• Wednesday, September 19, 2018
logo
add image

আওয়ামী লীগে যত নেতা ততো গ্রুপ !

আওয়ামী লীগে যত নেতা ততো গ্রুপ !


জুবায়ের সিদ্দিকী : দক্ষিণ চট্টগ্রামের অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ন নির্বাচনি এলাকা পটিয়ায় আওয়ামী লীগের বিবাদমান দুই গ্রুপের পাল্টাপাল্টি সম্মেলন বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ। গত ৪ নভেম্বর দুপুর ১২টায় দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের প্রাক্তন সভাপতি মরহুম আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর ৫ম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে স্মরন সভা চলাকালে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ এ নির্দেশ দেন।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, যুগ্ন সাধারন সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ, ভুমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এনামুল হক শামীম, দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোসলেম উদ্দিন আহমদ, সাধারন সম্পাদক মফিজুর রহমান ছাড়াও পটিয়ার সংসদ সদস্য সামশুল হক চৌধুরী একই মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন। এখানে দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের সঙ্গে স্থানীয় সাংসদের বিরোধ চলে আসছিল।

এই বিরোধকে কেন্দ্র করে সাংসদের অনুসারী একটি গ্রুপ উপজেলা সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির ব্যানারে ১১ নভেম্বর সম্মেলনের আয়োজন করেন। অপরদিকে উপজেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান কমিটি একই জায়গায় পাল্টা কর্মী সম্মেলনের ঘোষনা দেন। পাল্টাপাল্টি কর্মসুচীকে ঘিরে কয়েকদিন ধরে এলাকায় উত্তপ্ত অবস্থা বিরাজ করছে। এদিকে আখতারুজ্জামান চৌধুরীর স্মরন সভায় উপস্থিত দলের সধারন সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দকে দলীয় গ্রুপিং সংক্রান্ত বিষয়টি লিখিতভাবে উপস্থাপন করেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সধারন সম্পাদক নাসির উদ্দিন চৌধুরী। এ সময় কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ সিদ্ধান্ত দেন ১১ নভেম্বর পটিয়ায় সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির ব্যানারে কোন সম্মেলন করা যাবে না।

দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে কেউ এলাকায় বিশৃঙ্খলা করলে সংগঠনের গঠনতন্ত্র মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে নেতৃবৃন্দ জানান। পটিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের বিরোধ নিস্পত্তি করতে ভুমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদকে দায়িত্ব দিয়েছেন। জানা গেছে, জাতীয় নির্বাচনের সময় যত এগিয়ে আসছে, দলের গ্রুপিং ক্রমশ চাঙ্গা হচ্ছে। পটিয়া থেকে নির্বাচন করতে চান কেন্দ্রীয় আওয়ামী যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বদিউল আলম ও এস.আলম গ্রুপের পরিচালক। উভয়ের অবস্থান রয়েছে পটিয়ায়। চন্দনাইশ উপজেলায় আওয়ামঅ লীগের দুই গ্রুপে সংঘর্ষে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক আবু আহমেদ জুনু সহ কমপক্ষে ৯ জন আহত হয়েছেন।

গত ২৬ অক্টোবর বিকাল ৫টার দিকে পৌর সদরের শাহ আমিন পার্কে এই সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। নিজেদের মধ্যে মারামারির পর নেতাকর্মীরা পুলিশের সঙ্গেও সংঘাতে জড়ায়। উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জাহিদুল ইসলাম জাহাঙ্গীর এবং সাধারন সম্পাদক আবু আহমেদের অনুসারীদের মধ্যে এই ঘটনা ঘটেছে বলে জানা যায়। জানা গেছে, এলডিপি ও বিএনপি থেকে নেতাদের এনে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ভিড়ানোর পর থেকে অশান্তি শুরু হয়েছে আওয়ামী লীগে।

এক পক্ষ স্থানীয় সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম চৌধুরীর পক্ষে আরেক পক্ষ সভাপতি জাহাঙ্গীরের পক্ষে। তৃনমুলের নেতাকর্মীদের অভিযোগ স্থানীয় সংসদ সদস্য দলীয় নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে বিএনপি-এলডিপির লোকজনকে কাছে টানছেন। অপরদিকে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির বিরুদ্ধে রয়েছে জামায়াত সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এনেছেন অনেকে। এই নির্বাচনী এলাকায় জেলা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক মুফিজুর রহমান, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মাঈনুদ্দিন হাসান চৌধুরী ও একজন শিল্পপতি মনোনয়ন দৌড়ে আছেন।

