গৌরবের ১৫০ বছরে চট্টগ্রাম কলেজঃ আজ ‘সম্প্রতি মেলা-২০১৯’
দিলীপ তালুকদারঃ এটি এক দীর্ঘ পথচলা ১৫০ বছর ধরে চলতে থাকা এক আলোকময় রথের যাত্রা। এর সঙ্গেও যুক্ত আছেন ১৯ শতকের বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র সাহিত্য বিশারদ আব্দুল করিম, অতুল চন্দ্র দত্ত, শশাঙ্ক মোহন সেন, মহিম বন্ধোপাধ্যায়, প্রসন্ন কুমার আচার্য, বীর কন্যা কল্পনা (যোশী), মাস্টার দা সূর্যসেন, ক্ষীরোদরঞ্জন বন্দোপাধ্যায়, আব্দুর রহমান, ড. এনামুল হক, ড. মুহাম্মদ ইউনুচ, অধ্যক্ষ এ,এফ.এম. মোজাফ্ফর আহমদ, প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম, ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল খালেদ, শিক্ষাবিদ ড. আতাউল হাকিম, প্রফেসর মুহাম্মদ সিকান্দার খান, শিল্পপতি এ.কে. খান, রাজনীতিবিদ আতাউর রহমান কায়ছার।
এই নামের তালিকা যেমন সুদীর্ঘ, তেমনি উজ্জ্বল। নিজের কালকে ছাড়িয়ে মহাকালে ছাড়িয়ে পড়া, দেশ ছাড়িয়ে ভূবনজয় করা এসব নামের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে আছে চট্টগ্রামের একটি প্রতিষ্ঠান।
১৮৩৬ সালে চট্টগ্রাম জেলা স্কুল হিসেবে এই প্রতিষ্ঠানের জন্ম। প্রতিষ্ঠালগ্নের ৩৩ বছর পরে ১৮৬৯ সালে একে উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে উন্নীত করা হয়। তখন থেকেই এটি চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ বা চট্টগ্রাম কলেজ নামে পরিচিত হয়। বর্তমান চট্টগ্রাম এর চকবাজারের কলেজ রোডের পাশের প্যারেড গ্রাউন্ডের এক কোনের একটি পর্তুগিজ আমলের স্থাপনায় এই কলেজের কার্যক্রম শুরু হয়। কলেজে উন্নীত হবার পরে জনাব জে সি বোস এর প্রথম অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন।
১৯০৯ সাল থেকে এই কলেজে কলা বিভাগের পাশাপাশি উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে বিজ্ঞান বিভাগ চালু করা হয়। ১৯১০ সালে এই কলেজটি তৎকালীন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণীর ডিগ্রী কলেজের স্বীকৃতি লাভ করে। সেই অনুযায়ী এই কলেজ থেকে গণিত, রসায়ন বিজ্ঞান ও পদার্থ বিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতক (সম্মান) পর্যাযয়ের বিষয় সমূহ সম্পর্কে পাঠদান আরম্ভ হয়। ১৯১৯ সাল থেকে স্নাতক শ্রেণীর বিষয় সমূহে ইংরেজি এবং সম্পূরক শ্রেণীতে দর্শন এবং অর্থনীতি যোগ করা হয়।
১৯২৪ সালে এই কলেজে প্রিন্সিপাল নিযুক্ত হন শামসুল ওলামা কামালুদ্দিন আহমদ। শেরে বাংলা এ, কে, ফজলুল হক এই সময়ে মুসলিম হোস্টেল এর ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। শামসুল ওলামার সময়েই কলেজ ম্যাগাজিন প্রকাশ করার রেওয়াজ শুরু হয়। তার সমযের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হচ্ছে সহশিক্ষার প্রবর্তন। ১৯২৬ সালে এই কলেজের প্রথম ছাত্রাবাস প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৯৫৫ সালে স্নাতক শ্রেণীর যাবতীয় বিষয় সমূহ প্রত্যাহার করা হলেও ১৯৬০ সাল থেকে পুনরায় ইংরেজি, বাংলা, অর্থনীতি ছিত্তাগন, পদার্থ, রসায়ন এবং গণিতে স্নাতক (সম্মান) শ্রেণীর বিষয় সমূহ চালু করা হয়। ১৯৬২ সাল থেকে প্রাণিবিদ্যা, উদ্ভিদবিদ্যা এবং পরিসংখ্যান এ স্নাতক (সম্মান) শ্রেণী চালু করা হয়।
১৯৫৫ থেকে ১৯৬৫ এর মাঝে ব্যাপক হারে অবকাঠামোগত পরিবর্তন ও পরিবর্ধন সাধন করা হয়। তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের দ্বিতীয পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার অধীনে এর বিজ্ঞান গবেষনাগার এর উন্নয়ন সাধন, নতুন প্রশাসনিক ভবন নির্মাণ, নতুন ছাত্রাবাস নির্মাণ এবং পদার্থ, রসায়ন ও জীববিজ্ঞান অনুষদের জন্য আলাদা ভবন নির্মাণ করা হয়। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর চট্টগ্রাম কলেজ এর আওতাভুক্ত হয়।
