জুবায়ের সিদ্দিকী-
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ইমারত শাখায় কর্মরত ফিল্ড সুপারভাইজার থেকে শুরু করে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার, বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার সহ প্রায় প্রকৌশলী কোন না কোন ভাবে জড়িত দুর্নীতির সাথে। মাত্র দশ বছরে একজন প্রকৌশলী নগরীতে ২টি ফ্ল্যাট, গাড়ি ২টি ও অসংখ্য প্লটের মালিক হয়েছেন এমন বাস্তব চিত্র দেখে তার স্বজনরাও হতবাক। চসিকের রাস্তার কাজ, নালা নর্দমার সংস্কার কাজ বা নতুন ভাবে তৈরী করতে গেলেই প্রথমে ঠিকাদারদের ম্যানেজ করতে হয় প্রকৌশলীদের।
এক ঠিকাদারের ষ্টাফ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রকৌশলীদের ম্যানেজ করতে না পারলে কপালে দু:খ থাকে আমাদের। অনেক প্রকৌশলীর বাসার বাজারের তালিকা ধরিয়ে দেওয়া হয় বা ইলেক্ট্রনিক্স সামগ্রী ক্রয়ের নির্দেশও আসে। আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হওয়া অনেক প্রকৌশলী অমুক ভাই তমুক ভায়ের অনুসারী বা সরকারীদলের সমর্থক পরিচয় দিয়ে দাপটও দেখান এমন ভাবে যে কেউ বা আইন যেন তাকে স্পর্শ করতে না পরে। মহানগরীতে চসিকের দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলীদের রয়েছে সিন্ডিকেট।
এই সিন্ডিকেট দুর্নীতিতে ষোলকলা পুর্ন করলেও তাদের কিছু হয় না। চট্টগ্রাম মহানগরীর মৌসুমী আবাসিক এলাকা, চান্দগাঁও আবাসিক এলাকা, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, মেহেদিবাগ আমিরবাগ আবাসিক এলকা ও নগরীর মুরাদপুর বহদ্দারহাটে চসিকের প্রকৌশলীদের একাধিক বাড়ি ও প্লট রয়েছে। নামে বেনামে চট্টগ্রাম শহরে রয়েছে একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্টান। ঠিকাদারী ছাড়াও বিভিন্ন বিপনী কেন্দ্রে দোকান ভাড়া দেওয়া প্রকৌশলীদের দোকান রয়েছে। এমনকি সিটি কর্পোরেশনের মালিকানাধীন মার্কেটেও একাধিক প্রকৌশলীর দোকান রয়েছে।
২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সিটি কর্পোরেশনের দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে দুদক তদন্ত করলেও পরবর্তীতে তৎকালীন সময়ের কর্মকর্তারা প্রকৌশলীদের কাছ থেকে উৎকোচ নিয়ে দফারফা করে ফেলেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, সিটি কর্পোরেশনের অনেক কাউন্সিলর ঠিকাদারীতে জড়িত রয়েছেন ভিন্ন নামে। যার কারনে সিটি কর্পোরেশনের প্রকৌশলী বিভাগের প্রত্যেকের কাছে আছে আলাদিনের চেরাগ। চাকরী পেলেই যেন আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ।
স্থানীয় সরকার আইন ২০০৯ অনুসারে সিটি কর্পোরেশনের কোনো কাউন্সিলর বা কোনো কর্মকর্তা কর্তৃক সজ্ঞানে, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে, স্বয়ং বা কোন অংশীদার মারফত কর্পোরেশনের কোন ঠিকাদারিতে স¦ত্ব বা অংশ অর্জন করা অপরাধ। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে বিদ্যমান আইনটি অমান্য করে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের একাধিক প্রকৌশলী পরোক্ষভাবে ঠিকাদারী করছেন সংস্থাটিতেই। তাও আবার নিজে যে শাখায় কর্মরত আছেন সে শাখাতেই।
এ ক্ষেত্রে কোন কোন প্রকৌশলী নিজের স্ত্রীর নামে, আবার কোন কোন প্রকৌশলী পার্টনারশিপে (অংশিদারিত্বে) ঠিকাদারি করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সম্প্রতি এ ধরনের অভিযোগ উঠেছে,’মেসার্স এ এইচ এন্ড এ বি ইঞ্জিনিয়ার্স’ ও ’মেসার্স অলটেক কর্পোরেশন’ নামে দুটি ঠিকাদারী প্রতিষ্টান ঘিরে। ঠিকাদারী প্রতিষ্টান দুটির সাথে চসিকের বিদ্যুৎ বিভাগের দুজন প্রকৌশলীর জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে মেসার্স এ এইচ এন্ড এ বি ইঞ্জিনিয়ার্সের মালিক জেবুন্নেসা খানম হচ্ছেন চসিকের বিদ্যুৎ শাখার উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো: কামাল হোসেন সেলিম।
