বাঁশখালীতে বিদ্যুৎ কেন্দ্র : শাসকদলের প্রেস্টিজ ইস্যু

গোলাম শরীফ টিটু /গোলাম সরওয়ার : বাঁশখালীতে এস আলম গ্রুপের কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মানকে কেন্দ্র করে প্রতিবাদ বিক্ষোভ ও ৪ জনের প্রাণহানির পর সরকারের অবস্থান ষ্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গত ৯ এপ্রিল শনিবার জেলার বোয়ালখালীতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের বাইরে কোন ধরনের নৈরাজ্য সহ্য করা হবে না বলে হুশিয়ারী দেন। এর একদিন পর ১০ এপ্রিল বাঁশখালীতে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র বিরোধী তৎপরতার কঠোর সমালোচনা করেন খোদ প্রধানমন্ত্রী এবং জ্বালানী উপদেষ্টা তৌফিক ই এলাহী। এ নিয়ে জ্বালানী উপদেষ্টা বলেছেন, বাঁশখালীতেই হবে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র। বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বেসরকারী উদ্যোগে বাস্তবায়নের কথা থাকলেও এ ক্ষেত্রে সরকারের কঠোর অবস্থানের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অবশ্য কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিরুদ্ধে এলাকাবাসীর আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী গন্ডামার ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা লেয়াকত আলী বলেছেন, ’ইতিমধ্যে ৪ জন নিরীহ প্রতিবাদকারী লাশ হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও অনেকে। এ অবস্থায় সরকার কি আরও লাশ চায়? বসতভিটা ও কবরস্থান রক্ষা কমিটির আহবায়ক লেয়াকত আলী আরও বলেন,’আমার বিশ্বাস মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গ্রামবাসীদের মতামতকে গুরুত্ব দেবেন। বড়লোকের পক্ষে ওনার অবস্থান হবে না বলে আমরা বিশ্বাস করতে চাই। তিনি বলেন,’এর পরও যদি গায়ের জোরে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মান করার চেষ্টা করা হয় তাহলে গন্ডামারা তথা বাঁশখালীর মানুষ হতাশ হবেন। আর এ হতাশা থেকে আবারও আন্দোলনকেই জীবন মরণ লড়াই হিসেবে বেছে নেবেন। এদিকে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মান নিয়ে আলোচনা সমালোচনার এ পর্যায়ে এবার গন্ডামারা ইউনিয়ন বাঁচাও আন্দোলন নিয়ে মাঠে নামার ঘোষনা দিলেন সাবেক সিটি মেয়র ও বাঁশখালী থেকে তিনবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী। এ নিয়ে তিনি ২০১ জনের একটি কমিটিও গঠন করেছেন। এ কমিটি কয়লা বিদ্যুৎ বিরোধী বলে নিশ্চিত করেছেন সংগঠনের নেতারা।

এতে সভাপতি করা হয়েছে উল্লেখিত ঘটনায় নিহত আনোয়ার হোসেন প্রকাশ আংকুর আলী ও মর্তুজা আলীর ভাই বদি আহমদ কে। সাধারন সম্পাদক হিসেবে রাখা হয়েছে আব্দুল মালেক কে। অন্যদিকে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পক্ষে ঘটনার ছয়দিন পর ’শান্তি সমাবেশের মাধ্যমে’ ব^াঁশখালী থানা সদরে সমাবেশ করেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী। তবে ঘটনার পর এখনো তিনি ঘটনাস্থলে যাননি বলে নিশ্চিত করেছেন এলাকাবাসী। কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে সংঘর্ষের ঘটনায় নিহতদের স্মরনে ও এলাকার শান্তিপুর্ন পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাঁশখালী উপজেলা আওয়ামী লীগের উদ্যোগে উপজেলা সদরে অনুষ্টিত শান্তি সমাবেশে স্থানীয় সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী বলেন, সরকারের উন্নয়নমুলক কর্মকান্ডে ঈর্ষান্বিত হয়ে কতিপয় রাজনৈতিক দলের নেতারা এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। তারা জনগনকে ভুল বুঝিয়ে আন্দোলনে নামিয়েছে।যারা এই রক্তক্ষয়ী খেলায় মেতেছে তদন্তপুর্বক সকলকে বিচারের আওতায় আনা হবে বলেও তিনি জানান। সাংসদ আরও বলেন, দেশের বৃহত্তম প্রকল্প কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতামত নিয়েই সরকার উদ্যোগ গ্রহন করবে।

কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে কোন মহল অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির পায়তারা করলে সরকার বরদাস্ত করবে না। গত ১০ এপ্রিল অনুষ্টিত এ শান্তি সমাবেশে পৌরসভা আওয়ামী লীগের যুগ্ন আহবায়ক নীলকন্ঠ দাশের সঞ্চালনায় অনুষ্টিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন পৌর মেয়র ও মুক্তিযোদ্ধা শেখ সেলিমুল হক চৌধুরী। সমাবেশে বক্তব্য রাখেন, দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের শ্রম বিষয়ক সম্পাদক খোরশেদ আলম, উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সুভাষ আচার্য্য, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক অধ্যাপক আবদুল গফুর, সাংগঠনিক সম্পাদক মহিউদ্দিন চৌধুরী খোকা, দপ্তর সম্পাদক শ্যামল দাশ, আওয়ামী লীগ নেতা আবু সৈয়দ, সুলতানুল গনি চৌধুরী (লেদু মিয়া), মুজিবুল হক চৌধুরী, মাষ্টার শামসুল আলম, নুরুল মোস্তফা চৌধুরী সংগ্রাম, জিল্লুল করিম শরিফী, কফিল উদ্দিন, আবদুল জলিল, উপজেলা যুবলীগের আহবায়ক মোজাম্মেল হক সিকদার, যুগ্ন আহবায়ক অধ্যাপক তাজুল ইসলাম, উপজেলা ছাত্রলীগ সভাপতি ইমরানুল হক এমরান ও সাধারন সম্পাদক ফয়সাল জামিল চৌধুরী ছাকি প্রমুখ। জানা গেছে, দেশের বৃহত্তম এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি পরিবেশ ছাড়পত্র না পেলেও এক সপ্তাহের মধ্যে পরিবেশ ছাড়পত্র নিশ্চিত হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এদিকে একই দিন দুপুরে ঢাকায় অনুষ্টিত এক অনুষ্টানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে কোন ক্ষতি হয় না।

উদ্ভট কথা বলে অযথা কিছু মানুষের জীবন নেয়া হল। এর পর বিকেলে রাজধানীর বিদ্যুৎ ভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানী উপদেষ্টা ড. তৌফিক ই এলাহী জানান, এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মানে সরকারের পুর্ন সমর্থূন রয়েছে। কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র বিরোধীদের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, অক্সফোড থেকে শুরু করে সারাবিশ্বে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে। অথচ এখানে উদ্ভট কথা বলে অযথা কিছু মানুষের জীবন নেয়া হল। এটা খুবই দু:খজনক। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন,’বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প করতে গেলেই এক শ্রেনীর লোক পরিবেশ রক্ষার জন্য তৎপর হয়ে উঠেন। তারা কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র করতে দেবে না। প্রথমবার যখন আমি ছিয়ান্নব্বই সালে ক্ষমতায় ছিলাম,তখন দিনাজপুরে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মানের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করি। সেখানে দুটো বিদ্যুৎ কেন্দ্র আছে। তৃতীয়টার কাজ চলছে। এলাকার কোন ক্ষতি হয়নি বরং জমির উর্বরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ধান-পান হচ্ছে, গাছপালা হচ্ছে-সব হচ্ছে। মানুষ বসবাস করছে।এলাকাবাসীর আপত্তি থাকলেও বাঁশখালীর কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মানে সরকারের সমর্থন রয়েছে বলেন জানিয়েছেন পধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ ও জ্বালানী উপদেষ্টা ড. তৌফিক ই এলাহী। তিনি বলেন,’কাছেই সমুদ্র এবং আবাসন কম ফলে সবদিক বিবেচনায় বাঁশখালীতে নির্ধারিত স্থানেই বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মানে সরকারের পুর্ন সমর্থন রয়েছে।

