কক্সবাজার প্রতিনিধি::অপহরণের পর পর উদ্ধার পরবর্তী তৃতীয় দফায় অপহরণের শিকার হয়েছেন নাসরিন আকতার নামের এক কিশোরী। এঘটনায় পুলিশের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলেছেন অপহৃতার মা। চাঞ্চল্যকর অতচ অমানবিক ঘটনাটি ৬ মে রাত সাড়ে ৯টায় চকরিয়া উপজেলার হারবাং ইছাছড়ি এলাকায় ঘটেছে। অপহৃতা কিশোরীকে অপহরণকারী চক্রের হাতে তুলে দিয়েই পুলিশ ক্ষান্ত হননি, তার বাবাকে সাজানো মামলায় ফাঁসানোর অভিযোগও তুলেছেন ওই গৃহবধু আরেফা বেগম রূপা। গত আট দিনেও মেয়ের কোন সন্ধান না পেয়ে নিরূপায় মা পাগলের মতো বিভিন্ন স্থানে খন্য হয়ে খুঁজছে।
চকরিয়া উপজেলার হারবাং ফাঁড়ির পুলিশের ভাষ্য মতে, হারবাং পুলিশ ফাঁড়ির পরির্দশক তোফাজ্জল হোসনের নের্তৃত্বে উত্তর হারবাং ইছাছড়ি এলাকায় গত ৬ মে রাত অনুমানিক সাড়ে ৯টার দিকে উক্ত এলাকা আরেফা বেগম প্রকাশ রূপার বাড়ীতে অভিযান চালায়। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে বাড়ির মালিক আরেফা বেগম প্রকাশ রূপা পালিয়ে গেলেও তার স্বামী সাবের ড্রাইভারকে ২০পিস ইয়াবা সহ আটক করা হয়। এঘটনায় পরির্দশক তোফাজ্জল হোসেন বাদী হয়ে আরেফা বেগম প্রকাশ রূপাকে পলাতক দেখিয়ে ২ জনের বিরুদ্ধে থানায় মামলা দায়ের করেন। চকরিয়া থানার মামলা নং-১০, জিআর-২৩৯, তাং-৬/৫/২০১৭ইং। বর্তমানে সাবের ড্রাইভার কারাগারে আছেন।
তবে ঘটনা অনুসন্ধান করতে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে অন্য তথ্য । হারবাং ইছাছড়ি এলাকার আরেফা বেগম প্রকাশ রূপার মেয়ে নাসরিন আকতার রুমপা গত ২১ মাচ অপহরণ করে নিয়ে যায় স্থানীয় জয়নাল আবেদীন নামের এক মোটর সাইকেল ম্যাকানিক। তিনি এই ব্যাপারে হারবাং পুলিশ ফাঁড়িতে অভিযোগ করলে পরদিন জয়নাল আবেদীনের খালার বাড়ী হতে স্থানীয় ইউপি সদস্যের সহায়তায় মেয়েকে উদ্ধার করে পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে যায় এবং মেয়েকে মায়ের হাতে তুলে দেয়া হয়। নিরাপত্তাহীনতার কারণে তিনি তার মেয়েকে বাড়ীতে না রেখে চট্টগ্রামে এক আত্মীয়ের বাড়ীতে পাঠিয়ে দেন। সেখানে জয়নাল আবেদীন খবর পেয়ে আবারও নাসরিনকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। ঘটনাটি জানার পর নাসরিনের মা চট্টগ্রাম পতেঙ্গা থানায় পুলিশকে ঘটনাটি অবহিত করলে থানার এসআই শিবু মল্লিকের সহায়তায় কাটগড় দিনারি রাস্তার মাথার জনৈক পারভীন আকতারের ভাড়া বাসা হতে তাকে উদ্ধার করে।
পরবর্তীতে নাসরিন আক্তারকে বাড়ীতে রাখেন। মেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে ডাক্তার দেখানো হলে ডাক্তারী পরীক্ষায় মেয়ের গর্ভে বাচ্চার সন্ধান মিলে। এ খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে মা ও মেয়েকে বিভিন্ন ভাবে হুমকি দিয়ে আসছিল অপহরণকারী জয়নাল আবেদীন । প্রশাসন ও অন্যান্য লোকজনদের দিয়ে গ্রেপ্তার কিংবা তুলে নিয়ে যাওয়ারও হুমকি দেয়। যেন গর্ভপাত ঘটাতে পারে।