বাঁশখালীতে আওয়ামী লীগে বিরোধ, গ্রুপিং, মান-অভিমান নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরে বাঁশখালী আওয়ামী লীগে একাধিক গ্রুপ সক্রিয় থাকলেও বর্তমান সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদে আওয়ামী লীগ প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী বিজয়ী হলে বিরোধ অনেকটা কমে আসে। কিন্তু যতই দিন যাচ্ছে পুরনো বিরোধ ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে । বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত নেতাকর্মীদের অভিযোগ, এমপি মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী দলে নবাগত বিশেষ করে জামায়াত বিএনপি থেকে আগত নব্য আওয়ামী লীগারদের বেশি মুল্যায়ন করেন।

পুরনো ত্যাগী নেতাদের তিনি কোণঠাসা করে রাখার পাশাপাশি নতুনদের পুরস্কৃত করেন। তবে এমপি মোস্তাফিজুর রহমান তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অস্বীকার করেন। বাঁশখালীতে মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী এমপি, জেলা আওয়ামী লীগের শ্রম সম্পাদক খোরশেদ আলম, আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল্লাক কবির লিটন ও সাবেক এমপি সুলতান উল কবির চৌধুরীর পুত্র দক্ষিণ জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারন সম্পাদক চৌধুরী গালিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের আলাদা গ্রুপ রয়েছে। অপরদিকে এমপির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের অর্থ সম্পাদক শিল্পপতি মুজিবুর রহমান সিআইপি, জেলা বারের সাবেক সভাপতি মুজিবুল হক চৌধুরী ও সাবেক পৌর মেয়র শেখ ফখরুদ্দিন চৌধুরী।

এ গ্রুপটি কাছে টেনে নিয়েছে বিগত দিনে মনোনয়ন বঞ্চিত আওয়ামী লীগের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যানদের। দিন যত এগিয়ে যাচ্ছে, দলীয় গ্রুপিং ও দ্বন্দ্ব প্রকট আকার ধারন করছে। এক গ্রুপ আরেক গ্রুপের নেতাকর্মীদের ফাঁসিয়ে দিচ্ছে মামলায়। মাঠে ময়দানে নেতারা প্রত্যেকে বিষোদগার করেন একে অপরের বিরুদ্ধে। নির্বাচনের আগে আরও ভয়াবহ অবস্থা হতে পারে বলে মনে করেন প্রবীন নেতাকর্মীরা।

বাঁশখালীতে বর্তমান সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী ছাড়াও মনোনয়ন দৌড়ে আছেন আব্দুল্লাহ কবির লিটন, মুজিবুর রহমান সিআইপি ও খোরশেদ আলম। অপরদিকে সাবেক সংসদ সদস্য সুলতান উল কবির চৌধুরীর ব্যক্তিগত ইমেজকে ব্যবহার করে কেন্দ্রে মনোনয়নের তদ্বির করছেন তার পুত্র চৌধুরী গালিব।

সাতকানিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগে গ্রুপিং এখন প্রকাশ্যে রুপ নিয়েছে। আওয়ামী লীগের সম্মেলন ও কাউন্সিলর অধিবেশনের পর থেকে দুই গ্রুপের স্নায়ুযুদ্ধ থাকলেও তা বর্তমানে প্রকাশ্যে রুপ নিয়েছে। এক পক্ষে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারন সম্পাদক, অপরদিকে দুই সহ-সভাপতি ও দপ্তর সম্পাদক। গত ১৫ আগষ্ট শোকদিবসের পুর্বে প্রস্তুতি সভায় কেরানীহাটের সাতকানিয়া রিসোর্ট কমিউনিটি সেন্টারে সভাপতি ও সাধারন সম্পাদক বর্ধিত সভা আহবান করেন।