এ নিয়ে লেয়াকত আলী বলেন,’কয়লা বিদ্যুৎ যদি পরিব্শেবান্ধব হয়ে থাকে। এতে যদি কোন ক্ষতি না হয় তাহলে এটি গুলশান বনানীর মত স্থানে হলে অসুবিধা কিসের? লেয়াকত আলীর বক্তব্য অনুযায়ী, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা সরেজমিন পরিদর্শন করে তদন্তপুর্বক প্রতিবেদন দিলে সেটা জনসম্পুখে প্রকাশ করবেন। প্রতিবেদনে পরিবেশ ও মানুষের কোন ক্ষতি হবে না এমন নিশ্চয়তা এ প্রকল্পে থাকতে হবে। প্রসঙ্গত গত ৮ এপ্রিল শুক্রবার আয়োজিত এক সমাবেশ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পরদিন শনিবার সন্ধ্যা ৬ টা পর্যন্ত সময় বেধে দিয়ে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবী জানিয়েছিলেন লেয়াকত আলী। তবে এই সময় শেষ হওয়ার আগেই আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল্লাহ কবির লিটন ও বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা এএসপি কামরুল হাসানের সাথে আলোচনার পর কাপনের কাপড় পড়ে উপজেলা কার্যালয় ঘেরাও কর্মসুচী ১৫ দিনের জন্য স্থগিত করেছিল ’বসতভিটা ও কবরস্থার রক্ষা কমিটি’।

জানা যায় ’আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল্লাহ কবির লিটনের সঙ্গে শান্তিপুর্ন আলোচনার পর গন্ডামারায় শান্তি শৃঙ্খলা ফিরে আসে। তিনি ক্ষতিগ্রস্থদের ক্ষতিপুরনের ব্যবস্থা সহ সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিলে আতঙ্কগ্রস্থ গন্ডামারার মানুষের মধ্যে শান্তি ফিরে আসে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বাঁশখালীর বিশিষ্ট আইনজীবি আ.ন.ম শাহাদত আলম। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকবর্গের মতে, ’বাঁশখালীতে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মান সরকার তথা আওয়ামী লীগের জন্য যেমন প্রেস্টিজ ইস্যু, তেমনি বিরোধী দলের অনেক ডাকসাইডে নেতাও নেপথ্যে রসদ জোগাচ্ছেন।

যাতে একটি সরকার বিরোধী ইস্যু পাওয়া যায়। ইতিমধ্যে ঘটনাস্থলে গেছেন, নগর বিএনপির সভাপতি আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান, দক্ষিণ জেলা বিএনপি সভাপতি জাফরুল ইসলাম চৌধুরী। এ সময়ের ডাকসাইডে জাতীয় পার্টির নেতা ও সাবেক মেয়র মাহামুদুল ইসলাম চৌধুরী তো বিদ্যুত কেন্দ্র বিরুদ্ধে কমিটিও করে দিলেন। সর্বশেষ এই রিপোর্ট লেখার সময়, চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এ.বি.এম মহিউদ্দিন চৌধুরী চট্টগ্রামের সর্বস্থরের জনগনের ব্যানারে বাঁশখালীতে বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মানে বাধা প্রদানের প্রতিবাদে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব চত্তরে মানববন্ধন করেছেন। তিনি বলেছেন, সরকার চায় বিদ্যুৎ সংকট নিরসন করতে, আমরা আশা করেছিলাম বাঁশখালীর বিদ্যুৎ কেন্দ্র হলে বিদ্যুৎ সংকট নিরসন হবে। কিন্তু সেখানে বিএনপি জামায়াতের এজেন্ডা বাস্তবায়নের সুযোগ কাউকে দেয়া হবে না বলে হুশিয়ারী উচ্চারন করেন।

এ বিভাগের আরও খবর

Comments are closed.