সাব্বির আহমেদ –
কালো টাকা বলতে কী বোঝায়? কর আইনে বা অন্য কোনো আইনে এর কোনো সংজ্ঞা নেই। নেই মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনেও। তবু কালো টাকার একটা প্রচলিত ধারণা আছে। কর আইনে কালো টাকার সংজ্ঞা না থাকলেও ‘অপ্রদর্শিত আয়’ কথাটার উল্লেখ আছে। সে আইন অনুয়ায়ী অপ্রদর্শিত আয়ই কালো টাকা বলে অভিহিত। অর্থাৎ যে আয় করদাতা কর ফাঁকি দেওয়ার উদ্দেশ্যে তার আয়কর রিটার্নে প্রদর্শন করেনি তা কালো টাকা বলে ধরে নেওয়া যায়।
অপ্রদর্শিত আয় আবার দুরকমের হয়: যে আয় বৈধ উপায়ে অর্জিত হয়েছে কিন্তু আয়কর দেওয়া হয়নি; এবং যে আয় অবৈধ উপায়ে অথবা সন্ত্রাসী কার্যক্রমের দ্বারা অর্জিত হয়েছে এবং তার উপর আয়করও দেওয়া হয়নি। নির্দিষ্ট পরিমাণ কর এবং জরিমানা প্রদান-সাপেক্ষে কালো টাকাকে মূলধারার অর্থনীতির ভেতর অন্তর্ভুক্তির চেষ্টা করা হয় যাকে প্রচলিত ভাষায় কালো টাকা সাদা করা বলা হয়।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে বঙ্গবন্ধু হত্যা পর্যন্ত দেশে কালো টাকা সাদা করার কোনো সুযোগ ছিল না। ১৯৭৫ সালে সামরিক সরকার এক ফরমান জারির মাধ্যমে দেশে প্রথম কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেন। তারপর থেকে এ সুযোগ বিভিন্নভাবে দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে আয়কর আইনের ১৯ ই ধারার ৩(ঘ) উপধারা অনুযায়ী বেআইনি এবং সন্ত্রাসী কার্যক্রমের মাধ্যমে অর্জিত আয় যথাযথ আয়কর এবং ১০ শতাংশ জরিমানা দিয়ে সাদা করা যাবে না।
কালো টাকা সাদা করার যে ব্যবস্থা আইনি কাঠামোর মধ্যে করা হয় তা সাধারণ নৈতিকতা এবং সংবিধান পরিপন্থী। সংবিধানের ২০(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে:
“রাষ্ট্র এমন অবস্থা সৃষ্টির চেষ্টা করিবেন, যেখানে সাধারণ নীতি হিসাবে কোনো ব্যক্তি অনুপার্জিত আয় ভোগ করিতে সমর্থ হইবেন না এবং যেখানে বুদ্ধিবৃত্তিমূলক ও কায়িক-সকল প্রকার শ্রম সৃষ্টিধর্মী প্রয়াসের ও মানবিক ব্যক্তিত্বের পূর্ণতর অভিব্যক্তিতে পরিণত হইবে।”
তবু পঁচাত্তর-পরিবর্তী সরকারগুলো কালো টাকা সাদা করার আইনি ব্যবস্থা করেছেন। প্রতি বছর বাজেট প্রদানের সময় সমাজের সচেতন ব্যাক্তিরা এই প্রসঙ্গে প্রশ্ন তুলে যাচ্ছেন এবং অর্থমন্ত্রীগষ বিভিন্ন অজুহাতে এই ব্যবস্থা চালু রাখছেন। তাদের যুক্তিগুলোর অন্যতম হচ্ছে, দেশে বিপুল অ্ংকের কালো টাকা রয়েছে, এই টাকা অর্থনীতির মূলধারার মধ্যে না আনতে পারলে অর্থনীতিকে কার্যকরভাবে পরিচালনা সম্ভব নয়।
বাস্তবে দেখা যায় যে, এই অনৈতিক এবং অসাংবিধানিক সুযোগ দেওয়ার পরও আশানুরূপ সাড়া পাওয়া যায় না। কালো টাকার মালিকেরা যৎসামান্য টাকাই এ যাবৎ সাদা করেছেন।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের ২০১১ সালের গবেষণাপত্র Underground Economy of Bangladesh: An Econometric Analysis অনুযায়ী ২০০৯ সালে দেশের অর্থনীতিতে ৬২.৭৫ শতাংশ কালো টাকা ছিল। যার পরিমাণ ৫ লক্ষ ৬৫ হাজার কোটি টাকা, যা ২০১৪-১৫ সালের জাতীয় বাজেটের দ্বিগুণেরও বেশি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত মাত্র ১৩,৮০৮ হাজার কোটি কালো টাকা সাদা করা হয়েছে ১,৪৫৫ কোটি টাকা কর প্রদানের মাধ্যমে। এই সামান্য অংকের কালো টাকা সাদা করার জন্য বছরের পর বছর এই অনৈতিক সুযোগটা রাখা হয়েছে।