অপরদিকে সিটি সেন্টার শপিং মলের নিচতলায় আরেক গ্রুপ শোক দিবসের প্রস্তুতি সভা করে। দুই কর্মসুচীতে এক গ্রুপ অপর গ্রুপের বিরুদ্ধে বিষোদগার করে বক্তব্য রাখেন। বর্ধিত সভায় বক্তারা বলেছেন, যারা ইউপি নির্বাচনে জননেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ অমান্য করে নৌকা প্রতীকের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল তারাই দলকে দ্বিধা বিভক্ত করার পাঁয়তারা করছেন। অপরদিকে সহ-সভাপতি ও দপ্তর সম্পাদকের প্রস্তুতি সভায় বক্তারা বলেন,’যারা জামায়াত বিএনপিকে সাথে নিয়ে রাজনীতি করেন তাঁদের সাথে আমরা নেই। জামায়াত বিএনপির সাথে আওয়ামী লীগ আপোষ করতে পারে না। এটা আওয়ামী লীগকে ধ্বংসের পায়তারা। সে কারনে আমরা আওয়ামী লীগ রক্ষা করতে এ সভায় মিলিত হয়েছি।

ওই সভায় রাত ৮টার সময় বর্ধিত সভা থেকে ফেরার পথে উপজেলার কালিয়াইশ মাষ্টারহাট এলাকায় দুই গ্রুপের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ বিভক্তি ক্রমশ সংঘর্ষে রুপ নিতে পারে বলে নেতাকর্মীদের অভিমত। খবর নিয়ে জানা গেছে, এই একটি ঘটনা নয়। প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ইউনিয়নে ঘটছে আওয়ামী লীগের দ্বন্দ্ব ও গ্রুপিং কারনে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার মত ঘটনা। নেতাকর্মীদের মতে, ’ এলাকার সংসদ্য ডা. আবু রেজা নদভী পারিবারিকভাবে জামায়াত ঘেষা এবং তিনি জামায়াত-বিএনপির নেতাকর্মীদের সমন্বয়ে নবাগত আওয়ামী লীগ গড়ে তুলেছেন।

তার সাথে ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের কোন যোগাযোগ নেই। জানা গেছে, সাতকানিয়ায় তৃনমুলে শক্ত অবস্থান রয়েছে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সহ-প্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিনের। দলের বড় একটি অংশ চান আগামী দিনে সংসদ সদস্য হিসেবে আমিনুল ইসলামকে প্রার্থী করতে। আরেক অংশ চান বর্তমান সংসদ সদস্যকে পুনরায় প্রার্থীরুপে দেখতে।

সাতকানিয়ার রাজনীতি একাধিক গ্রুপে বিভক্ত। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় সহ-প্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন সমর্থিত গ্রুপ, এমপি নদভী গ্রুপ, ডাক্তার মিনহাজ গ্রুপ ও সভাপতি এম.এ মোতালেব গ্রুপ। নেতাকর্মীদের অভিযোগ, দলের ব্যানারে নির্বাচিত এমপি জামায়াত ও বিএনপির পক্ষে কাজ করেন। নেতাকর্মীদের কোন মুল্যায়ন করেন না। এই উপজেলায় আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দৌড়ে আছেন কেন্দ্রীয় নেতা আমিনুল ইলমাম আমিন, এম.এ মোতালেব সিআইপি ও ডা. মিনহাজ।

চট্টগ্রাম দক্ষিন জেলায় সবচেয়ে বেশি গ্রুপিং রাজনীতিতে জর্জরিত চন্দনাইশ, সাতকানিয়া ও বাঁশখালীতে নির্বাচনের সময় এগিয়ে আসার সাথে সাথে ঘটছে নতুন মেরুকরন। কে কখন কোন পক্ষে যায় না। সম্ভাব্য প্রার্থীরাই দলের তৃনমুল নেতাদের নিজের দিকে টানতে সচেষ্ট রয়েছেন। সম্ভাব্য প্রার্থীরা তিন নির্বাচনী এলাকায় ইতিমধ্যে মাঠে নেমে পড়েছেন। উপস্থিত হচ্ছেন বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্টানে। গরীব মেহনতি মানুষের মাঝে সাহায্য ও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন অনেকেই। অনেক সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিরুদ্ধে রয়েছে দলে দ্বন্দ্ব ও গ্রুপিং সৃষ্টির অভিযোগ।