৬০দিনের মধ্যে জায়গা বুঝিয়ে দিতে ডিসিকে হাইকোর্টের নির্দেশ

জামাল জাহেদ, ককসবাজার : কক্সবাজারের কস্তুরিঘাট থেকে মহেশখালী চ্যানেল ও ঘাট পর্যন্ত নদীর দু’পাড়ের ১৪৬৮ একর জায়গা বিআইডব্লিউটিএ’কে বুঝিয়ে দিতে জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। এর মধ্যে কক্সবাজাপরের ৮২১ একর এবং মহেশখালীর ৪৪৭ একর জমি রয়েছে।২০১৩ সালে জৈনিক মো: রাইহানুল মোস্তফার দায়ের করা মামলায় গত ৬ই মার্চ ২০১৬ মহামান্য হাইকোর্ট এর বিচারপতি জোবায়ের রহমান চৌধূরী এবং বিচারপতি মো: কামরুজ্জামান বেঞ্চ নির্দেশ দেন রায়ের কপি পাওয়ার ৬০ দিনের মধ্যেই কক্সবাজার জেলা প্রশাসক উক্ত জায়গা বিআইডব্লিউটিএ’র কাছে হস্তান্তর করতে হবে এবং আদালততে অবহিত করতে হবে।

জানা যায়,দীর্ঘদিন ধরে কক্সবাজার বাঁকখালী নদীর তীরে (কস্তুরিঘাট) অভ্যন্তরীণ নদী বন্দর নির্মাণে প্রস্তাবিত জায়গা দখল করে রেখেছে ৫১ প্রভাবশালী।এদের মধ্যে বর্তমান ও সাবেক জনপ্রতিনিধি, আওয়ামী লীগ নেতা ও ব্যবসায়ী রয়েছেন। দখল করা জায়গায় গড়ে তোলা হয়েছে বরফকলসহ বিভিন্ন স্থাপনা। বাঁকখালী নদীর পাশ দখল করে নির্মিত এসব স্থাপনা ভাড়া দিয়ে প্রতি বছর আদায় করা হচ্ছে লাখ লাখ টাকা।
বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে মিশে যাওয়া বাঁকখালী নদীতে দখলের পাশাপাশি দূষণের মাত্রা বেড়েছে মারাত্মকভাবে। এভাবেই অবৈধ প্রতিযোগিতার মুখে পড়ে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে নদীটি।

বিআইডব্লিউটিএ সূত্র জানায়, মিয়ানমারের সঙ্গে আমদানি-রফতানিকে সহজ করতে ২০১০ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি বাঁকখালী (কস্তুরিঘাট) নৌ বন্দর স্থাপনে গেজেট প্রকাশ করা হয়। কস্তুরিঘাটকে নদী বন্দর ঘোষণাপূর্বক বিআইডব্লিউটিএকে নদী বন্দরের সংরক্ষক নিযুক্ত করাসহ নৌ বন্দর সীমানাও নির্ধারণ করা হয়।

কস্তুরিঘাট থেকে মহেশখালী চ্যানেল পর্যন্ত নদীর দু’পাড়ের এক হাজার দু’শ একর জায়গাজুড়ে এ নৌবন্দর প্রতিষ্ঠার সম্ভাব্য স্থান নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে কক্সবাজারের ৮২১ একর এবং মহেশখালীর ৪৪৭ একর জমি রয়েছে। এরই আলোকে সংশ্লিষ্ট উপজেলার ভূমি অফিসের সার্ভেয়ার ও কানুনগো এবং বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষের প্রকৌশল শাখা যৌথ জরিপ কাজ সম্পন্ন করে দুই বছর আগে। ২০১১ সালের ১৮ মে সম্ভাব্য জমি হস্তান্তরের জন্য কক্সবাজার জেলা প্রশাসককে চিঠি দেয় বিআইডব্লিউটিএ। তবে এখন পর্যন্ত এ জমি হস্তান্তর না করায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে নৌবন্দর নির্মাণের কাজ। সম্প্রতি অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ বাঁকখালী নদীর ওপর (কস্তুরিঘাট) অভ্যন্তরীণ নদী বন্দর নির্মাণের জন্য প্রস্তাবিত জায়গার দখলদার ৫১ জনের একটি তালিকা তৈরি করে নৌ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সুপারিশও করা হয়েছে। নৌ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো তালিকায় এক নম্বরে রয়েছেন ইকবাল হাজী।

