ঢাকা: দিন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই বাড়ছে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ। আর দিন ঘনিয়ে এলে গোলযোগ আরো বাড়তে পারে। সুষ্ঠু ভোটগ্রহণ নিয়ে শঙ্কাটা বেশি বিরোধী প্রার্থীদের। কেননা, ইতোমধ্যেই বিভিন্ন ইউপিতে বিএনপি, আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রচারে বাঁধা ও নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে ভয়-ভীতি দেখানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তারা।
ইসি সূত্র জানায়, ইউপি নির্বাচনের প্রচারণা শুরুর পর থেকে প্রতিদিন স্থানীয় সংসদ সদস্য, উপজেলা চেয়ারম্যান ও পৌরসভার মেয়ররাও নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারসহ ১০ থেকে ১২টি অভিযোগ জমা পড়ছে ইসিতে। এসব অভিযোগ এসেছে শতাধিক প্রার্থীর কাছ থেকে। আর এসব অভিযোগের বিষয়ে কয়েকটি কমিটি গঠন করেই হাফ ছেড়েছে ইসি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ইসির কর্মকর্তা জানান, ১১ ফেব্রয়ারি ইউপি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর মনিটরিং কমিটি গঠন করা হলেও সংঘাত-সহিংসতার কোনো তথ্য সংগ্রহ করতে পারেনি ইসি। গত এক মাসে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বেশ কয়েকটি সহিংসতায় নিহতের ঘটনা ঘটেছে। এ বিষয়েও মনিটরিং কমিটির কাছে কোনো তথ্য সংগ্রহ করতে পারেনি।
এদিকে তফসিল ঘোষণার প্রায় ১ মাস পর গত ৮ মার্চ গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ যাচাই ও নিষ্পত্তির জন্য কমিশনের সিনিয়র সহকারী সচিব মো. শাহেদুন্নবী চৌধুরীকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কিন্তু তাদের কাজের সুবিধার্থে পর্যাপ্ত লজিস্টিক সাপোর্ট দেয়া হয়নি।এ কারণে কমিটি এখনও তাদের কাজ শুরু করতে পারেনি বলেও জানান কর্মকর্তারা।
এদিকে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে প্রতিকার না পেয়ে প্রতিদিনই চেয়ারম্যান, সংরক্ষিত সদস্য ও সাধারণ সদস্যরা নির্বাচন কমিশনে নানান ধরনের অভিযোগ করছেন। অনেকেই ফ্যাক্স ও ডাকযোগে অভিযোগ পাঠাচ্ছেন। এছাড়া কোনো কোনো প্রার্থীর পক্ষে তার লোকজন সরাসরি ইসিতে এসে সুষ্ঠু ভোটগ্রহণের পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ জানিয়ে যাচ্ছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে ইসি কী পদক্ষেপ নিচ্ছে তা কারো কাছে পরিষ্কার নয়।
প্রতিদিনের মতো বুধবার এরকম কয়েকটি অভিযোগ জমা পড়েছে নির্বাচন কমিশনে। এর মধ্যে অভিযোগ জমা দিয়েছেন বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার ২নং বাকাল ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে মহিলা চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী লাবণ্য আক্তার তালুকদার।
অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেছেন, রাতে ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভয় ও হুমকি দেয়া হচ্ছে। ভোটারদের বলা হচ্ছে- ভোটকেন্দ্র থেকে ব্যালট ছিনিয়ে নেয়া হবে, একজন প্রার্থীকে প্রকাশ্যে ভোট দিতে হবে।ইতোপূর্বের এ এলাকার নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র দখল, ব্যালট ছিনতাই ও এজেন্ট বের করে দেয়ার নজির রয়েছে। ওই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ইউপি নির্বাচনে হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন এ নারী চেয়ারম্যান প্রার্থী।
