চট্টগ্রামে পৌর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ গনসংযোগে এবং বিএনপি আতঙ্কে

0

জুবায়ের সিদ্দিকী  :

আগামী ডিসেম্বর মাসে পৌরসভা নির্বাচন। নির্বাচন কমিশনের এই ঘোষনার পর থেকে চট্টগ্রামেও প্রার্থীদের প্রচারনায় মুখরিত হচ্ছে জনপদ। শুরু হয়েছে প্রস্তুতি। দেশের দুই বৃহৎ রাজনৈতিক দলে শুরু হয়েছে গুঞ্জন, আলোচনা ও সমালোচনা। এবার চট্টগ্রামের ১৪টি পৌরসভার মধ্যে ১২টিতে নির্বাচন অনুষ্টিত হবে। এই ১২টি পৌরসভায় শুরু হয়েছে নির্বাচনের আগাম প্রস্তুতি। এ ক্ষেত্রে প্রচারনায় এগিয়ে আছেন আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীরা। প্রতিটি পৌরসভায় দেখা যাচ্ছে আওয়ামী লীগের একাধিক মেয়র প্রার্থী রয়েছেন। এমনকি প্রতিটি ওয়ার্ডেও একাধিক কাউন্সিলর প্রার্থী। নির্বাচনের সময় আরও দেড়মাস থাকলেও আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীরা মনে করছেন এখন লড়াইয়ের সময়। দলের মনোনয়ন পেলেই নির্বাচনের পথ সুগম হয়ে গেল। এই ধারায় পৌরসভা নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগে চলছে তীব্র প্রতিযোগিতা।

দলের মনোনয়ন পেতে সম্ভাব্য প্রার্থীরা দলের তৃনমুল নেতাকর্মীদের ও হাইকমান্ডের সঙ্গে মেলামেশা করছে প্রতিযোগিতা দিয়ে। অন্যদিকে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা কেন্দ্রের নির্দেশ না মেনে মাঠে নামলেও তাদের মধ্যে রয়েছে ভয় ও আতঙ্ক। এবারের পৌরসভা নির্বাচনও যদি সংসদ, উপজেলা ও সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনের মত হয়। আওয়ামীলীগের প্রার্থীরা যদি আটোপাস করে এমন উদ্বেগ ও শংসয়ে আছেন স্বতন্ত্র ও বিএনপির প্রার্থীরা। অনেকে আবার সময়ের অপেক্ষায় আছেন। নির্বাচন যা হোক, হয়ত দলীয় সিদ্ধান্তে নির্বাচনে অংশগ্রহন করতেও হতে পারে এই ধারনায় বিএনপির অনেক প্রার্থী আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছেন। চট্টগ্রামের বেশ কয়েকটি পৌরসভা এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, সম্ভাব্য প্রার্থীরা মেজবান, বিয়ে, আকীকা সহ কোন অনুষ্টান বাদ দিচ্ছেন না।

এ ছাড়া শুভেচ্ছা পোষ্টার, ব্যানার, ছবি সংবলিত প্ল্যাকার্ডে ছেয়ে গেছে বাজার, পথঘাট, অলিগলি ও রাজপথ। কোন কোন প্রার্থী শুরু করে দিয়েছেন গনসংযোগ। সর্বত্র যেন সাজ সাজ রব। এমনকি যে যার মত দান দক্ষিনাও করে যাচ্ছেন অনেক স্থানে। অনেকে আবার উঠান বৈঠক, ড্রইংরুম বৈঠক করে যাচ্ছেন। দলের হাইকমান্ডের মন জয় করতে সিনিয়র নেতাদের বাসায় বাসায় মিষ্টি আর ফলের প্যাকেট নিয়েও দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন। চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার বারইয়ারহাট পৌর সভায় ঘুরে দেখা যায়, এখানে আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী রয়েছেন। একজন প্রার্থী বললেন, গত ৫ বছর ধরে আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র ছিলেন। তিন্তু তিনি এলাকার উন্নয়নে তেমন কোন পদক্ষেপ নিতে পারেননি।

