বিতর্কিত এমপিদের বদলে নতুন মুখ চায় তৃণমূল

0

জুবায়ের সিদ্দিকীঃঃ ক্ষমতায় থাকতে দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের দূরে ঠেলে দিয়েছিলেন। খোঁজ রাখেননি প্রবীন নেতাদের। বিভিন্ন দলত্যাগী সুযোগ সন্ধানীদের নিয়ে বলয় তৈরী করেছিলেন। নির্বাচনী এলাকার সর্বত্র ছিল এসব এমপি গ্রুপের দাপট। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের পার্সেন্টেজ ও থানার দালালী সব ছিল এমপি গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে।

তৃনমুলের নেতাকর্মীদের দুচোখে দেখতেও পারতেন না তারা। এখন এসব এমপির দিন খুব খারাপ যাচ্ছে। দলের ত্যাগী-পরীক্ষিত ও তৃনমুল নেতৃবৃন্দ এমপিদের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। এসব এমপির পা-চাঁটা চামচা-চাটুকাররা সুযোগ সুবিধা লুঠে নিয়ে দূরে সরে যাচ্ছে। যে কারনে একা হয়ে যাচ্ছেন এমপিরা। এমপি হিসেবে প্রশাসনিক ক্ষমতা হাতে থাকলেও দলের তৃণমূলের নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের অনেকের হাতে ।

সব নির্বাচনী এলাকায় এক অভীন্ন চিত্র। চট্টগ্রাম উত্তর -দক্ষিণ ও মহানগরীর এমপিদের কর্মকাণ্ড নিয়ে সচেতন জনমনে চলছে বিচার বিশ্লেষণ। আওয়ামী লীগের সরিকদল থেকে নির্বাচিত এমপিরা মরনপন চেষ্টায় ছিল এলাকায় আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করতে। দলীয় এমপিদের অনেকেই দলের নেতাকর্মীদের পরিবর্তে বহিরাগত লোকজন নিয়ে গ্রুপ তৈরী করেন। নির্বাচনের দিনক্ষণ যত দ্রুত ঘনিয়ে আসছে এমপিদের পায়ের তলার মাটিও দ্রুত সরে যাচ্ছে। কারন দলীয় সরকার ক্ষমতায় থাকার পরও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও গ্রুপিং রাজনীতির রোষানলে পড়ে অনেক নেতাকর্মী গেছেন জেলে। অনেকে হয়েছেন দেশান্তরী। ভয়ে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র বসবাস করেছেন কেউ কেউ। এরই প্রেক্ষিতে চট্টগ্রাম উত্তর, দক্ষিণ জেলা ও নগরীর প্রায় সব নির্বাচনি এলাকা তৃণমূলে উঠেছে এক অভিন্ন আওয়াজ, সব আসনে প্রার্থী পরিবর্তন চাই।

ক্ষমতার হালুয়া-রুটি খেয়ে চেহারা স্বাস্থ্য পরিবর্তন হলেও এসব এমপির নীতি পরিবর্তন হয়নি। এদের দিয়ে দল এবং এলাকার মানুষ নিরাপদ নয়। খাই খাই স্বভাবের এসব এমপির কারনে গড়ে উঠেছে খাই খাই গ্রুপ। দুহাতে টাকা উপার্জন করাটাই ছিল তাদের টার্গেট। এমপির আস্থাভাজন লোকজনের সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, টেণ্ডারবাজি, মাদক ব্যবসা, দখল-বেদখল, নিয়োগ বানিজ্য ও শালিস বানিজ্যের কারনে সর্বস্থরের মানুষ ক্ষুদ্ধ। দলের নেতাকর্মী, সমর্থক ও উন্নয়নকামী মানুষ চায় প্রার্থী পরিবর্তন। পাঁচ বছরের এমপি অটোপাস করে পাঁচ-দশ বছর থাকলেও মানুষের আশা আকাঙ্খার পরিবর্তন ঘটেনি।

জেলার প্রায় সব এমপির বিরুদ্ধে রয়েছে দলের মধ্যে গ্রুপিং সৃষ্টি, দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতাকর্মীদের অবমুল্যায়ন, উন্নয়ন কর্মকান্ডে নয়ছয় করে অবৈধ টাকা আদায়, টেন্ডার বাজিন্য, নিয়োগ বানিজ্য, কোটা বানিজ্য, হাট-বাজার, কল-কারখানা, জল মহাল ও বালু মহাল থেকে টাকা আদায়সহ সন্ত্রাসী বাহিনী লালনের অভিযোগ।

