জুবায়ের সিদ্দিকী –
সেদিন বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের এক আলোচনা সভায় চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেছেন,’আমাদের বিত্তশালী নেতারা দলের কর্মসুচীতে আসেন না। কিন্তু নির্বাচনের সময় আসলে তারা ভোট চাইতে আসেন। দলীয় পদে থেকে তারা দলের কর্মসুচীতে উপস্থিত থাকেন না। কিন্তু নির্বাচনে তারা দলীয় মনোনয়ন পান। সভানেত্রীর নির্দেশে আমরা তাদের নির্বাচন করি। তারা ক্ষমতায় যান। কিন্তু ক্ষমতায় বসে এসব বিত্তশালী নেতারা এখন ঔদ্ধত্যপুর্ন আচরন করছেন। এসব আচরনের জবাব কিভাবে দিতে হয় তা আমাদের জানা আছে। মহিউদ্দিন চৌধুরীর এ বক্তব্যে জানা যায়, বড় বড় দলে এভাবে উড়ে এসে জুড়ে বসা রইত্যা ছইত্যা আকাশের চাঁদ পেয়ে বেমালুম অতীত ভুলে যান। দিনকে রাত ও রাতকে দিনে পরিনত করে এসব বসন্তের কোকিলের আভিবাব শুধু আওয়ামী লীগে নয় বিএনপিতেও রয়েছে। চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগে এভাবে অনেক হাইব্রীড় নেতার জন্ম হয়েছে এই সরকার ক্ষমতায় আসার পর। অনেক আওয়ামী লীগ নেতা এসব হাইব্রীড় নেতার উৎপাতে অতীষ্ট। আওয়ামী লীগের অনেক সাংসদ ও শীর্ষ নেতারা রাজনীতির চেয়ে এখন বেশি ব্যস্ত ব্যবসা বানিজ্যে।
সরকারী দলের হাইব্রীডদের দাপট ও ক্ষমতার অপব্যবহারে দলীয় ভাবমুর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে মারাত্বকভাবে। আওয়ামী লীগের অনেক সাংসদ আছেন যাদের অতীত ইতিহাস নোংরা, দালালী, স্বাধীনতা বিরোধী ও অনেক জঘন্যকাজের কাজী ছিলেন। এরা দল বদল করে আওয়ামী লীগের লেবাস পড়লেও তাদের মনমানসিকতার কোন পরিবর্তন হয়নি। ভুমিদস্যু, রাজাগার, মাস্তান অনেকে এখন নব্য আওয়ামী লীগার। এদের দাপটও দলে সবচেয়ে বেশি। এদের ভাব ’ক’ডে যার এমন একজন হাইব্রীড নেতার কাছে একবার এক সাক্ষাতকার গ্রহন করতে বলেন,’আমার জন্মে পর থেকে বঙ্গবন্ধুকে ভালবেসে এসেছি। জীবিত না থাকলেও বঙ্গবন্ধুর জন্য আমার জীবন উৎসর্গ করতে দ্বিধাবোধ করব না? সাক্ষাতকার ছাপার পর ফোন করে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি বলেন,’আরে ভাই দেখার সময় আছে? ব্যস্ত আছি? অথচ সাক্ষাতকার গ্রহনের গ্রহনের আগে অনেক অনুরোধ ছিল তার। বিএনপির এক নেতার সাক্ষাতকার নিয়েছিলাম। তখন সরকার বিএনপির। চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির ওই নেতাকে এক পর্যায়ে প্রশ্ন করেছিলাম, আপনি কি রাজাকার ছিলেন? ভদ্রলোক হতচকিত হয়ে প্রশ্নের উত্তর দেন বেশ সাজিয়ে সাবলিল ভাষায়। তবে সাক্ষাতকার পর্বের শেষে তিনি বললেন,’ কি রে ভাই হঠাৎ করে আমার কাছে কি রাজাকারের গন্ধ পেয়েছেন? হাসলাম।
তবে ভদ্রলোক পরেরদিন আমার শ্রদ্ধাভাজন সম্পাদককে ফোন করে বললেন,’ আপনার লোক আমার বাসায় এসে আমার স্ত্রীর সামনে জিজ্ঞেস করেছে ’আপনি কি রাজাকার ছিলেন? এমন কেন হল? আমরা ক্ষমতায় তারপরও আপনার সহকর্মীর এইভাবে সাহস আমাকে অবাক করেছে। প্রধান সম্পাদক বললেন,’ও কিছু না। সে হয়তো আপনাকে খোঁচা দিয়ে দেখেছে আপনি কি বলেন? এই প্রশ্ন আপনাকে’ হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য করেনি। এভাবে আমরা বিএনপির নেতাদের উল্টাপাল্টা প্রশ্ন করে সত্যকে খোঁজার চেষ্টা করেছি। তবে এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হচ্ছে আওয়ামী লীগের ত্যাগী, পরিক্ষীত ও প্রবীন নেতাদের বাদ দিলে হাইব্রীড ও নব্য আওয়ামী লীগারদের কাছে কোন রাজনৈতিকমুলক আচরন আশা করা যায় না।
