতে হবে সদ্কা-ফিতরা গরিবের হক।

তাই গরিবরা যাতে হাসিখুশিতে রোজা ও ঈদের আনন্দে শামিল হতে পারে সেদিকেই দৃষ্টি রেখে জনপ্রতি ১০/২০ টাকা করে না দিয়ে একজনকে একটি ফিতরা কিংবা পুরো পরিবারের ফিতরা একজন গরিবকে প্রদান করা উত্তম। জাকাত-ফিতরা ইত্যাদি গরিববান্ধব কর্মসূচি দেয়া হয়েছে গরিবরা যাতে সচ্ছল জীবনযাপন করতে পারে এই উদ্দেশ্যে। তাই, জাকাত-ফিতরা এমনভাবে বণ্টন করতে হবে যাতে এই বছর যাকে জাকাত-ফিতরা দেওয়া হয়েছে আগামী বছর সে আর জাকাত নিতে আসবে না। জাকাত-ফিতরার টাকায় গরিবের ভাগ্য বদলে দিতে হবে।

রোজার ভুল বিচ্যুতি হতে পরিত্রাণ পেতে ফিতরার টাকা অবশ্যই রোজা শেষ হওয়ার আগেই প্রদান করতে হবে। ঈদুল ফিতরের নামাজের আগেই ফিতরার টাকা বণ্টন করে দেওয়া উত্তম বলে ইসলামের নির্দেশনা রয়েছে। এই ফিতরা আদায়ে অনীহা প্রকাশ করা যাবে না।

আ ব ম খোরশিদ আলম খান: সাংবাদিক, ইসলামি চিন্তাবিদ।

Leave a reply