গোলাম সরওয়ার : চট্টগ্রামের বাঁশখালীর আলোচিত গন্ডামারায় জমি ও বসতবাড়ির ক্ষতিপুরন বাবদ দেয়া ২ শতাধিক মানুষের ৮২ কোটি টাকার চেক পাস না করেই কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ শুরু করায় আবারও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। ৫-৬ মাস আগে ইস্যু করা ফাষ্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের এসব চেক পাস না করেই বর্তমানে নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পুরোদমে কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ এগিয়ে চলছে। স্থানীয় পাওনাদাররা দীর্ঘ ৫-৬ মাস ধরে ব্যাংকে ধরনা দিলেও তাদের চেক পাস হচ্ছে না।
ব্যাংক থেকে আজ কাল করে পাওনাদারদের ঘুরানো হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে ব্যাংক থেকে বলা হয়েছে, একাউন্টে টাকা না থাকায় এসব চেক পাস করা যাচ্ছে না। গত ১৪ নভেম্বর সোমবার সকাল থেকে বাঁশখালী পৌর শহরের ফাষ্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে পাওনাদাররা ভিড় জমান। পাওনাদাররা টাকা অথবা চেক ডিজঅনার করে দেয়ার দাবী করে ব্যাংকের কাছে। কিন্তু চেক ডিজঅনার করতে ব্যাংক কর্মকর্তারা গড়িমসি করে। তাদের ব্যাংকে প্রবেশ করতে বাধা দেয় নিরাপত্তা প্রহরীরা।
এ সময় উত্তেজনা দেখা দেয়ার পাশাপাশি ব্যাংক কর্মকর্তাদের সাথে বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়ে পাওনাদাররা। খবর পেয়ে এএসআই আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে উত্তেজিত জনতাকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। পরে সাংবাদিকরা ঘটনাস্থলে গেলে, ব্যাংকের ম্যানেজার আনোয়ারুল আলম যারা চেক ডিজঅনার করাতে আগ্রহী তাদের ভেতরে ডেকে নিয়ে বেশ কয়েকটি চেক ডিজঅনার করে দেন। কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাছে বসতভিটা হস্তান্তর করেও টাকা না পাওয়ায় ক্ষুদ্ধ গন্ডামারার এসব সাধারন মানুষ। স্থানীয় একজন পাওনাদার জামাল উদ্দিন জানান, তার বসতভিটা ও জমির বিক্রয়মুল্যের ২ কোটি ২২ লাখ টাকার চেক আটকে আছে।
এরই মাঝে তার জায়গায় কাজও শুরু করে দেয়া হয়েছে। আজ হবে, কাল হবে বলে ব্যাংক চেক পাস করছে না। চেক ডিজঅনার করে দিতে বললেও ব্যাংক পাত্তা দিচ্ছে না। একই অভিযোগ করেছেন, গন্ডামারার আজিজুল হক, আবুল কালাম, নুর মোহাম্মদ, রেজাউল করিম, নুুরুল আলম. নাদের আলী, অলি আহমদ, ইলিয়াছ, শাসসুল আলম সহ অসংখ্য মানুষ। তারা প্রত্যেকের কাছে ফাষ্ট সিকিউরিটি ব্যাংকের প্রায় ৮২ কোটি টাকার চেক রয়েছে।
এর মধ্যে প্রকল্প এলাকা গন্ডামারার মাতব্বর ঘোনার ২ কোটি ৪০ লাখ, বড়ঘোনার ৫ কোটি ৫৫ লাখ ৫০ হাজার, বোয়ারার ঘোনার ৪ কোটি ৬ লাখ ৯০ হাজার, রুহুল্লার ঘোনার ২ কোটি ৯৯ লাখ, সোনাইয়ার বাপের ঘোনার ২ কোটি ৯০ লাখ ৭০ হাজার, তালুকদার ঘোনার ১ কোটি ৮০ লাখ, ইউসুফ আলী সিকদার ঘোনার ২ কোটি ৬০ লাখ এবং পশ্চিম বড়ঘোনার ৫৯ কোটি টাকাসহ সর্বমোট ৮২ কোটি টাকার চেক অনাদায়ী রয়েছে। গন্ডামারা ইউনিয়নের সদ্য ২য় দফায় স্থগিত হয়ে যাওয়া ইউপি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনিত চেয়ারম্যান প্রার্থী নুরুল মোস্তফা সংগ্রাম জানান, তার নিজস্ব জমির ক্ষতিপুরনের টাকা সহ ২ শতাধিক মানুষের ৮২ কোটি টাকা জনগন এখনও পায়নি।