শিক্ষাবিদ, রাজনীতি, প্রশাসন, অর্থনীতি, খেলাধুলা, বিজ্ঞান, সাহিত্য, খেলাধুলা, বিনোদন, চিকিৎসাবিদ্যাসহ নানা ক্ষেত্রে অবদান রেখেছেন এরকম অসংখ্য মানুষ এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বের হয়ে। আর এসব কীর্তমান মানুষের কলেজের স্মৃতি নিয়ে যদি একটি মালাগাথা হয়, তবে তা থেকেই উঠে আসতে পারে একটি জাতির পুরো ইতিহাস। জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাত বহু মনীষীর শৈশবের স্মৃতি এই কলেজের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে।
চকবাজারের প্যারেড ময়দানের দক্ষিণে ১৮৬৯ সালে সরকারি এফ এ কলেজ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৩৬ সালে প্রতিষ্ঠিত চট্টগ্রাম জেলা স্কুলকে সেকেন্ড গ্রেড কলেজের মর্যাদা দিয়ে উক্ত সনে এফ এ ক্লাস চালু করা হয়। এফ.এ. কলেজে রুপান্তর ১৫০ বছর ধরে প্যারেড কর্ণারে দক্ষিণে কলেজটির চেহারার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। শুধু রেড বিল্ডিংটি দাড়িয়ে থাকলেও বেড়েছে দালান, প্যারেডে ময়দানের চেহারা, কলেজের চারিদিকে বাউন্ডারী‘, নতুন শহীদ মিনার, লাইব্রেরী, অডিটোরিয়াম।
একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় সম্পদ হয় শিক্ষকেরা। চট্টগ্রাম কলেজের শিক্ষকেরা যুগ যুগ ধরে শিক্ষার্থীদের সামনে অনুসরণীয় হয়ে থেকেছেন। জে সি বোস, সি এম মজুমদার, পি সি কুত্তু, জে আর বরো, আবু হেনা, ড. এনামুল হক, মোঃ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, এম শামছুর রহমান, ড. আশরাফ সিদ্দিকী, ড. মোঃ মোজাম্মেল হক, মোঃ আব্দুল মন্নান, এস.এ. মতিন উদ্দিন, আর পিভি রুদ্র বাহাদুর, এম জহুরুল ইসলাম, কে সি ভট্টাচার্য’র মতো শিক্ষকদের নিয়ে প্রত্যেক প্রজন্মেরই কোনো না কোন গল্প আছে।
তবে এই কলেজের আরও যে একটি দিক হলো স্বাধীনতা ভোগ করার অলিখিত ঐতিহ্য। পড়ার বইয়ের বাইরের বই পড়া, খেলাধুলা লুকিয়ে আড্ডা দেওয়া, সিনেমা দেখাসহ নানা কান্ডকীর্তির মধ্য দিয়ে বইয়ের জগৎটাকে চেনার সুযোগ হতো। এতে লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহ কিছু মাত্র কমত না কারও। বছর শেষে ফলাফল ছিল তার প্রমাণ। কলেজটিতে ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার। শিক্ষকের সংখ্যা ১৫৭ জন। ১৭ টি বিষয়ে অনার্স ও ১৮ টি বিষয়ে মাষ্টার্স পড়ানো হয়। ২০ একর জমির উপর অবস্থিত কলেজটির সাবেক ছাত্র ও চট্টগ্রাম জর্জ কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ হাবিবউল্লাহ (বায়েজীদ) বলেন, কলেজটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের বহু স্মৃতি। এই কলেজের ছাত্র হতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করি।
চট্টগ্রাম কলেজ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগ আজ সম্প্রতি মেলাঃ
গৌরবের ১৫০ বছর উপলক্ষে প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের নিয়ে চট্টগ্রাম কলেজ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আজ বৃহস্পতিবার (২৬ ডিসেম্বর) চলছে “সম্প্রতি মেলা ২০১৯” নগরীর জিইসি কনভেনশন হলে। অনুষ্ঠানের ১ম পর্বে থাকবে চট্টগ্রাম কলেজের মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মাননা, প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে সাংস্কৃতিক কর্মসূচী। দ্বিতীয় পর্বে থাকবে আমন্ত্রিত শিল্পীদের পরিবেশনা। এছাড়াও রয়েছে ক্যাডেট ফোরামের উদ্যোগে বিনামূল্যে রক্তের গ্রুপ নির্ণয় ও রাইফেল ড্র।