তবে এই সুযোগ কমানো শুরু হয়েছে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে। এখন প্রধানত দুটি ক্ষেত্রে কালো টাকা বিনিয়োগ করার ব্যবস্থা রয়েছে: শেয়ার বাজার ও স্থাবর সম্পত্তি। অতীতে কালো টাকা সাদা করার জন্য ১০ শতাংশ কর প্রদান করাই যথেষ্ট ছিল। বর্তমানে নিয়মিত করের সঙ্গে ১০ শতাংশ জরিমানা দিতে হয়।
শেয়ার বাজারে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ রাখা হয়েছে মূলত বাজার চাঙ্গা রাখার জন্য। বৃহৎ পরিসরে দেখলে পুঁজিবাজার শক্তিশালী করার জন্য। পুঁজিবাজার শক্তিশালী থাকলে সাধারণ মানুষ তাদের ছোট ছোট সঞ্চয় বাজারে বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত হয়। এই ছোট সঞ্চয়গুলোই মেধাবী উদ্যোক্তাদের হাতে বড় পুঁজি হয়ে জমা হয়। উদ্যোক্তাগণ এই পুঁজি দিয়ে নিজেদের বড় বড় পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের সুযোগ পায়। সবচেয়ে বেশি সুবিধা পান সে সকল উদ্যোক্তা যাদের বড় বিনিয়োগ করার ক্ষমতা নেই। পুঁজিবাজার চাঙ্গা রাখার মূল মন্ত্রটা এখানে।
বাস্তবে বাংলাদেশে এমন আদর্শিক অবস্থা বিরাজ করে না। এখানে পুঁজিবাজারে শেয়ার ইস্যু করে সবচেয়ে বড় কর্পোরেট হাউসগুলো। এদের প্রধান উদ্দশ্য বাজার থেকে পুঁজি আহরণ নয়, বরং কম হারে কর প্রদান করা এবং নিজেদের বিনিয়োগের বাজার-দর বাড়ানো। এরা অত্যন্ত বড় মাপের পুঁজিপতি। শেয়ার বাজারে কালো টাকা ঢুকলে তাদের পুঁজির অংকই শুধু বাড়ে; সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ভাগে পড়ে সামান্যই।
কিছু নামসর্বস্ব কোম্পানি আছে যারা বাজারে শেয়ার ছাড়ে ভিন্ন উদ্দেশ্যে। তাদের প্রধান উদ্দেশ্য থাকে বাজার থেকে পুঁজি আহরণ করে কেটে পড়া। কালো টাকা তাদের কোম্পানিতে ঢুকলে এক দল আসাধু লোকের টাকা অন্য দল অসাধু লোকের পকেটে ঢুকে। অর্থাৎ কালো টাকার হাতবদল হয় মাত্র।
এসব ছাড়াও সামান্য কিছু কোম্পানি রয়েছে যারা প্রকৃত অর্থে বাজার থেকে পুঁজি আহরণ করে তা ব্যবসায় সম্প্রসারণের কাজে লাগায়। কালো টাকার বিনিয়োগের সুযোগ থাকলে এ রকম কিছু কোম্পানির যথাযথ উপকার হয়। প্রকৃতপক্ষে মেধাবী উদ্যোক্তাদের কাজে আসে বিনিয়োগকৃত কালো টাকা।
বাস্তবতা হচ্ছে, এ রকম কোম্পানিতে সাধারণত মানুষ বিনিয়োগ করে না। কারণ এদের শক্তি ও প্রচার-প্রসার কম, তাই তাদের শেয়ারের লেনদেনও কম। কালো টাকা সে ধরনের কোম্পানির শেয়ার কেনে না, বরং নামজাদা কোম্পানির দিকেই তাদের আকর্ষণ বেশি।
কালো টাকা সাদা করার আরেকটি বড় আইনি ক্ষেত্র হচ্ছে, বাড়ি, ফ্লাট এবং জমিতে বিনিয়োগ। কর আইনের ১৯ বিবিবিবিবি ধারায় বিশেষভাবে এ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সাধারণভাবে ১৯ ই ধারা রয়েছে। স্থাবর সম্পত্তিতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে অর্থনীতিতে কালো টাকা অন্তর্ভুক্ত করা যায় ঠিক, কিন্তু তা কতটুকু কার্যকর হয় সে প্রশ্ন থেকে যায়। ছোটখাট দুর্নীতিবাজরা এ সুযোগ নিয়ে থাকে। বড়রা দেশে নয় বিনিয়োগ করে ‘কর-স্বর্গে’– কানাডার ‘বেগমপাড়ায়’, মালয়েশিয়ার ‘সেকেন্ড হোমে’।