এমনকি দলীয় নেতাকর্মীদের জন্যও তিনি কিছু করতে পারেননি। এ কারনে আমি এবার মেয়র প্রার্থী হতে চাই। দলের তৃনমুলের এক নেতা বলেন, বর্তমান মেয়রকে দল থেকে কোনভাবেই মনোনয়ন দেওয়া হবে না। কারন তার বিরুদ্ধে দলে অনেক অভিযোগ রয়েছে। মানুষ এই পৌরসভায় পরিবর্তন চায়। এ চিত্র চট্টগ্রামের অন্যান্য পৌরসভায়ও। পৌরসভাকে নিজস্ব সম্পত্তি ও অসদাচরনের অনেক নজির স্থাপন করেছেন অনেক পৌর মেয়র। সব পৌরসভায় ৩-৪ জন করে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থী রয়েছেন। তারা মাঠে ময়দানে একজন অপরজনের বিরুদ্ধে বলে নিজের জনসমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছেন। এমপিদের সুপারিশে এই নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী নির্ধারন ও পছন্দ এবং অপছন্দের হিসাব থাকায় অনেক প্রার্থী মালিশের রাজনীতি শুরু করেছেন নির্বাচনি বৈতরনী পার হতে। ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে প্রতিটি পৌরসভায় গ্রুপিং কোন্দল প্রকট। প্রকাশ্যে দ্বিধাবিভক্ত সর্বত্র আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক তৎপরতা। এদিকে বিএনপির প্রার্থীরা নিজেদের গন্ডির মধ্যে থেকেই নির্বাচনি প্রস্তুতির কাজ সারছেন। কিন্তু তাদের মধ্যে কাজ করছে ভয় ও আতঙ্ক।

যদি পৌরসভা নির্বাচন প্রহসনের নির্বাচন হয় তাহলে টাকা যাবে গচ্চা, হতে পারে মামলা হামলা এতকিছু মাথায় ঘুরেফিরে আসছে বিএনপি প্রার্থীদের। এ বিষয়ে চন্দনাইশ পৌরসভার বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের সাথে আলাপ করে জানা যায়, কোনরকম কারচুপি না করে সুষ্টভাবে পৌরসভা নির্বাচন অনুষ্টিত হলে বিএনপি ৯০ ভাগ পৌরসভায় বিজয়ী হবে। সাম্প্রতিক সময়ে এ সরকারের নির্বাচনগুলো পর্যবেক্ষন করলে দেখা যায় যে, তারা একতরফা ও একপেশি আচরন করে সব কয়টি নির্বাচনে নিজেদের প্রার্থীদের জয়ী করেছে। এ কারনে এবারের পৌরসভা নির্বাচনও কি বিগত সময়ের সংসদ, উপজেলা ও সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের মত হবে ? এ ভয় ও সংশয় আছে বিএনপি প্রার্থীদের। হাটহাজারীর বিএনপির এক প্রার্থী বলেন, সরকার যদি কারচুপির মাধ্যমে পৌরসভা নির্বাচন করতে চায় তাহলে সরকারের উচিত নির্বাচন না দিয়ে এমনিতেই নিজেদের লোককে বসিয়ে দেওয়া। কারন শুধু শুধু জনগন ও বিএনপির প্রার্থীদের হয়রানী করা বা কষ্ট দেওয়ার দরকার নেই। এ বিষয়ে বিএনপির প্রার্থীরা আছেন চিন্তায়। নির্বাচন কমিশন আজকের সুর্যোদয়কে বলেছেন, ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে পৌর নির্বাচন অনুষ্টিত হবে। নির্বাচন সুষ্ট ও নিরপেক্ষভাবে করতে আমাদের প্রস্তুতি রয়েছে। আশা করি সুষ্টভাবে নির্বাচন হবে। চট্টগ্রাম জেলার ১৪টি পৌরসভার মধ্যে ১২টিতে নির্বাচন অনুষ্টিত হবে। পৌরসভাগুলো হচ্ছে, মিরসরাই, বারইয়ারহাট, নাজিরহাট, হাটহাজারী, সন্দ্বীপ, সীতাকুন্ড, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, পটিয়া, চন্দনাইশ, সাতকানিয়া ও বাঁশখালী।

