সঙ্গীতাঙ্গনে খ্যাতিমান শিল্পীদের একজন ফাহমিদা রহমান

0

গোলাম সরওয়ার,সিটিনিউজবিডি : দেশের খ্যাতিমান শিল্পীদের একজন প্রিয় মুখ ফাহমিদা রহমান । মূলত নজরুল সংগীত শিল্পী হলেও তার চর্চিত এবং সুরেলা কণ্ঠে যে কোন গান হয়ে ওঠে অনন্য। সঙ্গীতাঙ্গনে যে কোন গান, বিশেষত হারানো দিনের, মেলোডিয়াস গান তার কণ্ঠে অসাধারণ হয়ে যায়। চনমনে অথচ গভীরতায় পূর্ণ সৃজনশীল এ শিল্পীর গান শ্রোতাদের ভীষণ টানে। রেডিও-টিভি মঞ্চ, ঘরোয়া আসর সবখানে তিনি সমানভাবে সক্ষম, শিল্পী হিসেবে।

সম্প্রতি গুণী এ শিল্পীর সাথে তাঁর সংগীত জীবনের নানা বিষয় নিয়ে কথা হয়। শিল্পী ফাহমিদা রহমান জানালেন তার জানা-অজানা নানা কথা। জানালেন যখন থেকে বুঝতে শেখা তখন থেকে গান শুনতেন এ শিল্পী। এক সময় গানে আসক্ত হয়ে পড়লেন। তখন গান শেখা শুরু। নজরুলের গান কেন-এ প্রসঙ্গে বলেন নজরুলের মর্ম বুঝতে পেরেছি বলেই নজরুলের গান করা। বাবা ও পরিবারের সবাই নজরুলের সান্নিধ্যে ছিলেন। তাই নজরুলের প্রতি মনযোগ ছিল বেশি। শিল্পীর জন্ম চট্টগ্রামেই। পৈত্রিক নিবাস ঝিনাইদহ, আর মায়ের বাড়ি কলকাতা। মা ও বাবা দুজনই ছিলেন সঙ্গীত জীবনের গুরু, অনুপ্রেরণা। বর্তমানে স্বামী আবু আহমেদ হাসনাতের সহযোগিতায় তাঁর সংগীতে পথচলা । মা আবিদা খাতুন কণ্ঠশিল্পী। বাবা এ এইচ সাইদুর রহমান ছিলেন প্রখ্যাত নজরুল সঙ্গীত শিল্পী, গবেষক, সঙ্গীত পরিচালক, সংগ্রাহক এবং স্বরলিপিকার। বাবা রেলওয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা ছিলেন। নজরুল একাডেমি থেকে নজরুল সঙ্গীতের উপর স্বরলিপি প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর। নজরুল একাডেমি কর্তৃক মরণোত্তর পদক পান তিনি। নানা ছিলেন প্রকৌশলী ও প্রখ্যাত সেতার বাদক। ফাহমিদার বাবা ও দুই চাচা এ কে এম শামসুর রহমান এবং এ এম সিরাজুর রহমান নজরুলের সাহচর্য পেয়েছেন।

কলকাতার এইচ এম ভি’তে তাদের গান রেকর্ড হয়েছে। শ্রোতারা বলেন ফাহমিদার কণ্ঠে যাদু আছে। তাঁর কণ্ঠের যাদু শ্রোতাদের টানে। ফাহমিদা ১৯৮৫ সাল থেকে বেতারে তালিকাভুক্ত হন। ১৯৯০ সাল থেকে নিয়মিত বাংলাদেশ বেতার ও বিটিভির উচ্চ শ্রেণীমানভুক্ত নজরুল সঙ্গীত ও আধুনিক গানের শিল্পী হিসেবে নিয়মিত সঙ্গীত পরিবেশন করছেন। চট্টগ্রাম ও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সঙ্গীত পরিবেশন করেছেন শিল্পী। বর্তমানে চট্টগ্রাম ওয়াসাতে চাকুরির পাশাপাশি ২০১০ সাল থেকে নজরুল একাডেমির চট্টগ্রাম শাখার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন ও নিজ উদ্যোগে নজরুল সঙ্গীত প্রশিক্ষণ একাডেমি পরিচালনা করছেন।