এরই মাঝে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাজ শুরু হয়েছে পুরোদমে। তিনি জানান, জনগনের পাওনা টাকা না দিয়ে কাজ শুরু করায় শান্ত গন্ডামারার মানুষের মাঝে আবারও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। মুলত কয়লা প্রকল্পের প্রধান সমন্বয়কারী নাছির উদ্দিন পদত্যাগ করার পর বর্তমানে এই প্রকল্পে নতুন কর্মকর্তা নিয়োগ হওয়ার পর থেকে পাওনাদারদের চেক পাস হচ্ছে না। কয়লা প্রকল্পের জমি ও বসতভিটার ক্ষতিপুরন এবং জমি রেজিষ্ট্রির টাকা হলেও এসব চেক নাছির উদ্দিনের ব্যক্তিগত প্রতিষ্টানের বলে জানিয়েছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।
কয়লা প্রকল্পের নতুন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আদিল জানান, যেসব চেক পাস হচ্ছে না বলে অভিযোগ আসছে সেসব চেকের সঙ্গে এস. আলম বা কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের সংশ্লিষ্টতা নেই। চেকগুলো নাছির উদ্দিনের ব্যক্তিগত বলে জানান তিনি। তবে কয়লা প্রকল্পের ইতিপুর্বে কেনা জমি এবং অন্যান্য সব পাওনার টাকা এই চেকেই এতদিন পাস হয়ে আসছিল। কয়লা প্রকল্প কিংবা এস আলমের কোন একাউন্ট থেকে গন্ডামারায় কখনো কোন টাকা দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন পাওনাদাররা। তারা বলেন, এতদিন কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সব টাকা এই একাউন্ট থেকে দেয়া হয়। এখন নাছির উদ্দিন দায়িত্বে নেই এই অজুহাতে কি তাহলে জনগন টাকা পাবে না-এ প্রশ্ন জনসাধারনের।
ফাষ্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক বাঁশখালী শাখার ম্যানেজার আনোয়ারুল আলম বলেন, একাউন্টে টাকা না থাকায় চেক পাস হচ্ছে না। তারা দাবী করায় তাদের চেক ডিজঅনার করে দেয়া হয়েছে। বাঁশখালী থানার ওসি আলমগীর হোসেন জানান, কয়লা প্রকল্পের চেক পাস না হওয়ার অভিযোগে পাওনাদাররা ব্যাংকে ভিড় করার পাশাপাশি উত্তেজনা সৃষ্টি করছে এ অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে এনেছে। কয়লা প্রকল্পের সাবেক সমন্বয়কারী নাছির উদ্দিনের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
প্রকল্পের সহকারী সমন্বয়কারী বাহাদুর আলম হিরন বলেন, নাছির সাহেব দেশের বাইরে আছেন। ফিরলেই এসব চেকের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হবে। চেকের পাওনাদাররা অবশ্যই টাকা পাবেন। তবে স্থানীয়দের মতে, কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের সাবেক সমন্বয়কারী নাছির উদ্দিন আদৌ ফিরবেন কিনা তা নিয়ে অনেকেই সন্দেহ পোষন করছেন। তাদের মতে, কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের বদৌলতে এই নাছির উদ্দিন জমি বিক্রেতাদের সাথে নয়ছয় করে বহু টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।
