ঢাকা : মনোনয়ন দাখিলের মধ্যে দিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মাঠ সরগরম হয়ে উঠেছে। পাড়া-মহল্লায় সবখানেই নির্বাচনী উৎসব বিরাজ করছে। তবে চারদিকে নির্বাচনী ঢামাঢোল চললেও তৃণমূলের এই নির্বাচনে অনেকটাই নীরব ও শীতল ভূমিকায় রয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
মিছিল, শোডাউন জমায়েত পথসভা ছাড়াও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও তাদের সমর্থকের উপর হামলা-হুমকি, মনোনয়নপত্র জমাদানে বাধা প্রদান এবং মনোনয়ন বঞ্চিতদের নানা কর্মসূচী পালনের মধ্যে দিয়ে প্রথম ধাপের ৭৩৯ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) মনোনয়নপত্র দাখিলের সময়সীমা শেষ হয় সোমবার।
ইসি কর্মকর্তারা জানান, ১ম ধাপের ইউপি নির্বাচনের মনোনয়ন দাখিল শেষ হয়েছে। এখন যাছাই-বাছাই শেষে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী নির্ধারণ করা হবে। প্রার্থী চুড়ান্ত হলেই নির্বাচন মনিটরিং করা হবে, তার আগে অভিযোগ থাকলেও তা মাঠ কর্মকর্তাদেরই সামলাতে হবে।
ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় বিধি-নিষেধ ভুলে নিজেদের ইচ্ছামতো নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছে। বিভিন্ন দল ও প্রার্থীদের পক্ষে হাজারো অভিযোগ থাকলেও সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ না পাওয়ায় কোনো পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না ইসির পক্ষ থেকে।
অন্যান্য নির্বাচনের মতো এই নির্বাচনে এখনও দৃশ্যমান কোনো তদারকির পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি নির্বাচন কমিশন। তফসিলের ঘোষণার সঙ্গে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েই আপাতত হাঁফ ছেড়েছে কমিশন। সাংবিধানিক এ সংস্থাটির কার্যক্রম দেখে এমনটাই মনে করছেন অনেকে।
ইউপি নির্বাচন সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে সোমবার ইসি সচিব সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘নির্বাচনের পরিবেশ অন্তত ভাল রয়েছে। এবারে নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হবে। তবে কোনো অনিয়ম হলে বা কারো কাজে বাধা দেয়া হলে সুনির্দিষ্টভাবে লিখিত অভিযোগ করলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এখনো পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি।
১ম ধাপের তফসিল ঘোষণার ১০ দিন পর ইউপি নির্বাচনের কাজ ভাগ করে দিল নির্বাচন কমিশন। ইসি সচিবালয় কর্মকর্তাদের আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ও জেলা নির্বাচন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলে জানান ইসি সচিব।
ইসি সচিব বলেন, ‘আজ থেকে (সোমবার) ইউপি নির্বাচন তদারকির জন্য নির্বাচন সচিবালয় থেকে নির্বাচন পরিচালনা শাখা ১, নির্বাচান পরিচালনা শাখা-২ ও আইন শাখার মধ্যে কাজ ভাগ করে দেয়া হয়েছে। এই শাখাগুলোকে সমন্বয় করে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট পরিপত্র জারি, সিডি প্রস্তুত আচরণবিধি প্রতিপালন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনুকূলে রাখার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অফিস সময়ের পরেও তাদের কাজ করারও নির্দেশ দিয়েছি আমরা।’
ইসি সূত্র জানায়, ইউপি নির্বাচনে সীমানা জটিলতা, অন্য এলাকার ভোটার আরেক এলাকার প্রার্থী, মনোনয়ন জমাদানে বাধাসহ ১শ’টির মতো অভিযোগ এসেছে। এখনো পর্যন্ত এসব অভিযোগ কমিশন সভায় উপস্থাপন করা হয়নি। এ অভিযোগগুলো নিয়ে কোনো কমিশন সভাও অনুষ্ঠিত হয়নি।
বিগত উপজেলা ও পৌর ভোটে ইসি সরাসরি তদারকি করলেও তেমন সুফল পাওয়া যায়নি। আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে কয়েকজন ভিআইপিকে চিঠি দেয়া হয়। এলাকা ছাড়ার নির্দেশও দেয়া হয় কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। ইসির প্রাথমিক নির্দেশনাও কোথাও মানা হয়নি।
এ নির্বাচনের শুরুর দিক থেকেই ইসির শীর্ষ কর্মকর্তারা গা ছাড়া ভাব রয়েছে। পরপর দু‘দফা তফসিলে যেমন কোনো কর্মকর্তারা ছিলেন না তেমনি অন্তত অর্ধডজন নির্বাচনী কাজে ধরা পড়েছে কর্মকর্তাদের অসাবধানতা ও ভুল। এতে নির্বাচন মনিটরিংয়ে ইসির সদিচ্ছা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দায়িত্বপ্রাপ্ত একাধিক উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা বাংলামেইলকে জানান, তারা উভয় সংকটে রয়েছেন। একদিকে আচরণবিধি লঙ্ঘন অন্যদিকে ব্যবস্থা নেয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে নানা ঝুটঝামেলা। তাই কোনো এ্যাকশনের পরিবর্তে যতটা শান্ত পরিবেশ রাখা যায় সেই চেষ্টাই চালাচ্ছেন তারা। এখন পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন থেকে তাদের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন আসে নি বলেও জানান তিনি।
মাঠ কর্মকর্তাদের মতে, পৌরসভা নির্বাচনে আচরণবিধি লঙ্ঘনের লিখিত অভিযোগ নেয়ার পরে বাড়তি ঝামেলায় পড়তে হয়েছে। ফলে এবারে লিখিত অভিযোগের ক্ষেত্রেও নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। এছাড়া মনোনয়নপত্র বিতরণ ও জমা গ্রহণের কারণে বাড়তি চাপে রয়েছেন তারা। ২ মার্চ পর্যন্ত এই ঝামেলা থাকবে। এরপরে মাঠ মনিটরিং করা হবে।
প্রথমবারের মতো দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদের জন্য আওয়ামীলীগ-বিএনপিসহ ১৯ টি রাজনৈতিক দল প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস দিয়েছেন। এছাড়া অনেকেই স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিবেন। চেয়ারম্যান পদে দলভিত্তিক নির্বাচন হলেও সদস্য ও সংরক্ষিত সদস্য পদে আগের মতো নির্দলীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
উল্লেখ্য, এবার সারাদেশে ছয় ধাপে ইউপি ভোট হচ্ছে। দ্বিতীয় ধাপের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, ৬৮৪ ইউপিতে ২ মার্চ পর্যন্ত মনোনয়ন জমার শেষ দিন, ভোট ৩১ মার্চ। এর পরে যথাক্রমে চার ধাপে ২৩ এপ্রিল ৭১১টি, ৭ মে ৭২৮টি, ২৮ মে ৭১৪টি এবং ৪ জুন ৬৬০টি ইউপিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