তিনি অবৈধভাবে নদী বন্দরের জমিতে পাকা ভবন নির্মাণ করেছেন। পেশকার পাড়ার ফরিদ বন্দরের জায়গায় টিনশেডের ঘর নির্মাণ করে ভাড়া দিয়েছেন।
মহেশখালীর শাপলাপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মো. খালেক পাকা ভবন, টিনশেড ঘর নির্মাণ ও পুকুর খনন করেছেন। নাগু কোম্পানি নির্মাণ করেছে পাকা ভবন। ফ্লাওয়ার মিলস করেছেন বেজারু আলম। পুরনো কস্তুরিঘাটের ফরিদুল আলম, পৌরসভা ঘাট এলাকার পৌর বিএনপির সভাপতি রফিকুল হুদা চৌধুরী, সাবেক কস্তুরিঘাট ইউনিয়ন ও বর্তমান জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমান টিনশেডের ঘর নির্মাণ করে ভাড়া দিয়েছেন। কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগ নেতা মাসেদুল হক, ৬নং ঘাট এলাকায় সিদ্দিক কোম্পানি, হাজী মো. ইউনুসের ছেলে মো. ভুট্টু টিনশেডের ঘর নির্মাণ করে ভাড়া দিয়েছেন। টিনশেডের ঘর নির্মাণ করে ভাড়া দিয়েছেন আহমেদ করিম, মো. রেজাউল করিম, মো. সেলিম, আবদুস সালাম। নতুন বাজার ৬নং ঘাট এলাকায় হালিমা খাতুন, মো. সিদ্দিক, শামসুল আলম, কাউসার, একে রাশেদ হোসাইন, শওকত আলী, আবদুস সালাম, মহেশখালী পৌরসভা এলাকায় রশিদ মিয়া, কক্সবাজার পৌরসভা ঘাট এলাকায় নুরুহুদা, থানা রোডে এসএম আতিকুর রহমান টিনশেডের ঘর নির্মাণ করেছেন। আমিরুল ইসলামের রয়েছে একোয়া কালার লি. নামে একটি প্রতিষ্ঠান। সালেহ আহমেদ নামে এক ব্যক্তির রয়েছে মিডওয়ে নামে একটি মাছের হ্যাচারি। সাগর কোল্ড স্টোর, নয়ন ফিশারিজ, বিসমিল্লাহ সি-ফিস, ফিসমার্ক প্রজেক্ট, মাইশা এগ্রো কমপ্লেক্স লিমিটেডসহ বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন একাধিক দখলদার। এর মধ্যে রয়েছে কর্ণফুলী সি-পোর্ট, নুরুল ইসলাম পাটোয়ারীর মালিকানাধীন মেরিন ফিস প্রসেসিং লি. এবং মো. সেলিম উল্লাহর ১০ একর জায়গার ওপর কাঁকড়ার প্রজেক্ট।

তালিকার বাইরেও বাঁকখালী নদী ঘিরে শত শত দখলদার রয়েছে বলে জানিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ। এসব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ না হলে সংকটে পড়বে নদী। দখলদারদের মধ্যে সালেহ আহমেদের মিডওয়ে হ্যাচারির ম্যানেজার আবদুল মান্নান বলেন, যে জমিতে মাছের হ্যাচারি করা হয়েছে এটি দখল করা নয়, কেনা জমি। চট্টগ্রাম বিআইডব্লিউটিএ’র সহকারী পরিচালক (বন্দর ও পরিবহন) নয়ন শীল কক্সবাংলাকে বলেন, বাঁকখালী নদী বন্দরের প্রস্তাবিত জায়গা দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে দখলে রয়েছে। এসব দখলদারের একটি তালিকা তৈরি করে নৌ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া মহামান্য হাইকোর্ট উক্ত জায়গা ফিরিয়ে দিতে গত ৬ই মার্চ ২০১৬ তারিখে জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেন।আমরা রায়ের কপি পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছি।
তিনি আরও বলেন, নদী বন্দর নির্মিত হলে কক্সবাজারে পর্যটন খাতসহ সামগ্রিক উন্নয়ন ঘটবে। প্রতি বছর এ নদী বন্দর থেকে ১০ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায় করা সম্ভব হবে। কক্সবাজার জেলা প্রশাসন জমি বুঝিয়ে দিলে নৌ বন্দরের কাজ শুরু হবে।

এ ব্যাপারে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন বলেন, বাঁকখালী নৌবন্দর স্থাপনের সম্ভাব্য জমি বিআইডব্লিটিএকে বুঝিয়ে দেয়ার চেষ্টা চলছে। তবে যে স্থান ঘিরে নদী বন্দর হওয়ার কথা ওই স্থানে ৩০ থেকে ৩৫টি পরিবার আগে থেকে বসবাস করছে। যে কারণে জমি বুঝিয়ে দিতে সমস্যা হচ্ছে। ওই পরিবারগুলোকে কীভাবে এখান থেকে অন্যত্র পুনর্বাসন করা যায় সে চেষ্টা চলছে।

এ বিভাগের আরও খবর

Comments are closed.