• Tuesday, June 26, 2018
logo
add image

মিরসরাইয়ে আর্সেনিক ঝুঁকিতে এক লাখ পরিবার

মিরসরাইয়ে আর্সেনিক ঝুঁকিতে এক লাখ পরিবার


এম আনোয়ার হোসেন, মিরসরাই: মিরসরাইয়ে নলকূপের পানিতে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক থাকায় স্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে প্রায় এক লাখ পরিবার। বৃষ্টির পানি সংরক্ষনের ব্যবস্থা না থাকা ও পর্যাপ্ত গভীর নলকূপের অভাবে উপজেলায় আর্সেনিকবাহী রোগ ইতিমধ্যে সংক্রামক ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে। সর্বশেষ ২০০২-২০০৩ সালে গ্রামের নলকূপ গুলোর আর্সেনিক পরীক্ষা ও ৪০ জন রোগী সনাক্ত করা হয়। এরপর থেকে নলকূপের পানি পরীক্ষা ও আর্সেনিক রোগে আক্রান্ত রোগী সনাক্তের কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। ফলে গত একযুগের বেশির সময় ধরে মিরসরাইয়ে আর্সেনিক রোগের আক্রান্ত রোগীর কোন পরিসংখ্যা নেই উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অফিস সূত্রে জানা যায়, ২০০২-০৩ অর্থ বছরে উপজেলার ৭৫ হাজার ৩৬৬ পরিবারের ৩২ হাজার ৪৮০ টি নলকূপের পানিতে আর্সেনিক পরীক্ষা করা হয়েছে। নলকূপগুলোর পানিতে গড়ে ৩৯.৭৭ মাত্রায় আর্সেনিক রয়েছে। এর মধ্যে ১২ হাজার ৮৩৩ টি নলকূপের প্রতি লিটার পানিতে.০৫ মিলিগ্রামের অধিক মাত্রায় আর্সেনিকের সনাক্ত করে নলকূপগুলোর পানি পান না করতে লাল রং লাগানো হয়েছে। মিরসরাই পৌরসভায় শতকরা ৬৬.৮৩, খৈইয়াছড়ায় ইউনিয়নে ৬৬.২৯, মায়ানী ইউনিয়নে ৫৬.১১, মিরসরাই সদর ইউনিয়নে ৬০.৯৬, ওয়াহেদপুর ইউনিয়নে ৫১.৭৯, ওচমানপুর ইউনিয়নে ৫১.২০, ধুম ইউনিয়নে ৫১.০৯, কাটাছড়া ইউনিয়নে ৪৭.৬৬, হাইতকান্দি ইউনিয়নে ৪৫.৩৩, দূর্গাপুর ইউনিয়নে ৪৪৫.০৫, মঘাদিয়া ইউনিয়নে ৪০.৩৪, মিঠানালা ইউনিয়নে ৩৯.৮৫, ইছাখালী ইউনিয়নে ৩৯.১৭, সাহেরখালী ইউনিয়নে ৩০.৩৬ ভাগ নলকূপে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক শনাক্ত করেছে আর্সেনিক শনাক্তকারী টিম। উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপ সহকারি প্রকৌশলী কেএম সাঈদ মাহমুদের মতে মিরসরাইয়ে আর্সেনিক থেকে মুক্তি পেতে এক লাখ পরিবারের প্রতি ১০ পরিবারের জন্য ১টি করে গভীর নলকূপ স্থাপন করা। সেই হিসেবে উপজেলায় প্রায় ১০ হাজার গভীর নলকূপ স্থাপন করা প্রয়োজন। কিন্তু ২০০৩ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত গত ১৪ বছরে তারা মাত্র ৪৪১ টি গভীর নলকূপ স্থাপন করতে পেরেছেন।

