সিটিনিউজবিডি : আলোচিত এক-এগারোতে যখন বিএনপির টালমাটাল অবস্থা, দলের শীর্ষ নেতারাও এলোমেলো; তখন বিশ্বস্ত নেতার পরিচয় দিয়ে খালেদা জিয়ার পাশে ছিলেন আ স ম হান্নান শাহ। মঙ্গলবার সেই বিশ্বস্ত নেতাকেই হারাল বিএনপি।
সিঙ্গাপুরের রাফেলস হার্ট সেন্টারে স্থানীয় সময় ভোর ৫টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন হান্নান শাহ। দলের বর্তমান কঠিন সময়ে তার মতো একজন প্রতিশ্রুতিশীল নীতিনির্ধারকের মৃত্যুতে অপূরনীয় ক্ষতি হলো বলে মনে করছেন বিএনপির নেতা-কর্মীরা।
এক-এগারোতে দলের ক্রান্তিকালে হান্নান শাহ দলের ঐক্য ধরে রাখতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ওই সময়ে দায়িত্বে থাকা সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও দলের সংস্কারপন্থি একটি অংশের বিরুদ্ধে গণমাধ্যমে সাহসী কথাবার্তা বলে চাঙা রাখেন দলকে।
কঠিন সময়ে তৃণমূল নেতা-কর্মীদের সংগঠিত করতে এবং দলের জন্য নিবেদিতপ্রাণ থেকে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও নেতা-কর্মীদের নজর কাড়েন হান্নান শাহ। এর পুরস্কারও পান হান্নান শাহ। ২০০৯ সালে দলের পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে হান্নান শাহ সর্বোচ্চ ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন।
হান্নান শাহ গাজীপুরের কাপাশিয়ার ঘাগটিয়াতে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ফকির আবদুল মান্নান ১৯৬৫-৬৮ পর্যন্ত পাকিস্তান সরকারের মন্ত্রী ছিলেন। তার ছোট ভাই শাহ আবু নঈম মোমিনুর রহমান সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি ছিলেন।
বর্ণাঢ্য সামরিক জীবনের অধিকারী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হান্নান শাহ ১৯৬২ সালে পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমি থেকে কমিশন লাভ করেন। এরপর তিনি পাকিস্তানের বিভিন্ন সেনানিবাসের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
পার্বত্য চট্টগ্রামের বিগ্রেড কমান্ডার, চট্টগ্রামের মিলিটারি একাডেমির কমান্ডেন্ট, যশোর ‘স্কুল অব ইনফ্রেন্টি অ্যান্ড টেকটিক্স’ এর চিফ ইন্সট্রাক্টর, পাকিস্তানের কোয়েটার আর্মি কলেজ অব ইলেক্ট্রিক্যাল অ্যান্ড মেকানিংক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ইন্সট্রাক্টরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে পালন করেন হান্নান শাহ।
১৯৮১ সালে ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে একদল সেনা বাহিনীর হাতে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে রাঙ্গুনিয়া থেকে প্রেসিডেন্টের মরদেহ ঢাকায় নিয়ে আসেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হান্নান শাহ।
এইচ এম এরশাদ সরকার হান্নান শাহকে সেনাবাহিনী থেকে বাধ্যতামূলক অবসর দেয়। তিনি সরকারের সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (এপিডি) ও বিএডিসির চেয়ারম্যানও ছিলেন। ১৯৮৩ সালে বিএডিসির চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করে বিএনপিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেন হান্নান শাহ।
রাজনৈতিক জীবনে শুরুতে ১৯৮৩ সালে হান্নান শাহ মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্ববায়ক, ১৯৮৬-১৯৯৩ সাল পর্যন্ত দলের সাংগঠনিক সম্পাদক (ঢাকা বিভাগ) এবং ১৯৯৩-২০০৯ সাল পর্যন্ত দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্যের দায়িত্ব পালন করে।
২০০৯ সালে দলের পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে হান্নান শাহ সর্বোচ্চ ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। সর্বশেষ ষষ্ঠ কাউন্সিলেও তিনি এই পদে পূনঃনির্বাচিত হন।
হান্নান শাহ গাজীপুর-৪ আসন (কাপাসিয়া) থেকে দুবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বিএনপি সরকারে থাকাকালীন খালেদা জিয়ার সরকারের পাট ও বস্ত্র মন্ত্রী ছিলেন তিনি।
বিএনপি চেয়ারপারসনের মিডিয়া উইংয়ের সদস্য শায়রুল কবির খান জানিয়েছেন, হান্নান শাহের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
পৃথক পৃথক বার্তায় শোক প্রকাশ করে তারা হান্নান শাহের বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করেছেন এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেছেন।
গত ৬ সেপ্টেম্বর সকালে মহাখালী ডিওএইচএসের বাসা থেকে আদালতে হাজিরা দিতে বের হওয়ার সময়ে হান্নান শাহ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। দ্রুত তাকে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তাকে কয়েকদিন লাইফ সাপের্টে রাখার পর গত ১১ সেপ্টেম্বর এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে আসম হান্নান শাহকে মুমুর্ষ অবস্থায় ঢাকা থেকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সেখানে তার হৃদযন্ত্রের অস্ত্রোপচার (এনজিওপ্লাষ্ট) করে হৃদযন্ত্রের ধমনীতে চারটি রিং পরানো হয়েছিল।
মৃত্যুকালে হান্নান শাহ স্ত্রী নাহিদ হান্নান, দুই ছেলে শাহ রেজাউল হান্নান, শাহ রিয়াজুল হান্নান ও এক মেয়ে শারমিন হান্নান সুমিকে রেখে গেছেন।