নির্বাচন হচ্ছে না বোয়ালখালী ও ফটিকছড়ি পৌরসভায়। মেয়াদ শেষ না হওয়াতে এই দুই পৌরসভার নির্বাচন হচ্ছে না। সন্দ্বীপ ও পটিয়ার আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থী বলেছেন, গ্রুপিং ও কোন্দল চরমে। দলীয় মনোনয়ন কে পাচ্ছেন বলা যাচ্ছে না। তবে সর্বত্র এমপিদের পছন্দ ও অপছন্দ কাজ করছে। চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগ ও দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দও দলীয় মনোনয়ন দিতে স্থানীয় সংসদ সদস্যকে সহযোগিতা করবে। দু:খের বিষয় হলেও সত্য, বিগত দিনে অনেক পৌর মেয়র ক্ষমতাসীন দলের হওয়াতে ক্ষমতার যথেচ্ছ অপব্যবহার করেছেন। মানুষকে কষ্ট দিয়েছেন নানা ভাবে। এক মেয়র একজন সাংবাদিককে বলেছেন, ’ভাইছা আঁই যা কই লিখবেন। অনেক সাংবাদিক পৌরসভায় বাইন্ধ্যা পিঠাইছি’’। এই বেয়াদব মেয়রও এতদিন মানুষের সাথে অসদাচরন ও ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে গেছে লাগামহীনভাবে। এদের লাগাম টেনে ধরতে পারেনি সরকার। দল, সমাজ, রাষ্ট্র এসব মেয়রদের কাছ থেকে কি পেয়েছে তারও হিসাব নিকাশ চলছে। অনুসন্ধানে জানা যায় যে, ডিসেম্বরে যেসব পৌরসভার নির্বাচন হবে সেখানে আগের ভোটার তালিকায় ভোটগ্রহন হবে।

এখন যারা নতুন ভোটার তালিকায় অন্তভুক্ত হয়েছেন তারা পৌর নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন না। চট্টগ্রামে যে সব পৌরসভায় নির্বাচন অনুষ্টিত হবে সেখানে ভোটকেন্দ্র আগে থেকেই নির্ধারন করা আছে। ভোটকেন্দ্র আগেরগুলো ঠিক থাকবে। কোনভাবে যদি ভোটার বেড়ে যায় তখন আমরা নতুন চিন্তা করবো বলে জানান নির্বাচন কমিশন। এদিকে ডিসেম্বরে পৌরসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে এ মাসের মধ্যেই ভোটার তালিকা এবং সম্ভাব্য ভোটকেন্দ্র সমুহ প্রস্তুত করার নির্দেশনা দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। চট্টগ্রামের প্রায় সব পৌরসভার মেয়র আওয়ামী লীগ সমর্থিত। এদের মধ্যে অনেকের বিরুদ্ধে রয়েছে অনিয়ম, হয়রানী, দুর্নীতি, অসদাচরন সহ নানা অভিযোগ।

দল ক্ষমতায় থাকায় এসব মেয়র ছিলেন সম্পুর্নভাবে বেপরোয়া। ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করে ক্ষমতার অপব্যবহার করে একছত্র দাপট ও মনে যা চেয়েছে তা করেছে বিনাবাধায়। অনেক পৌরসভায় নতুন মুখের সন্ধানে ক্ষমতাসীন দল। যদি সুষ্টভাবে ভোটগ্রহন হয় এবং সংসদ, উপজেলা ও সিটি কর্পোরেশনের মত একতরফা নির্বাচন না হয় তাহলে ক্ষমতাসীন দলের অধিকাংশ প্রার্থীর ভরাডুবির সম্ভাবনা রয়েছে। কারন শাসকদলের প্রার্থীদের কোন্দল, অহংকার, দাপট জনপ্রিয়তায় ধ্বস সহ নানাবিধ কর্মকান্ড পরাজয়ের নিয়ামক ভুমিকা রাখবে নি:সন্দেহে।

এ বিভাগের আরও খবর
আপনার মতামত লিখুন :

Your email address will not be published.