চট্টগ্রামে পুলিশের সোর্স মুর্তিমান এক আতঙ্ক !

জুবায়ের সিদ্দিকী – 

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো বিভিন্ন সময়ে সন্ত্রাসী, মাদক ব্যবসায়ী ও অস্ত্রবাজদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের জন্য পাবলিক সোর্সের সহায়তা নিয়ে থাকে। এসব বেসরকারী লোক মুলত এই ধরনের গুপ্তচরের কাজই করে থাকে। এরা কাজের বিনিময়ে সম্মানী পায়। এই ধরনের গুপ্তচরদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ’সোর্স’ বলা হয়ে থাকে। আন্ডারগ্রাউন্ড জগৎ সম্পর্কে যাদের ধারনা রয়েছে তাদেরই সোর্স হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়ে থাকে। এরা সমাজের নানা স্থানে ঘটে যাওয়া অপরাধ সম্পর্কে যেমন পুলিশ বা র‌্যাবকে তথ্য দেয়, তেমনি আসামীদের অবস্থান সম্পর্কেও গোপন তথ্য দিয়ে থাকে। কোন কোন সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সোর্সের সহায়তায় অপরাধীদের বিরুদ্ধে নানা স্থানে অভিযানও পরিচালনা করে থাকে। কিন্তু বর্তমানে পুলিশের সোর্স নামটি জনগনের নেতিবাচক ধারনারই জন্ম দিচ্ছে বেশি। কারন এরা অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। শুধু তাই নয়, তারা পুলিশ বাহিনীর বিভিন্ন সদস্যকেও অপরাধের সঙ্গে কৌশলে জড়িত করেছে। এদের কারনে পুলিশের ভাবমুর্তি যেমন ক্ষুন্ন হচ্ছে, তেমনি জননিরাপত্তা পড়েছে হুমকিতে। একটি গনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় এমন হতে পারে না। মাত্র কয়েকবছর আগে সন্ধ্যার পর পর মোটরসাইকেলে বাসায় যেতে নগরীর টাইগারপাস মোড়ের অনতিদুরে সিআরবির আগে দুই পাহাড়ের মাঝখানে পুলিশের টহল দলকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি।

হঠাৎ একজন সিভিল পোশাকের লোক সন্ধ্যার অন্ধকারে আমার চোখে টর্চের আলো ফেলেন। এতে করে বাইক নিয়ে দুর্ঘটনার আশঙ্খায় আমি দাড়িয়ে পড়ি পুলিশের সামনে। জিজ্ঞেস করি, টর্চ মারলেন আপনি কে? না কোন উত্তর নেই। দারোগা এসে বললেন,’ভাই ভুল হয়েছে চোখে টর্চ মারা। আমি দাঁড়ানো পুলিশের কথিত সোর্সের হাত থেকে টর্চলাইটটি দারোগাকে নিয়ে নিতে বললাম। দারোগা তাই করলেন। এভাবে নগরীতে সোর্সের দাপট রয়েছে পুলিশের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায়। গত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে পুলিশ ও র‌্যাবের সোর্সদের জড়িত থাকার খবর প্রায়ই গনমাধ্যমে শিরোনাম হচ্ছে। এই নগরীতে পুলিশকে ভু তথ্য দিয়ে নিরিহ ব্যক্তিদের হয়রানী ও মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়ার অভিযোগ উঠছে সোর্সদের বিরুদ্ধে। অপরহরন, গুম, খুনের মতো নগন্য কাজে জড়িত থাকার অভিযোগও রয়েছে অনেক সোর্সদের বিরুদ্ধে। সোর্সদের অনেকেই র‌্যাব পুলিশের নাম ভাঙ্গিয়ে চাঁদাবাজি ও বিভিন্ন প্রতারনায় জড়িয়ে পড়ার খবরও রয়েছে। পুলিশের একটি দুর্নীতিগ্রস্থ অংশের অনৈতিক ইচ্ছা পুরনেও তারা ব্যবহুত হচ্ছে। এ ধরনের প্রবনতা খুবই খারাপ ফল বয়ে আনবে দেশ ও জনগনের জন্য।

যদি এখনই বিষয়টি আমলে নিয়ে প্রয়োজনীয় প্রতিবিধান উদ্যোগ গ্রহন না করা হয়। চট্টগ্রাম নগরীতে অনেক সোর্স ইয়াবা ব্যবসা, অসামাজিক কাজ সহ নানা অপকর্মে জড়িত। এ ছাড়া নগরীর থানাসমুহে সোর্সদের বেপরোয়া আচরন থানায় আগত ফরিয়াদীদের বিড়ম্বনায় ফেলছে। অনেক থানায় সরেজমিন দেখা গেছে,’সোর্স পুলিশের দারোগাকে বলছে,’ স্যার ট্যায়া দুই হাজার দিয়ে, গাড়িলই লাইল্যারে টো’য়াই আইলে ভালা অইব’। অর্থাৎ এক ফরিয়াদী জিড়ি করেছেন এক প্রতারকের বিরুদ্ধে। সোর্স নিয়েছে জিডি বাবদ ২ হাজার টাকা। এ কারনে সোর্সের এই হাকডাক। নগরীর বিভিন্ন থানায় ইদানীং ভুয়া পুলিশ ও ভুয়া সাংবাদিকদের তৎপরতাও যেন দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। থানায় ভুয়াদের কদরও বেশি। এদের দৌরাত্ব্য মানুষকে বিভ্রান্ত করছে সবসময়। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সোর্সদের মধ্যে অনেক, ভাল, নীতিবান ও দায়িত্ববোধ সম্পন্ন সোর্সও আছে। এরা সমাজের ভাল মানুষদের রক্ষায় প্রকৃত অপরাধীদের দমনে পুলিশকে তথ্য দিয়ে সাহায্য করেন। সোর্সদের একটি অংশ অপরাধীদের রক্ষায় ও অসহায় নিরপরাধ মানুষদের বিপক্ষে কাজ করে। এরা পুলিশকে ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করে।