গত ২৮ ও ২৯ নভেম্বর চট্টগ্রামে নজরুল একাডেমি কর্তৃক আয়োজিত ভারত ও বাংলাদেশ সংস্কৃতি বিনিময় সম্মেলনটি সফলভাবে সম্পন্ন হয় তার নেতৃত্বে। ঢাকা বেঙ্গল ফাউন্ডেশন আয়োজিত বেঙ্গল বিকাশ সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় শিল্পী নজরুল সঙ্গীত ও আধুনিক গানে ১ম রানার্স আপ হন। শিল্পী বলেন, একজন ভালো শিল্পী বেঁচে থাকে ভাল কিছু গানের মধ্যে। নজরুল সঙ্গীতকে বর্তমান সময়ের শিল্পীরা বিভিন্নভাবে গাইছেন। এটা সুখকর নয়। এতে নজরুলের স্বকীয়তা হারিয়ে বিকৃতি বাড়বে। নজরুল সংগীতকে বিকৃত না করে শুদ্ধ সুরে, প্রশিক্ষণ নিয়ে গান করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন তিনি।

শিল্পী চট্টগ্রামে বসবাস করেন বলে চট্টগ্রামেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেন নি। দেশের অনেক বিখ্যাত গীতিকার ও সুরকারের গান করেছেন তিনি। খ্যাতিও অর্জন করেছেন। তার বেশ কয়েকটি একক ও মিক্সড্‌ এলবাম রয়েছে। যেগুলোতে নজরুলের গানকে শুদ্ধভাবে উপস্থাপন করার অকৃত্রিম চেষ্টা আছে। তার প্রথম এলবাম শ্রদ্ধাঞ্জলি বের হয় কলকাতা থেকে। ২০১১ সালে নজরুল একাডেমি থেকে মিক্সড এলবাম বের হয়। এছাড়া বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে বাজুক প্রাণে বাংলা গান শিরোনামে মিক্সড এলবাম বের হয়। আরো এলবামের কাজ চলছে। ঢাকা শিল্পকলা, সোনারগাঁও, শেরাটনের মতো বড় ভেন্যুতে একাধিকবার গান পরিবেশন করেছেন এ শিল্পী। আলাপচারিতায় ফাহমিদা দেশের সঙ্গীতাঙ্গণকে ভালো-মন্দের মিশ্রণে একটা অবস্থানে আছে উল্লেখ করে বলেন এখন আমাদের এক সময়কার কথা ও সুরের গৌরব খুব বেশি নেই। কথা ও সুরে সৃজনশীলতা যেন হারিয়ে যাচ্ছে। আমরা মেলেডি থেকে যেন যন্ত্র নির্ভর হয়ে পড়ছি।

বর্তমান সময়ে গীতিকারদের মূল্যায়ন হচ্ছে না। তাদের যথাযোগ্য মূল্যায়ন করলে অবশ্যই সুন্দর গান পাওয়া যাবে। তবে চট্টগ্রামের সঙ্গীতাঙ্গনেও অনেকেই ভাল করছেন। অনেক মেধাবী শিল্পী গীতিকার আছেন। ঢাকার তুলনায় সুযোগ কম বলে নিজেদের বিকাশের সুযোগ পায় না। তিনি বলেন একথা সত্য যে কোন শিল্পের মানের জন্য সৃজনশীলতা প্রয়োজন। সৃজনশীল নিবেদিত শিল্পী ছাড়া ভালো কিছু হয় না। শিল্পীদেরকে কেবল এন্টারটেনার হিসেবে না দেখে তাদেরকে মানুষ হিসেবে দেখার, তাদের প্রয়োজনগুলির প্রতি মনোযোগী হওয়ার দৃষ্টিভঙ্গী থাকা দরকার। তা হলেই শিল্পীরা দেশ ও সমাজকে আরো দিতে পারবেন বলে শিল্পী ফাহমিদা রহমান বিশ্বাস করেন। আমরাও চাই এ শিল্পী তার কণ্ঠের যাদুতে দর্শক-শ্রোতাদের আরো বহুদিন দিয়ে যাবেন তার গানের মুগ্ধতা। নজরুলের গান নিয়ে দেশে হাতে গোনা যে কজন শিল্পী কাজ করছেন নজরুল সঙ্গীতকে আঁকড়ে ধরে আছেন এ শিল্পী তাঁদের একজন। নজরুল সঙ্গীতসহ ভালো গানের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করতে এ শিল্পী নিরন্তর কাজ করে যাবেন এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

এ বিভাগের আরও খবর
আপনার মতামত লিখুন :

Your email address will not be published.