একই উপজেলার ৫নং রত্নপুর ইউপির চেয়ারম্যান প্রার্থী মো. শাহীন আলমও নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা করে ইসিতে অভিযোগ করেছেন। আরেক চেয়ারম্যান প্রার্থী শেখ মোহাম্মদ জাকির হোসেন। তিনি জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলার ৪নং নাংলা ইউপির চেয়ারম্যান প্রার্থী। এই প্রার্থীর সঙ্গে স্থানীয় ছাত্রলীগ নেতার মোবাইল কথোপকথনের সিডিসহ লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন ইসিতে।
অভিযোগে তিনি জানান, তাকে ছাত্রলীগের ওই নেতা নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য হুমকি দিচ্ছেন। ভোটকেন্দ্র দখল করে সবগুলো ইউপিতে পছন্দের প্রার্থীদের জয়ী করা হবে জানিয়েছেন ওই ছাত্রনেতা।
এছাড়া ইসিতে অভিযোগ জমা দিয়েছেন, ঝালকাঠীর রাজাপুর উপজেলার ৫নং বড়ইয়া ইউপির বর্তমান চেয়াম্যান জাহিদুল আবেদীন (জাহিদ)।
তার অভিযোগে তিনি বলেন, একজন জনপ্রতিনিধি প্রতিপক্ষ চেয়ারম্যান প্রার্থীর পক্ষ নিয়ে তার কর্মীদের নানানভাবে ভয়ভীতি ও মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করার হুমকি দিচ্ছে। এতে নির্বাচনী প্রচারণা সুষ্ঠুভাবে করতে পারছেন না। ওই জনপ্রতিনিধির বাড়ির কাছে থাকা তিনটি ভোটকেন্দ্রে ভোট কারচুপির আশঙ্কা করে বাড়তি নিরাপত্তা চেয়েছেন এ চেয়ারম্যান।
সাতক্ষীরার কলোরোয়া উপজেলার ৫নং কেঁড়াগাছি ইউপির চেয়ারম্যান কমিশনে অভিযোগ করে জানিয়েছেন, নির্বাচনী প্রচারণায় প্রতিপক্ষের লোকজন বাধা দিচ্ছে, তার এক কর্মীর বাড়িতে আগুন দেয়া হয়েছে। এ অবস্থায় সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে শঙ্কায় আছেন এ প্রার্থী।
এদিকে ইসিতে আসা প্রার্থীদের অভিযোগ ও আশঙ্কার বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. জাবেদ আলী বলেন, ভোট সুষ্ঠুভাবে হবে কী না তানিয়ে প্রার্থীদের মধ্যে সবসময় আশঙ্কা থাকে, এবারও আছে। আমরা আশ্বস্ত করতে চাই, সুষ্ঠু নির্বাচনে সব ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে নির্বাচন পরিচালনা শাখার উপ সচিব সামসুল আলম বলেন, ‘প্রার্থী, প্রতিপক্ষ ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নিয়েও অনেকের অভিযোগ রয়েছে। আমাদের কাছে যেসব অভিযোগ আসছে তা কমিশনের নজরে আনতে ফাইলে উপস্থাপন করা হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়েও নজর রাখা হচ্ছে। আমরা কোনো ছাড় দিচ্ছি না। ইতোমধ্যে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ না করতে কয়েকটি পদক্ষেপও নেয়া হয়েছে।’
উল্লেখ্য, এবার সারাদেশে সাড়ে ৪ হাজার ইউপিতে ছয় ধাপে ভোট অনুষ্ঠিত হবে। ১ম ধাপে ৭৩৩ ইউপিতে ভোট হবে ২২ মার্চ। দ্বিতীয় ধাপে ৬৮৪ ইউপিতে ভোট ৩১ মার্চ। এর পরে যথাক্রমে চার ধাপে ২৩ এপ্রিল ৭১১টি, ৭ মে ৭২৮টি, ২৮ মে ৭১৪টি এবং ৪ জুন ৬৬০টি ইউপিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

Comments are closed.