এমপির মৌন সমর্থনে তার লোকজনের মাদক ব্যবসা, এলাকায় অসামাজিক কার্যকলাপ ও সরকারী ভুমি দখলের মত ঘটনা অহরহ ঘটেছে। এসব এমপিদের বাহিনীর লোকজনের হাতে নাজেহাল হয়েছেন সমাজের শান্তিপ্রিয় নিরহ মানুষ। ছোট বড় ব্যবসায়ীদের দিতে হয়েছে মাসে মাসে চাঁদা। চোখ বুঝে ক্ষমতাসীন এমপির লোকজনের অত্যাচার সহ্য করলেও প্রতিবাদ করতে পারেননি মানুষ। অনেক ধর্ণাঢ্য প্রবাসী এলাকায় যেতে পারেননি চাঁদাবাজদের দৌরাত্বে। প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় এমপির গ্রুপের উপর চরম বিরক্ত তৃনমুলের নেতাকর্মীরা।

চট্টগ্রাম উত্তর ও দক্ষিণের প্রায় সব এমপির লোকজনের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছে স্থানীয় মানুষ। এমন কোন অপকর্ম নেই যারা করেননি। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, হাট-বাজার, ঘাট-বালু মহাল, ছড়া, পৌরসভা, বিপনী কেন্দ্র সব এমপি গ্রুপের লোকজনের দখলে। ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ থাকা এমপিরা চামচা চাটুকারদের নিয়ে এত বেশি ব্যস্ত ছিলেন যে, কোনদিন তৃণমূল নেতাকর্মী ও প্রবীনদের খবর রাখার সময় পাননি। অভ্যন্তরীন রাস্তাঘাটের নাজুক অবস্থা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থানের মত নাগরিক সুবিধার জন্য এমপিরা তেমন কোন ভুমিকা রাখেননি। এসব ব্যস্ত এমপিদের দেখা যেত মানুষের বিয়ে, মেজবান, গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে।

প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক অবস্থা খুব খারাপ। কোন্দল-গ্রুপিং দ্বন্দ্ব, আধিপত্য বিস্তারের লড়াইতে একাধিক গ্রুপে বিভক্ত হয়ে গেছে রাজনীতি। দল ক্ষমতায় থাকলেও তৃণমূলের অবস্থান খুব নাজুক। নামে কমিটি আছে, দলের কোন কর্মসুচীতে তৎপরতা নেই। চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলার চন্দনাইশ, পটিয়া, আনোয়ারা, বাঁশখালী ও সাতকানিয়া-লোহাগাড়ায় আওয়ামী লীগের গ্রুপিং মারাত্বক আকার ধারন করেছে।

এসব এলাকার তৃণমূল আওয়ামী লীগের সঙ্গে এমপির তেমন কোন সম্পর্ক নেই। রয়েছে যত বেশি নেতা ততো বেশি গ্রুপ। দক্ষিণের বোয়ালখালীর শরিকদলের এমপির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ। তাদের অভিযোগ, এমপি এলাকার উন্নয়নে কোন ভুমিকা রাখতে পারেননি। উত্তর চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড, মীরসরাই, সন্দ্বীপ, রাউজান ও রাঙ্গুনিয়ায় একই অবস্থা। স্থানীয় এমপির সঙ্গে দলের বঞ্চিত, ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের সম্পর্ক নেই। এমপিরা নিজস্ব বলয় নিয়ে ব্যস্ত থাকেন।

এসব এলাকার এমপিদের পেটোয়া বাহিনীর কাছে কেউ নিরাপদ নয়। শুধু দলের প্রতিপক্ষই নয়, দলের অনেক নেতাকর্মী আক্রান্ত হয়েছেন এমপি বাহিনীর হাতে। উত্তরের ফটিকছটি ও হাটহাজারীর শরিকদলের এমপির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ। অভিযোগ রয়েছে, শরিকদলের এমপিরা ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় আওয়ামী লীগের নেতাকমীদের কোন সুবিধা তো দূরে থাক, অনেক ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ ধ্বংসের জন্য কাজ করেছেন। অভ্যন্তরীন রাস্তাঘাটের করুন অবস্থার কারনে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভাল নয়। উত্তর ও দক্ষিণের অনেক এলাকার মানুষ নদী ভাঙ্গণে জর্জরিত। ভিটামাটি হারিয়ে শত শত পরিবার উদ্বাস্তু হয়ে গেছে।