বৃহত্তর চট্টগ্রামে সর্বত্র আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক তৎপরতা ঝিমিয়ে পড়েছে দল ক্ষমতায় আসার পর থেকে। এখন নেতা, পাতি নেতা থেকে শুরু করে বড় বড় নেতারাও আছেন ধান্ধাবাজীতে। কিভাবে রাতারাতি কোটিপতি হওয়া যায়। এই পাগলা ঘোড়ায় চড়ে এখন অনেক নেতা টেম্পু যাত্রী থেকে পাজেরো ও কারের যাত্রী হয়েছেন। দলের দুর্দিনে, কোন কর্মসুচীতে রাজপথে না থাকলেও এসব অনেক নেতা এখন সংসদ সদস্য হয়েছেন। এদের দাপট ও ক্ষমতার দোর্দন্ড প্রতাপে রাজনীতির মানচিত্র বার বার কলুষিত হচ্ছে। এদের ক্ষমতার অপব্যবহার দল ও রাজনীতিকদের বিভ্রান্ত করছে। তারপরও এদের কিছু হয় না। এরা থাকে ধরাছোয়ার বাইরে। সমাজে ও দলে এদের দাপট থাকে সবসময়।
৫ জানুয়ারীর অটোপাস অনেক এমপি আছেন ভবিষ্যতে ওয়ার্ড কাউন্সিলর কিংবা ইউপি চেয়ারম্যান হবার মত গ্রহনযোগ্যতাও এলাকায় নেই। আত্বীয়করন, অবাধ লুটপাট, উন্নয়ন প্রকল্প নয়ছয়, দলের নেতাকর্মীদের অবমুল্যায়ন, ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের না চেনার ভাব, নবাগতদের নিয়ে নিজস্ব বলয় তৈরী করা, দলের কর্মসুচীর প্রতি অনিহা, বিএনপি জামায়াত নেতাদের সাথে আঁতাত সহ বঙ্গবন্ধুর আদর্শের বিপরীত শ্রোতে গা ভাসিয়ে দেয়ায় তাদের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে মানুষ। ক্ষমতাসীন দল ও অঙ্গসংগঠনের নেতাদের মধ্যে তেল এত বেড়েছে, তাদের পা মাঠিতে পড়ে না। প্রকাশ্য দিবালোকে একজন সাংবাদিককে কান ধরে উঠবস করানোর মত জঘন্য কাজটিও তারা করে দেখালেন? এদের প্রতি ঘৃনা প্রকাশের কোন ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। চট্টগ্রামে ক্ষমতাসীন দলের পাওয়ার হাউজ নামের বিশেষ মহলের ছত্রছায়ায় ছাত্রলীগ-যুবলীগের কতিপয় নেতারা নতুন ইতিহাস গড়তে যাচ্ছেন। এমন কোন অপরাধ ও অপকর্ম নেই যেখানে তারা জড়াচ্ছে না। নগরী ও জেলার অনেক এমপি এলাকায়ও যান না, পড়ে থাকেন ঢাকায় কিংবা বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে। কেউ কেউ কারনে অকারনে যাচ্ছেন বিদেশ ভ্রমনে। ব্যস্ত আছেন টাকা রোজগারের ধান্ধায়। দলকে সুসংগঠিত করার চেয়ে, নিজের ও আত্বীয় স্বজনদের ভবিষ্যত গড়তেই তাদের প্রচেষ্টা।
এলাকার সমস্যা, সম্ভাবনা ও উন্নয়ন কর্মকান্ড নিয়ে নেতাকর্মীরা চেষ্টা করেও এমপি মহোদয়ের দেখা পান না। অনেকে বিএনপি জামায়াতের সাথে আতাঁত করেছে। তবে ক্ষমতার দোর্দন্ড প্রতাপ তাদের আছে। অনেক ক্ষেত্রে দলের নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে এমপির ইশারায়। চট্টগ্রাম মহানগরীতে পানির জন্য হাহাকার চলছে। প্রচন্ড গরমে জীবন যখন ওষ্টাগত তখনও মানুষ পানি পাচ্ছে না। চট্টগ্রাম ওয়াসা ভবিষ্যতের গল্প বলেই দিন পার করছেন। প্রতিদিন লোডশেডিং চলছে সমানতালে। আসছে আবার বর্ষাকাল। বিভিন্ন এলাকার নাগরিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারের বর্ষায় কোমর নয়, বুক পরিমান জলাবদ্ধতা হবার আশঙ্খা অনেকের। অভ্যন্তরীন সড়কগুলোর অবস্থা খুবই করুন।
এসব নিয়ে অটোপাস এমপিদের তেমন মাথাব্যথা নেই। অনেক এমপি দলে গ্রুপিং চর্চার নেপথ্যে কলকাঠি নাড়ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। জানতে ইচ্ছে করে,’সামনেও দিন আছে। এসব মহামান্য এমপিগন আগামীতে মানুষের কাছে যাবেন কোন মুখে?

Comments are closed.