অবস্থাদৃষ্টে দেখা গেছে, পেশাদার খুনি, ছিনতাইকারী, মাদকসেবী, মাদকব্যবসায়ী, পতিতা ও সন্ত্রাসীরাই সোর্স হিসাবে কাজ করছে। তাদের অনেক পুলিশী হয়রানী ও প্রতিপক্ষের অন্ত্রের নিশানা থেকে নিজেদের রক্ষা করতেই সোর্সের মুখোশ গ্রহন করেছে। এসব মুখোশধারী সোর্সদের ব্যবহার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুনীতিগ্রস্থ সদস্যরাও চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে নানা অপরাধ করে যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলার রক্ষার জন্যই তাদের নিয়োগ দেওয়া হলেও তারা অবৈধ ও অনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে সমাজের শান্তি নষ্ট করছে। তাদের অপরাধের দায় চাপছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভালো, সৎ, যোগ্য, সুদক্ষ ও নীতিনিষ্ট সদস্যদের উপর। পুলিশের দুর্নীতিগ্রস্ত সদস্যদের আরো বেশি বেপরোয়া করতে ভুমিকা রাখছে মুখোশধারী সোর্সরা। সোর্সের মিথ্যা তথ্যের কারনে অনেক নিরপরাধী মানুষ গ্রেফতার হয়ে নির্যাতিত হচ্ছে। একদিন রাতে অফিস থেকে ষ্টাফ রিপোর্টার গোলাম শরীফ টিটু সহ ডবলমুরিং থানায় যেতে হল এক বন্ধুর স্ত্রী শিশু ও নারী নির্যাতন মামলায় আটক হয়েছেন জেনে। যেখানে গিয়ে দেখা গেল, থানার সামনে পুকুরপাড়ে এক কথিত ফটো সাংবাদিক বলেছেন,’ ওসি, এসি সব আমার মানুষ। আমার সাথে কথা বলেন আপনারা।

আরেকদিন নগরীর পাঁচলাইশ থানায় নিউজ সংগ্রহে গিয়ে দেখতে হল অবাক কান্ড। আসামীকে জেরা করছে সোর্স! সোর্স আসামীকে বলছে, ট্যায়া ন’দিলে ব্যাডা তোঁয়ার খবর আছে। মেয়র মন্ত্রী কেউ আইলেও কাম অইত’ন’। পুলিশের সামনে এভাবে বলছে আসামীকে। এভাবে থানা বা নগরীতে দোর্দন্ড প্রতাপে এরা মানুষকে সবসময় নিগৃহীত করলেও পুলিশ সেক্ষেত্রে নির্বিকার। পুলিশের খামখেয়ালী, উদাসীনতা ও অর্থের লোভে সোর্সের প্রতাপ ও প্রভাব ক্ষতি করছে পুলিশের ভামমুর্তিকে। পুলিশের কতিপয় সোর্স আবার থানা পুলিশের ক্যাশিয়ার হিসাবে কাজ করছে। এরা চাঁদাবাজি চালায় নির্দিষ্ট মাদক ব্যবসায়ী ও অপরাধের সকল মাইলফলক থেকে।

পুলিশ বর্তমানে ভয়ংকর অপরাধের সঙ্গে জড়িত সোর্সদের তালিকা তৈরী করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এটি একটি ভাল উদ্যোগ। দুষ্টদের দমন করে সোর্স হিসেবে ভাল, নীতিবান এবং সৎ মানুষদের সমাবেশ ঘটানো গেলে সাধারন মানুষ যেমন সোর্সদের নানা হয়ারানী থেকে নিরপদবোধ করবেন, তেমনি সামনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও উন্নতি ঘটবে। একই মাসে সোর্স নিব্র্াচনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আরও সতর্ক হওয়া উচিত। পুলিশের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধেও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। নতুবা শর্ষের মধ্যেই ভুত লুকিয়ে থাকলে সংস্কার করলেও কোন ফল পাওয়া যাবে না। নগরীতে এভাবে ১৬ থানায় সোর্সদের অবাধ দাপট ও ক্ষমতার অপব্যবহার নগরীতে অপরাধীদের উৎসাহ ও মদদ যোগাচ্ছে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। সোর্সের মাধ্যমে পুলিশ কোন কোন ক্ষেত্রে সফল হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সোর্সরা অঘটন ঘটাচ্ছে বেশি। এদের বেপরোয়া ভাবকে নিয়ন্ত্রন করতে হবে, না হয় সোর্সরা আরো বেশি অপরাধ সৃষ্টি করবে নি:সন্দেহে। সোর্স এখন নগরীতে মুর্তিমান আতঙ্ক।

এ বিভাগের আরও খবর

Comments are closed.