স্থাবর সম্পত্তিতে বিনিয়োগ হলে নির্মাণ শিল্প গতিশীল হয়; শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়। এ পর্যন্ত ঠিক থাকলেও এর একটা বড়সড় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। কালো টাকা বিনিয়োগের ফলে স্থাবর সম্পত্তির বাজার-দর বেড়ে যায়। বেশ কবছর ধরে এই খাতে কালো টাকা বিনিয়োগের ফলে স্থাবর সম্পত্তির দাম আইনি উপায়ে রোজগার করা লোকেদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে; দামের বেলুন তৈরি হয়েছে।
২০১১-১২ সালের দিকে সরকার বিভিন্ন উপায় অবলম্বন করে এই বেলুন কিছুটা চুপসে দিয়েছে। তখন থেকেই রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীরা এই খাতে বিভিন্ন সুবিধাদি চেয়ে আসছেন। এ বছর তারা দাবি জানিয়েছেন আগামী দশ বছরের জন্য এই খাতে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ।
স্থাবর সম্পত্তিতে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ার ফলে বড় বড় শহরগুলোতে, নামিদামি পাড়ায়, দামি দামি বাড়িঘরের মালিক হয়েছেন কালো টাকার মালিকরা। বৈধ উপায়ে রোজগার করা মানুষজন প্রান্তিক হয়ে পড়েছেন। ফলে দেশের নীতিনির্ধারণের উপর প্রভাব রাখছেন দামি পাড়ার দামি বাড়িতে বসবাস করা কালো টাকার মালিক সেই অসৎ মানুষরা।
আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় সরকারের দেওয়া আইনি সুযোগ নিয়ে কালো টাকা সাদা করে নিলে কালো টাকার মালিকদের সুবিধা হয়, তারা অন্ধকার জগত ছেড়ে আলোতে চলে আসতে পারেন, অর্থনীতির মূলধারায় এসে দেশজ উৎপাদনে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারেন।
বাস্তব পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। কালো টাকা দিয়ে যদি বেশি উপার্জন করা যায়, ছেলেমেয়েকে বিদেশে লেখাপড়া করানো যায়, কানাডায় বা মালয়েশিয়ায় যদি নিশ্চিত এবং উন্নত ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা যায়, ‘কর-স্বর্গে’ বিনিয়োগ করে যদি করের হাত থেকে রেহাই পাওয়া যায়, তবে কোন দুঃখে নিয়মিত কর এবং জরিমানা দিয়ে কালো টাকা সাদা করা হবে?
এমন কাজ কোনো বোকাও করবে না।
কালো টাকা মূলধারায় ফিরিয়ে নিয়ে আসতে হলে প্রথমেই দরকার কালো টাকা বানানোর পথগুলো বন্ধ করে দেওয়া, দুর্নীতি দমন করা, বিদেশে টাকা পাচারের পথ বন্ধ করা, কালো টাকা সাদা করার আইনি পথ বন্ধ করা এবং কালো টাকাওয়ালাদের আইনের আওতায় আনা। তারপর দরকার আইনের শাসন, উন্নত শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থানের ব্যবস্থা করা, লাভজনক বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টি করা।
কাজগুলো করা সহজ নয়। এগুলো বাস্তবায়ন তাৎক্ষণিকভাবে করা যায় না, অনেক সময় লাগে। সময় যতই লাগুক না কেন শুরুটা এখনই করা দরকার। প্রস্তুতিপর্ব শুরু করতে হবে কালো টাকা সাদা করার আইনি পথ বন্ধ করার মাধ্যমে। যে কাজটা এখনই, এই বাজেটে করা যায়। সরকার না চাইলে উচ্চ আদালতে একটা পাবলিক ইন্টেরেস্ট লিটিগেশন ঠুকে দিলে এই অপ-আইনটির হাত থেকে জাতির নৈতিকতা মুক্তি লাভ করতে পারে। সাব্বির আহমেদ , চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যাণ্ট ও অ্যাকটিভিস্ট । মতামত সংগ্রহ bdnews24.com

Comments are closed.