আবছার উদ্দিন অলি –
আধুনিক গান সংগীতের প্রাণ। সংগীত চর্চার মূল ভিত্তি। সংগীতের বিভিন্ন শাখা প্রশাখার মধ্যে আধুনিক গান গাওয়া ও বেতার টিভিতে আধুনিক গানে তালিকাভুক্ত হওয়া সবচেয়ে কঠিন ও কষ্ট সাধ্য বিষয়। মেলোডি ধারার সুর প্রদান গান গুলো শ্রোতাদের মনে দাগ কাটে চিরস্থায়ী হয়। তখন একটি গানে গীতিকার, সুরকার ও শিল্পীর সমন্বয় ঘটতো যথাযথভাবে। যার কারনে সুন্দর করে ফুটে উঠত আধুনিক গান। সময়, চিন্তা, চেতনা, মানসিকতা ছিল ভাল কাজের, ছিলনা অস্থিরতা। মূলত অস্থিরতা, তাড়াহুড়ো আর সংখ্যা বাড়াতে গিয়ে আধুনিক গানের গুনগত মান হারাচ্ছে। দর্শকদের রুচি ও মন চলে যাচ্ছে ভিন্ন পথে। হারানো দিনের গানগুলো এখনও প্রাণ হয়ে বেঁচে আছে। গানের আবেদন মানুষের চিরন্তন।
যদি সে গানের কথা ও সুর সবার মুখে মুখে ফিরে তখনি সেই গানের শ্রম সুন্দর ও সার্থক হয়। তেমনি এক গানের জম্পেশ আড্ডা ও আলাপচারিতায় হয়ে গেলো গত ২৮ এপ্রিল সন্ধ্যা হাটখোলায়। তুমি যদি থাকো পাশে বেশ কিছু সংগীত প্রেমির উপস্থিতিতে সংগীত পরিবেশন করেন জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী আবদুল মান্নান রানা, ফাহমিদা রহমান, সূবর্না রহমান, দিদারুল ইসলাম ও মুন্না ফারুক। অনুষ্ঠানের শুরুতেই বক্তব্য রাখেন কবি স.খ বখতিয়ার বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্রের জেনারেল ম্যানেজার জাঁ নেসার ওসমান। অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রখ্যাত সুরকার সংগীত পরিচালক বাসু দেব ঘোষ সুরারোপিত গীতিকার জহুরুল ইসলামের লেখা খ্যাতিমান শিল্পী চম্পক বণিকের একটি গান শোনানোর পরপরই আবৃত্তি শিল্পী উপস্থাপক দিলরুবা খানমের সঞ্চালনায় প্রথমে শিল্পী মুন্না ফারুক ফরিদ বঙ্গবাসীর সুরের ‘যখন রাতের আকাশ চাঁদের আলোই জলে’ গানের মধ্যে দিয়ে সূচনায় পরে সূবর্ণা রহমান গেয়ে শোনান জহুরুল ইসলামের লেখা ও তাপস কুমার বড়ুয়ার সুরে টিপ টিপ বৃষ্টি দেখা হলো মেঘের সাথে তোমাকে বড় পড়ছে মনে চমৎকার কথায় গানটি শোনান। পরে ‘এই বৈশাখে নতুন দিনে’ সুর তাপস কুমার বড়ুয়া সুর গান দু’টা গেয়ে শোনান। এরপর শিল্পী দিদারুল ইসলাম ও ফরিদ বঙ্গবাসীর সুরে এ-চমৎকার গানটি ‘ভবের এ-নাট্যশালায় কে সুখি কে মহাজালা এ-গানে কথাও সুরে মুন্সিয়ানার পরিচয় মেলে। পরে ফাহমিদা রহমান গেয়ে শোনান ‘মেঘ ছূঁয়েছে নীলগীরি’ সুর-মোঃ আবু তাহের চিশতি, সব শেষে খ্যাতিমান কন্ঠশিল্পী আবদুল মান্নান রানা সুরে জহুরুল ইসলাম লেখা গান ‘তুমি যদি থাকো পাশে’ পৃথিবীর কোন সুখ চাইনা আমি’ এ-গানটির মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের শেষ হয়।
তবে এরি মাঝে বিটিভির সাবেক মহাপচিালক পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ও সচিব বরেণ্য কবি আসাদ মান্নান তিনি তার বক্তব্যে বলেন, আজকের গীতিকার জহুরুল ইসলামের গানের ছন্দময়তা বেশি গানের কথার সুরে সংমিশ্রনের আমাকে মুগ্ধ করে। সুরের যে শক্তি সৌন্দর্য্য ও বোধই আমাদের মনের কালিমা দূর করতে সহায়তা করে, সুস্থ সমাজ তৈরি ও বির্নিমানে সংস্কৃতির আসল জাগায় রপ্ত করে তার আসল লক্ষ্যে পৌছুতে পারি। এক সময় কবি জাহিদুল হকের গানের কথা যে মাধুর্য্যতা ছিলো তার অবয়ব বর্ণনা তিনি তুলে ধরেন। তিনি আরো বলেন, প্রথমবারে মতো ‘হাটখোলা’ একই গীতিকারের অনুষ্ঠানের করে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিল। পরে জাঁ নেসার ওসমান বলেন, চট্টগ্রামের সব সৎ ও গুনী শিল্পীদের বিটিভি চট্টগ্রামের কেন্দ্রের প্রয়োজন। শিল্পীরা রাস্তায় জি.