মো.সাজ্জাদ আলম : রাঙ্গামাটিতে চবি’র ফটিকছড়ি স্টুডেন্টস্ এসোসিয়েশন মিলনমেলা হয়ে গেল ১৯শে মার্চ, শনিবার। ভোর ৫টা বেজে ৫৬ মিনিট। ‘বাবা উঠ্, বাবা উঠ্’ বলে মায়ের ডাকাডাকি। চক্ষুযুগল গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন। তথাপি ঘুমকে বিদায় জানাতে হলো অন্য এক টানে। সভাপতি মাসুদ ভাইয়ের নির্দেশনায় পূর্বদিন রজনীতেই ফেইসবুক গ্রুপে জানান দিয়েছিলাম, সকাল ঠিক ৭.৩০ মিনিটেই বাস রাঙ্গামাটিমুখী হবে। যার দরুন অতি দ্রুত গোসল, সকালের নাস্তাসহ প্রস্তুতি পর্বের সমাপ্তি ঘটিয়ে এগুলাম ফটিকছড়ি বাজার অভিমুখে। পৌঁছেই দেখি এক ঝাঁক শিক্ষার্থী প্রতিক্ষারত পাহাড়ের কোল ঘেঁসে ঘুমিয়ে থাকা শান্ত হ্রদে হারিয়ে যেতে। এক সময়ে FSA মাতানো কতেক বড় ভাইও প্রতিক্ষার পালা গুণছেন পাহাড় নদী আর হ্রদের এক অপূর্ব মিলনমেলার সারথী হতে।
বাস ছাড়ি ছাড়ি করে ছাড়লো ঘন্টা খানেক দেরিতে। হু হু আনন্দে বাসে চেপে বসার সাথে সাথে শুরু হলো সেলফির হিরিক। এসব দিবসে গানের আসরের কথা তো বলা লাগে না। ক’সপ্তাহ যাবত গানের তুমুল প্রেকটিস বৃথা গেল না শাকিলের। মুন্না-জাহিদের বগি পরিবেশনা যথারীতিই ছিল। ফারুখ-মিনহাজ-নুমানের চিল্লাচিল্লি তো বহমান ছিলই…
প্রায় ঘন্টা খানেক পথ পাড়ি দিয়ে বাস থামলো হাটহাজারী বাজারে। উদ্দেশ্য কন্যা পাগল নজরুল ভাই, বেলাল ভাই, ছোটন ভাইসহ নগর থেকে আগত অগ্রজ-অনুজদের একীভূত করা। বিআরটিসির এ দায়ো বাস থামলো তো থামলো, ঘন্টারও বেশি কাল সকলকে দমিয়ে রাখলো। ঠিক ওই সময়টাতেই সেক্রেটারি ইমন ভাইকে খুব মনে ধরেছিল। যেতে না পেরে কি কঠিন অভিশাপটাই না দিয়ে রেখেছিলেন উনি…
বিআরটিসি থেকে আরেকখান বাস আগমনের পাশাপাশি আরো একটি বাস ভাড়া করে একশ’রও অধিক শিক্ষার্থীর যাত্রা পুনরায় সূচনা হল। বাস এগুতে লাগলো ফিরোজ-বেলাল-জিয়া-ছোটন-নজরুল-মিজান ভাইদের নাচের তালে তালে।
থামলো পর্যপটন স্থান প্রবেশের কাছাকাছি স্থানে। মাসুদ ভাইয়ের কড়া আদেশ, আগে গলধঃকরণ প্রক্রিয়ার সমাপ্তি, তারপরেই ঘুরাঘুরি।
অতঃপর আমরা নৈসর্গিক সৌন্দর্যের অপার লীলভূমিতে। যেখানে সীমানার ওপাড়ে নীল আকাশ মিতালি করে হ্রদের সাথে চুমু খায় পাহাড়ের বুকে। চারিপাশ যেন পটুয়ার পটে আঁকা কোন জল রঙের ছবি। যেদিকে তাকাই কেবল পাহাড় আর কাপ্তাই লেকের পানি। বিশাল কাপ্তাই লেকের পুরোটাই যেন অপার মমতায় দু’হাত দিয়ে ধরে রেখেছে পাহাড়গুলিকে।