জানা গেছে, ২০০২-০৩ সালে সরকারিভাবে আর্সেনিকের ওপর জরিপ চালানোর আগে ২০০১ সালে মিরসরাইয়ে নলকূপের পানিতে আর্সেনিক নিয়ে জরিপ চালায় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা প্রশিকা। ওই সময় পানিতে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক ধরা পড়লে সুদ মুক্ত ঋনে মিরসরাই সদর ও উপকূলীয় ইছাখালী ইউনিয়নে চার লাখ টাকা ব্যয়ে পৃথক দুইটি বিশুদ্ধ পানির প্ল্যান্ট স্থাপন করে। প্ল্যান্টগুলো থেকে প্রতি কলসি পানি ৩ টাকা দামে সরবরাহ করা হয়। মিরসরাই সদরের প্ল্যান্টটি দিয়ে ৭০-৮০ পরিবারের বিশুদ্ধ পানির চাহিদা মিটলেও মোট জনসংখ্যার তুলনায় তা ছিল অপ্রতুল। বর্তমানে আর্থিক ও ব্যবস্থাপনা সংকটে সেটিও বন্ধ হয়ে যাওয়ার পথে। ইছাখালী ইউনিয়নের প্ল্য্যন্টটির বিশুদ্ধ পানি ওই এলাকার জনগন কিনে পান না করায় প্ল্যান্ট মালিকের লোকসান দেখা দেয়।

প্ল্যান্ট মালিক আবুল কালাম আজাদ জানান, এলাকার জনগন আর্সেনিক যুক্ত পানি পান করলেও অল্প দামে আর্সেনিক মুক্ত পানি পান করতে চাইছে না। ফলে প্রশিকার এক লাখ ১৯ হাজার টাকা ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে ২০০৯ সালে প্ল্যান্টটি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। মিরসরাইয়ে প্রশিকার কার্যক্রম গুটিয়ে নেয়ায় এ বিষয়ে কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সরজমিনে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, উপজেলার অধিকাংশ এলাকায় আর্সেনিকের ঝুঁকি থাকলেও এখন কোথাও কোন নলকুলে আর্সেনিক সনাক্তকরণ চিহ্ন নেই। ২০০১ সালে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা পানি পরীক্ষার মাধ্যমে মাত্রাতিরিক্ত নলকূপগুলোতে লাল চিহ্ন দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করলেও সে চিহ্নগুলো এখন মুছে গেছে। ফলে উপজেলার হাজার হাজার মানুষ এখন ওই নলকূপগুলোর আর্সেনিক যুক্ত পানি পান করে যাচ্ছে।

মিরসরাই মাতৃকা হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রফেসর ডাঃ জামশেদ আলম জানান, আর্সেনিক বিষ মানব দেহে পচন রোগ, কিডনীর সমস্যা, ক্যান্সার, হাত পায়ের তালুতে চর্মরোগের সৃষ্টি করতে পারে। তিনি আরো বলেন, আর্সেনিকে আক্রান্ত রোগীকে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন এবং এ রোগ থেকে মুক্তির জন্য উপজেলাজুড়ে পর্যাপ্ত গভীর নলকূপ স্থাপন খুবই জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

মিরসরাই জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের উপ-সহকারী প্রকৌশলী কেএম সাঈদ মাহমুদ জানান, মিরসরাই উপজেলা আর্সেনিকের মারাত্মক ভয়াবহতার মধ্যে রয়েছে। উপজেলার প্রায় এক লাখের বেশি পরিবারের অধিকাংশ নলকূপে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক রয়েছে। এতে আর্সেনিকোসিস রোগের মাত্রা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

আর্সেনিকোসিস থেকে মুক্তির জন্য প্রয়োজন গভীর নলকূপ স্থাপন ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে ব্যবহার। কিন্তু এর কোন ব্যবস্থাই মিরসরাইতে নেই। বৃষ্টির পানি সংরক্ষন ব্যয়বহুল হওয়ায় এ ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না উপজেলাবাসী। সরকারিভাবে গভীর নলকূপ স্থাপন করা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুব কম। সরকারি বরাদ্দ না থাকায় নলকূপের পানি পরীক্ষা ও রোগী সনাক্ত বন্ধ রয়েছে বলে জানান তিনি।