এম হটাও আন্দোলন না করে ৬ ঘন্টা স¤প্রচারের আন্দোলন করলে চট্টগ্রাম এগিয়ে যাবে। গীতিকার জহুরুল ইসলাম বলেন, গান শোনাতে প্রচুর সময় কেটেছে আমার। লেখা শুরু হল অনেক দেরিতে। দেরিতে হলেও কিছু ভালো গান যদি হয় তবে এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বেশি সুখের বিষয় হবে। সকল সৃষ্টিশীলতার মুলে ভালোবাসা। ভালোবাসা থেকে গানে জড়ানো। এক ঘন্টা এ-অনুষ্ঠান প্রাণভরে উপভোগ করে দর্শকরা, তিনশত শ্রোতা না হলেও ত্রিশজন শ্রোতাই যথেষ্ট। গানই মানুষকে হৃদয় আলোকিত করে। অনুষ্ঠানে চমৎকার ভাবে তবলা বাজিয়েছেন কানু চক্রবর্তী কিবোর্ডে মিশন চক্রবর্তী গীটারের মিশন। দর্শকের করতালির মুখরিতের মধ্যে এ-প্রাণময় গানের সুরসন্ধ্যা সত্যি সকল আলোকিত করেছে। এ-ধরনের ব্যক্তিক্রমধর্মী আয়োজনের জন্যে হাটখোলার ব্যবস্থাপক কবি ইউসুফ মুহাম্মদকে সাদুবাধ জানাতে হয়। উপস্থিত ছিলেন- সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শিক্ষাবিদ হাসিনা জাকরিয়া বেলা, সাংবাদিক জাহিদুল করিম কচি, রাজনীতিবিদ খালেদা আক্তার চৌধুরী, শিল্পী ও গীতিকার ইকবাল হায়দার, শিল্পী ফরিদ বঙ্গবাসী, গীতিকার অধ্যাপক পংকজ দেব অপু, গীতিকার ফারুক হাসান, গীতিকার ও সাংবাদিক আবছার উদ্দিন অলি। সাংস্কৃতিক সংগঠক আমিনুল হক বাবু, সমাজকর্মী মোস্তফা আনোয়ারুল ইসলাম, সাংবাদিক নিযামউদ্দিন, সাংবাদিক শামীম আরা লুসি, সাংবাদিক ইয়াসমিন ইউসুফ, খ্যাতিমান আলোচিত্রী শোয়েব ফারুকী, অধ্যাপক হোসাইন কবির, সেলিম আকতার পিয়াল, কন্ঠশিল্পী বোরহান উদ্দিন চৌধুরী টিপু ও সাংবাদিক গোলাম সরোয়ার, মডেল রিজভী হাসান সাকিব প্রমুখ।
ভয়ের কিছু নেই। যাত্রা আবার শুরু করতে হবে পিছন থেকে যেখান থেকে আমরা সরে এসেছি। দৈন্যের মাঝে আশার আলো দেখছি। অনেক ভালো রচয়িতা আছেন, সুরকারও আছেন শিল্পীও আছেন। দরকার শুধু একনিষ্ঠতা। বাংলা আধুনিক গানে রচনা, সুর ও শিল্পীর ভূমিকায় যদি একনিষ্ঠতা আসে তবেই আমরা এ সংকট কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবো। হাজার প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছি নিজেই নিজের কাছে। হৃদয়ের সাথে মনের বিবেকের দ্বন্দ্ব। আশ্চর্য্য হতে গিয়ে থমকে যাচ্ছি ভাবতে গিয়ে ভুলে যাচ্ছি এই জন্য যে, বাস্তব জীবনে চলার পথে যে বিষয়টি নিয়ে প্রতিনিয়ত ব্যথিত হচ্ছি কষ্ট পাচ্ছি। সুকুমারবৃত্তি, ওটা না থাকলে কিছুই হবে না। মনে রাখতে হবে, গান-বাজনা কেন, যে-কোন শিল্পেই, সাফল্যের শর্টকাট কোন পথ নেই। সাধনা অপরিহার্য। আরও একটা কথা মনে রাখা দরকার টাকার জোরে শিল্পপতি হওয়া যায় কিন্তু শিল্পী হওয়া যায় না। আমরা সবাই আন্তরিক হলে আধুনিক গানের যে বেহাল দশা তা থেকে উত্তরণ ঘটানো সম্ভব হবে। হাজারো সমস্যা প্রতিকুলতার মাঝে ভাল গান, ভাল সুর হবে এটাই প্রত্যাশা রাখি।

Comments are closed.