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ ও স্বনির্ভর অর্থনীতিসহ দৃশ্যমান উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বিগত দিনের সব সরকারকে ছাড়িয়ে গেলেও এসব উৎসাহব্যঞ্জক খবরগুলো প্রচার হয়নি। তৃণমূলের সঙ্গে এমপিদের দুরত্ব থাকায় দলের অর্জনগুলো প্রচারে তারা ভুমিকা রাখতে পারেনি। পক্ষান্তরে এমপিরা দলের অর্জনগুলো প্রচারের চেয়ে বেশি ব্যস্ত নিজেদের আত্বপ্রচারে। বিশেষ করে পত্রিকার প্রেস রিলিজ নিয়ে নিজের ছবি ছাপানো আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করতেই তাদের উৎসাহ বেশি। অধিকাংশ এমপি তার এলাকার বিভিন্ন ইউনিটের নেতাকর্মীদের চেনেন না।

চট্টগ্রাম মহানগরীর অবস্থা ভাষায় প্রকাশ করার মত নয়। নগরীর উন্নয়নে এমপিরা কোন ভুমিকা রাখেননি। মেজবান, বিয়ে-শাদী ছাড়া তাদের চেহারাও দেখা যায় না এলাকায়। আওয়ামী লীগের দলীয় কর্মসুচীতেও তারা উপস্থিত থাকেন না। নগরীর অধিকাংশ নিন্মাঞ্চলে বছরের অর্ধেক সময়ব্যাপী জলাবদ্ধতা, পানিয় জলের সমস্যা, গ্যাসের স্বল্পতা, ভয়াবহ লোডশেডিং, অভ্যন্তরীণ রাস্তাঘাটের করুন হাল, নালা নর্দমা ভরাট হওয়া ও মাদকের ভয়াবহ বিস্তার ঘটলেও এমপিরা ব্যস্ত থেকেছেন নিজেদের নিয়ে। চট্টগ্রাম কোতোয়ালী আসনে শরিকদলের এমপির বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। তাকে এলাকার উন্নয়নের কোন কাজে পাওয়া যায়নি কোনদিন। এ অভিযোগ স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের। নগরীর অপর দুই দলীয় এমপিকে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা ও পাহাড় ধ্বসের মত মানবিক বিপর্যয়ে মানুষ কাছে পায়নি।

নগরীতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বহদ্দারহাট ফ্লাইওভার, মুরাদপুর ফ্লাইওভার, কদমতলী ফ্লাইওভার, বিভিন্ন সড়ক সংস্কার ও প্রশস্তকরণ, বহদ্দারহাট থেকে কর্নফুলী সেতু চার লেইন সড়ক, কর্নফুলী সেতু থেকে পটিয়া ক্রসিং চারলেইন সড়ক, চাকতাই মেরিন ড্রাইভ রোড়, নগরীর পতেঙ্গা থেকে মীরস্বরাই উপজেলা পর্যন্ত মেরিন ড্রাইভ রোড় গুলো দৃশ্যমান হলেও এসবের পেছনে কোন ভুমিকা নেই এমপিদের। এগুলো চট্টগ্রামের উন্নয়ণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিকতা, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এবং সিডিএর আগ্রহেই হয়েছে।

জলাবদ্ধতা নিরসনে সিডিএ ও সেনাবাহিনীর যৌথ তত্বাবধানে মহাপ্রকল্পের কাজ চলছে। সিটি কর্পোরেশনের তত্বাবধানে নগরীর আগ্রাবাদ এক্সেস রোড়, পোর্ট কানেক্টিং রোড়সহ অনেক সড়কে একযোগে সংস্কার ও সম্প্রসারণ কাজ চলছে। স্থানীয় এমপিদের কারো এসবের কোন খবর নেই। এসব কারনে সর্বত্র ঝিমিয়ে পড়া, ব্যর্থ ও অভিযুক্ত এমপিদের বাদ দিয়ে তৃণমূলের দাবী অনুযায়ী নতুন প্রার্থী মনোনয়ন হবে আওয়ামী লীগের জন্য সাহসী ও যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত।

এ বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত

Leave A Reply

Your email address will not be published.