পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি চুক্তির ১৯ বছর পূর্তি

0

মো: সাইফুল উদ্দীন, রাঙামাটি: ২ ডিসেম্বর পার্বত্য অঞ্চলের ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি দিবস। পার্বত্য শান্তি চুক্তির ১৯ বছর পরে এসে এবছরই প্রথম পাহাড়ে বর্ণাঢ্য আয়োজনে শান্তি চুক্তির বর্ষপূর্তি উদযাপন করছে। চুক্তির অন্যতম শর্ত ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন কার্যকর হওয়ায় চুক্তি পক্ষের সংগঠন জেএসএস’র মাঝে স্বস্তি দেখা দিলেও এই আইনের কার্যকারিতা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বাঙালি সংগঠনগুলো। বাঙালিদের মতে এই আইনের ফলে পাহাড়ে বসবাসরত বাঙালিদের ভিটে-মাটি থেকে উচ্ছেদ করা হবে। অপরদিকে সরকারের প্রতিনিধিদের দাবি-এই আইনের ফলে কাউকেই পাহাড় থেকে উচ্ছেদ হতে হবে না। আর চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য আন্দোলনের প্রয়োজন নেই বরঞ্চ ধৈর্য্য ধরার পরামর্শ দেন তারা।

দেশের এক দশমাংশ পার্বত্যাঞ্চলে দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র সংঘর্ষের পর অবশেষে ১৯৯৭সালের ২ ডিসেম্বর তৎকালিন আওয়ামীলীগ সরকারের সাথে বিচ্ছিন্নতাবাদি সংগঠন শান্তি বাহিনীর মধ্যে পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এই চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকে চুক্তির লিখিত-অলিখিত ধারাসমুহের মধ্যে জেএসএস’র অন্যতম দাবি ছিল ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন কার্যকর করা। ২০০১ সালে ভূমি নিষ্পত্তি কমিশন আইন পাস হলেও এর সংশোধনীর দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি তা প্রত্যাখান করে। পরবর্তী এবছর ৬ অক্টোবর সংশোধনী সংসদে পাস হয়। এরপর ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন তাদের কার্যক্রম শুরু করে। ইতোমধ্যে কমিশনের দুটি বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়। আর এই কমিশন কাজ শুরুর পর বাঙালিদের মধ্যে উচ্ছেদ হওয়ার আশংকা দেখা দেয়। ফলে বিভিন্ন সময় তারা হরতাল-অবরোধের মত কর্মসূচিও পালন করে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম সম-অধিকার আন্দোলন সাধারণ-সম্পাদক এডভোকেট আবছার আলী ক্ষোভ প্রকাশ কওে বলেন, এই আইন পাশ ও এর কার্যক্রম শুরু হওয়ায় বাঙালি উচ্ছেদের আশঙ্কা করা যাচ্ছে। এই আইন পূর্ণাঙ্গ রুপে বাস্তবায়ন করা হলে বাঙালিরা তাদের ভিটা-মাটি হারা হবে এবং তাদের অধিকার হারাবে। তাই দ্রুত এই আইন বাতিলের দাবি জানান তিনি।

সংসদ সদস্য ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সিনিয়র সহ-সভাপতি ঊষাতন তালুকদার এমপি বলেন, ভূমি কমিশনের কার্যক্রম শুরু হওয়ায় স্বাগত জানাই। তবে কিছু কিছু লোক এই নিয়ে অপপ্রচার করছে। আশা করবো তারা তাদের ভুল বুঝতে পেরে, এই আইন বাস্তবায়নে আমাদেরকে সহযোগিতা করবে।

তিনি আরো বলেন, চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত বলা যাবে না বাঁধা দূর হয়েছে। আশা করবো সরকার ও জনগণ আমাদের সাথে থেকে এই চুক্তি বাস্তবায়নে সহযোগিতা করবে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটি সদস্য ফিরোজা বেগম চিনু এমপি বলেন, এই কমিশনের কার্যক্রমের ফলে কাউকেই ভিটে-মাটি হারাতে হবে না। বরঞ্চ যে ভূমি নিয়ে বিরোধ রয়েছে সেই ভূমির মালিকানা পরিবর্তন হলেও অন্য জায়গায় তাকে স্থানান্তর করা হবে। কোনো মতেই কাউকে পার্বত্যাঞ্চল থেকে চলে যেতে হবে না। অস্থিতিশীল পার্বত্যাঞ্চলে শান্তির সুবাতাস বয়ে আসুক এটাই চাওয়া বর্তমান সরকারের বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি আরো বলেন, পার্বত্য অঞ্চলে যাতে সাধারণ মানুষ শান্তিতে সম্প্রীতি বজায় রেখে বসবাসের সুযোগ পাই সে কাজ করে যাচ্ছে বর্তমান সরকার।

প্রসঙ্গত পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশন গঠন হয়েছে ২০০১ সালে। ২০০১ সালের ভূমি কমিশনের আইনটি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি। এরপর প্রায় ১৬ বছরে কমিশন ৬ জন চেয়ারম্যান পেয়েছে। এই সময়ে ভূমি বিরোধ নিয়ে পাঁচ হাজারেরও বেশি আবেদন কমিশনে জমা পড়েছে। কিন্তু একটি আবেদনও নিষ্পত্তি হয়নি। কারণ আইনের জটিলতার কারণে কমিশন কোনো কাজই করতে পারে না। পরবর্তীতে সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন (সংশোধন) আইন, ২০১৬ এর দুটি ধারা সংশোধন করে। যার একটি হচ্ছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের চেয়ারম্যান আগে যেকোনো বিষয়ে কমিটির সদস্যদের মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে এককভাবে সিদ্ধান্ত দিতেন। এখন আইনের এই ধারা সংশোধনের ফলে চেয়ারম্যান এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না। চেয়ারম্যানসহ সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সিদ্ধান্তই এখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে গৃহীত হবে। অপরটি পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি (মং, চাকমা, বোমাং) সার্কেলের সার্কেল চিফ বা তার মনোনীত প্রতিনিধিরা ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের বৈঠকে উপস্থিত থাকতে পারবেন।

এদিকে শান্তি চুক্তি ১৯ তম পূর্তি উপলক্ষ্যে রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ ও বিভিন্ন সংগঠন বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে।

এ বিভাগের আরও খবর
আপনার মতামত লিখুন :

Your email address will not be published.