আরেফা বেগম জানান, গত ৬ মে রাত সাড়ে ৯টার দিকে হারবাং ফাড়ির পুলিশ তোফাজ্জল ও সাদাপোষাকে আরো ৪/৫ জন আমার বাড়িতে উপস্থিত হন। কোন অভিযোগ ছাড়াই কথা আছে বলে পুলিশ তার স্বামী ছাবের ড্রাইভার ও মেয়ে নাসরিন আক্তারকে পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়া আসে। কিন্তু তিনি ধারনা করেছিলেন, তার স্বামী সাবের ড্রাইভার ও মেয়েকে ছেড়ে দিবে বা আদালতে পাঠিয়ে দিবে। কিন্তু সেই সময়ও তিনি জানতেন না তার মেয়েকে রেখে দিয়ে স্বামীকে জেল হাজতে পাঠিয়েছে।
তিনি বলেন, আমি মনে করেছিলাম, স্বামী ও আমার মেয়ে জেল হাজতে আছে। কক্সবাজার জেলখানায় এসে মেয়ের সাথে সাক্ষাত করতে গেলে জেলে মেয়েকে পায়নি। স্বামীর সাথে স্বাক্ষাৎ করে ঘটনার বিস্তারিত জানতে পারি, তাকে ২০পিস ইয়াবা ট্যাবলেট দিয়ে আদালতে সোর্পদ করা হয়েছে।
আরেফা বেগমের বাড়ীতে ওইদিন অবস্থান নেয়া নাসিমা নামক এক নিকটাত্মীয় বলেন, রাতে দুইজন লোক বাড়ীতে প্রবেশ করে বাড়ী তল্লাশী করে। কোন কিছু না পেয়ে হতাশ হয়। একজন বাহির থেকে এসে বলে স্যার পাইছি বলে কিছু জিনিস তাকে দেয়। সাথে সাথে সাবের ড্রাইভারকে বাহিরে নিয়ে আসে এবং আর কিছুক্ষন পর নাসরিন আক্তারকে নিয়ে যায়। তাদেরকে কোথায় নিয়ে গেছে আমি জানি না।
আরেফা বেগম জানান, জয়নালের প্ররোচনায় সংবাদকর্মী জসিমই ইয়াবাগুলো দিয়েছে। ইতোপূর্বে জসিম তকে ২’শ পিস ইয়াবা জমা রাখার জন্য পিড়াপিড়ি করে ছিল। বাড়িতে ইয়াবা না রাখায় চরম ক্ষুদ্ধ ছিলো স্ক্র্যাব জসিম। পুলিশের কথিত অভিযানে আরো যারা ছিলেন তারা হচ্ছে, জয়নাল, পিতা-আহমদ হোসেন, ইসামইল পিতা-সাহেব শাহ খলিফা, মোহাম্মদ বেলাল পিতা-জামাল, গাঁজা বেলাল পিতা- মৃত ছত্তার, মোস্তফা পিতা- আলা উদ্দিন। ওই মামলায় এদেরকেই স্বাক্ষী দেখানো হয়েছে।
হারবাং পুলিশ ফাঁড়ির পরির্দশক ও মামলার বাদী তোফাজ্জল হোসেনের আর্জি মতে এটাই প্রমাণ হয় যে, ঘটনাটি পুরো সাজানো। একজন পুরুষ পালানোর চেষ্টা করেও পালাতে পারেনি, আর পুলিশ দেখে আমি (আরেফা বেগম প্রকাশ রূপা) পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, আমার মেয়েকে ৬ মে বাড়ি থেকে পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে আর কোন খদিস পাচ্ছি না। অপহরণকারী জয়নাল পুলিশকে ব্যবহার করেই আমার মেয়ের গর্ভপাত কিংবা হত্যার জন্য অপহরণ করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে আটক রেখেছে। আমরা যাতে সন্ধান কিংবা খোঁজাখুজি করতে না পারি সে জন্য কথিত ইয়াবা উদ্ধার নাটক সাজিয়ে আমাদের আসামীভুক্ত করে হয়রানী করে যাচ্ছে।
মামলার বাদী ও হারবাং পুলিশ ফাঁড়ির পরির্দশক তোফাজ্জল হোসেন দাবী করেন, হারবাং ইউপি এলাকায় মাদক বিরোধী অভিযান চলাকালিন গোপন সংবাদের ভিত্তিতে আরেফা বেগম প্রকাশ রূপার বাড়ির উঠানে পৌছার পর সাবের আহম্মদ (রূপার স্বামী) পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পালানোর সময় তাকে ধৃত করা হয়। এবং আরেফা বেগম প্রকাশ রূপা পালিয়ে যায়।
তবে তিনি আরেফা বেগমের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আরেফা একজন খারাপ মহিলা। তার বিরুদ্ধে এলাকায় দুর্দনাম রয়েছে। সেইদিন রাতে আরেফার মেয়েকে ফাঁড়িতে আনেননি বলে দাবী করেন তিনি।
