মো. দেলোয়ার হোসেন,চন্দনাইশ::চন্দনাইশের ঐতিহ্যবাহী তাল পাতার হাতপাখা দেশ ছেড়ে বিদেশের বাজারে স্থান করে নিয়েছে। আবুল কালাম হরেক রকমের হাতপাখা তৈরি করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পুরস্কৃত হয়েছেন। সে সাথে দখল করেছে দেশ ও বিদেশের বাজার। একইভাবে জব্বারের বলীখেলাসহ চৈত্র-বৈশাখ মাসের বলীখেলা, গরুর লড়াই, বৈশাখী মেলায় চড়া দামে বিক্রি হয় এ হাতপাখা।
চন্দনাইশ পৌরসভার দক্ষিণ জোয়ারা জিহস ফকির পাড়ার আবুল কালাম শৈশবকাল থেকে মা-বাবার সঙ্গে হাতপাখা তৈরি শুরু করেন। বর্তমানে তার তৈরি হাতপাখা দেশের বিভিন্ন শপিং মল ও বিদেশেও স্থান করে নিয়েছে। হাতপাখা যেন প্রাণের শখা। গরম কালে হাতপাখার বাতাস যেন কোমল ছোঁয়া। গ্রাম বাংলার পরিচিত অনেক প্রবচন রয়েছে হাতপাখা নিয়ে। চৈত্র থেকে জ্যৈষ্ঠ মাস পর্যন্ত গরমের সময় যাদের বাড়ীতে বৈদ্যুতিক পাখা নেই, তাদের ঘরের অতি প্রয়োজনীয় জিনিস হয়ে দাঁড়ায় এ হাতপাখা। আর সে হাতপাখা যদি চন্দনাইশ পৌরসভার দক্ষিণ জোয়ারা জিহস ফকির পাড়া আবুল কালামের তৈরি হয়, তাহলে তো আর কোন কথায় নেই। শরীর শীতল করার পাশাপাশি এ পাখার শৈল্পিক কারুকার্য মনও ভরবে তার।
পাখা পল্লী হিসেবে খ্যাত চন্দনাইশ পৌরসভার দক্ষিণ জোয়ারা জিহস ফকির পাড়ার বাসিন্দা আবুল কালাম হাতপাখা তৈরি করে পেয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয় কারুশিল্প পরিষদ হতে ২০০২ সালে কামরুল হাসান স্মৃতি পুরস্কার, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন পুরস্কার, গত ২০১৬ সালে একইভাবে কালামের ছেলে কাসেম মাহবুব উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র মো. শাকিল একই পুরস্কার লাভ করেন। বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক ও আড়ং এর মাধ্যমে আবুল কালামের তৈরি হাতপাখা পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, জাপান ও চীনে রপ্তানী করা হচ্ছে। বর্তমানে তিনি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে দুঃস্থ নারীদের হাতপাখার প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছেন। আবুল কালাম বলেছেন, তার এ হাতপাখার কাজ শুরু হয়েছে তালপাতা দিয়ে। প্রতি বৎসর অনেক চাহিদা থাকলেও মাত্র ৪শ পিচ হাতপাখা তৈরি করে আবুল কালাম বিদেশে এবং বাংলাদেশের ব্র্যাক, আড়ং, অরণ্য, বেদালং সহ বিভিন্ন নামী-দামী শপিং-এ সরবরাহ করে থাকেন। অর্থাভাবে চাহিদা মোতাবেক পাখা তৈরি করতে পারছেন না বলেও তিনি জানান। তবে এখন বেত, সূতা, কাপড়, তালপাতা দিয়ে ছয় আকৃতির ১৫ ডিজাইনের নক্সার মাধ্যমে হাতপাখা তৈরি করেন তিনি। এ গুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো তালপাখা, নক্সীপাখা ও স্টার পাখা। উপহার সামগ্রী থেকে শুরু করে ঘর সাজানো, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অন্ধর সজ্জা এবং বিয়ের দাওয়াত পত্রেও আবুল কালামের তালপাখার হাতপাখা ব্যবহার হয়ে থাকেন। তিনি হাতপাখার পাশাপাশি বিভিন্ন ডিজাইনের মোড়া ও বাস্কেট তৈরি করে থাকেনা আবুল কালাম। তবে তিনি ফেরিওয়ালা করে হাতপাখা বিক্রি করেন না বলে জানান। তিনি কোন রকমের হাতপাখা তৈরি করতে পারেন বলে জানান।
১৯৭৫-৭৬ সাল থেকে এ শিল্পে তিনি জড়িয়ে পড়েন। তবে তিনি এ পর্যন্ত সরকারিভাবে কোন রকম সাহায্য-সহযোগিতা পাননি বলে জানিয়েছেন। বর্তমানে তাঁর ৭ ছেলের মধ্যে ৫ ছেলে লেখাপড়ায়, ১ ছেলে কৃষি কাজ, অপর ১ ছেলে রাজমিস্ত্রীর কাজ করছে। তাঁর স্ত্রী তাঁর সাথে হাতপাখার কাজে সময় দেন বলে জানান। বর্তমানে কালাম এ বিশাল পরিবার নিয়ে কিছুটা অর্থ সংকটে দিনাতিপাত করছেন বলেও উল্লেখ করেন। তাঁর স্বপ্ন এ কুটির শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য তিনি তাঁর পরবর্তী প্রজন্মকে এ কাজে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় মহিলাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আর্থিক দৈন্যতার কারণে শুধু অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করতে পেরেছেন। বেশি লেখাপড়া করতে পারলে কারুশিল্পী হিসেবে দেশ-বিদেশে আরো তাঁর ভালো অবস্থান হতো। ব্যবসা বাড়ানোর প্রয়োজনে ঋণও পেতেন। বর্তমানে আবুল কালামের নিকট থেকে শতাধিক দুঃস্থ মহিলা প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন বলে তিনি জানান। ঢাকা’র সোনারাগঁ যাদুঘরের ডিসপ্লে কর্মকর্তা আজাদ সরকার বলেছেন, কারুশিল্পী আবুল কালামের হাতপাখা খুবই মানসম্মত ও সুদৃশ্য। প্রতি বছর লোকজ উৎসবে সোনারগাঁ যাদুঘরে কালামের হাতপাখা বিক্রি হয় চড়াদামে। এ জন্য সরকার তাকে আর্থিকভাবে সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছেন। এ ব্যাপারে চন্দনাইশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. লুৎফুর রহমান বলেছেন, আবুল কালামের এ ঐতিহ্য রক্ষা করতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করে সরকারিভাবে সহজ শর্তে ঋণ প্রদানের ব্যবস্থার পাশাপাশি এলাকার হতদরিদ্র মহিলাদের এ প্রশিক্ষণে সাহায্য করার আশ্বাস প্রদান করেন।