কোন উপমাই যথেষ্ট নয় যতটা হলে বোঝানো যায় রাঙ্গামাটির অপরূপ সৌন্দর্য। এখানকার প্রতিটি পরতে পরতে লুকিয়ে আছে অদেখা এক ভূবন, যেখানে আমাদের তরে অপেক্ষারত ছিল নায়ানাভিরাম দৃশ্যপট।
ঝুলন্ত সেতুতে পা রাখতেই শুরু হলো ফটোসেশন আর সেলফি তোলার অস্থির প্রতিযোগিতা। প্রিয় পারভেছ ভাইকে সঙ্গী করে এগুলাম সামনের পাহাড় অভিমুখে। বাসে বিমর্ষ পারভেছ ভাই নবীণ রসায়ন কন্যার সন্ধান পেতেই কতটা যে উৎফুল্লতার আভা খেলা করছিলো ওখানে…
খানিকপর সভাপতির আগমন লঞ্চ নিয়ে। লঞ্চ ভ্রমণের এ সুখ স্মৃতি, কি করে বর্ণন করি? বৃটিশ আমলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের নিমিত্তে কর্ণফুলী নদীর গতিমুখ ঘুরিয়ে পাহাড়ের ফাঁক ফোঁকড়ের সমতল আবাদি জমিগুলো পানিতে পূর্ণ হওয়া বিশাল সরোবরটিই কাপ্তাই লেক বলে পরিচিত।
যে দিকে আঁখিযুগল যায়, কেবল জল আর তার মধ্যস্থলে ছোট ছোট টিলা। লাল মাটির এই টিলা গুলোর গায়ে সবুজের সমারোহ, যেন এগুলো ঢেকে আছে সবুজের কার্পেটে। অসহ্য সব মায়াবী দৃশ্য। কখনো ডানে, কখনো বামে, আবার কখনো বা মনে হবে সম্মুখে সীমাহীন পথ। যেখানে জল, পাহাড় আর আমরা ছাড়া আর কিচ্ছু নেই চারিপাশে। এ এক অপ্রকাশযোগ্য অনুভূতি।
নবীণ বরণ অনুষ্ঠান, পরিচিতি পর্বসহ বড় ভাইদের বক্তব্য প্রদান সমাপ্ত হলো লঞ্চ থেকে লেক উপভোগ করতে করতেই। লঞ্চ থামলো টুক টুক ইকো রিসোর্টে। এদিন ওদিক দৌড়াদৌড়ি শেষে আরম্ভ হলো র্যাফেল ড্র। নজরুল ভাইয়ের বদনা প্রাপ্তি দিয়ে সূচনা হওয়া এ পর্বের সমাপ্তি ঘটে এক নবীণের মোবাইল ফোন সাভাড়ের মধ্য দিয়ে।
ধীরে ধীরে সুয্যি মামার অস্ত জানান দিচ্ছে তাদের সফরের সময় সাঙ্গ হতে চলেছে। ফিরে যেতে হবে তাদের। এত দ্রুত চলে যেতে হচ্ছে বলে কোন কোন শিক্ষার্থীর চোখে মুখে বিষাদের প্রচ্ছদপট। তবু চলে যেতে হবে।
জব্বর বিকালযাপন শেষে লঞ্চ থামলো ঝুলন্ত সেতুর পাদতলে। ক্লান্ত দেহ নিয়ে বাস যাত্রা নাড়ীর অভিমুখে। তবুও দমেনি আনন্দরস। আরম্ভ হলো সিনিয়র-জুনিয়রদের গানের প্রতিযোগিতা। একপক্ষ যে অক্ষর দিয়ে গানের সমাপ্তি টানবে, অন্য পক্ষ ওই অক্ষর দিয়েই অন্য কোন গান ধরবে। এভাবে চলতে থাকা প্রতিযোগিতায় হার মেনে সিংহভাগ সিনিয়র ভাই প্রস্থান করেন হাটহাজারী থেকে।
হাটহাজারী থেকে অপ্রকাশযোগ্য এ আনন্দ গাঁথা দিনের অনুভূতি প্রকাশের মধ্য দিয়েই সমাপ্তি ঘটে বহুল আকাঙ্খিত দিবসটির। আর এভাবেই কালের গর্ভে হারিয়ে গেল আমাদের কয়েকটা রাঙ্গানো প্রহর। শুধু রয়ে গেল মিলনমেলার হাজারো সুখ স্মৃতি। কিছু বা মনিকোণায়, কিছুটা ফোনের ছোঁয়ায়।

Comments are closed.