এ ছাড়া মেসার্স অলটেক কর্পোরেশন নামে ঠিকাদারী প্রতিষ্টানটির মালিক যায়েদ হাসান চৌধুরীর সাথে চসিকের বিদ্যুৎ বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী সরওয়ার আলম খানের পার্টনারশিপ রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ জানতে চাইলে চসিকের বিদ্যুৎ শাখার উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো: কামাল হোসেন সেলিম বলেন, অস্বীকার করব না। হ্যাঁ, প্রতিষ্টানটি আমার স্ত্রীর নামে। তবে এটা নিয়ে সমালোচনা হওয়ায় সে আর ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করেননি।
মেসার্স অলটেক কর্পোরেশন ঠিকাদারী প্রতিষ্টানের সাথে পার্টনারশিপ রয়েছে কিনা জানতে চাইলে চসিকের উপ-সহকারী প্রকৌশলী সরোয়ার আলম খান বলেন,’ অনেক আগে ছিলাম। কর্পোরেশনের চাকরীতে যোগদানের আগেই পার্টনার ছিলাম। কর্পোরেশনে যোগদান করার পর আমি সরে এসেছি। বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হওয়ায় ঠিকাদারী প্রতিষ্টানটির মালিক যায়েদ হাসান চৌধুরী সম্প্রতি পুরো লাইন্সেটি বাতিল করেছেন। মেসার্স অলটেক কর্পোরেশনের সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়টি কর্পোরেশনের কোন কোন স্বার্থান্মেষী মহল ষড়যন্ত্র করে অপপ্রচার করছেন বলেও দাবী করেন প্রকৌকশলী সরোয়ার আলম খান।
জানা যায়, চসিকের বিদ্যুৎ শাখার উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো: কামাল হোসেন সেলিমের স্ত্রীর নামে তালিকাভুক্ত মেসার্স এ এইচ এন্ড এবি ইঞ্জিনিয়ার্স প্রতিষ্টানটির ২০১৫ ও ২০১৬ সালে কর্পোরেশনে বেশ কিছু কাজ করেছেন। এর মধ্যে গত বছর বিবিরহাট গরুর বাজারের জন্য পিসি পোল স্থাপন পুর্বক ম্যাটাল হ্যালাইড শেইডের মাধ্যমে আলোকায়নের কাজ করেছেন ৪ লক্ষ ৯৩ হাজার ৩শ টাকার। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে ৪ লক্ষ ৮৫ হাজার টাকায় ৩৬ নং ওয়ার্ডস্থ বারেক বিল্ডিং পোল হতে নিমতলা পর্যন্ত পোল সরবরাহ, উত্তোলন ও স্থাপন কাজ, ৫ লক্ষ টাকার চসিকের আওতাধীন নালা খাল থেকে (অংশ-১) এস্কেভেটর দ্বারা মাটি উত্তোলন অপসারন কাজ সহ বিভিন্ন কাজ করেছেন।
এদিকে মেসার্স অলটেক কর্পোরেশন গত বছর এক লাখ ৪৬ হাজার টাকা ব্যয়ে ট্রাফিক সিগন্যালের অচল মোড়সমুহের ঝুকিপুর্ন পোলসমুহ অপসারন ও আনুসাঙ্গিক কাজ, ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকায় মেমন হাসপাতালের নষ্ট ও পুরাতন এসিসহ আনুসাঙ্গিক মালামাল খোলা কাজসহ ৩ লাখ ৭৩ হাজার টাকায় পুরাতন ও নষ্ট এসিসমুহ মেরামত ও সার্ভিসিং কাজ করেছেন। উল্লেখ্য, গত ২৬ জানুয়ারী মো: যায়েদ হাসান চৌধুরী মেসার্স অলটেক কর্পোরেশনের ট্রেড লাইসেন্সটি বাতিলের জন্য প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা বরাবরে আবেদন করেছেন।
চসিকের প্রধান প্রকৌশলী লে. কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, চসিকের কোন কর্মকর্তা-কর্মচারী এখানে ঠিকাদারির সঙ্গে জড়িত আছেন এমন অভিযোগ পেলে বিষয়টি আমরা তদন্ত করে দেখব। তদন্তে অভিযোগ প্রমানিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, সরকারী চাকরী থাকা অবস্থায় কেউ রাজনৈতিক সংগঠনের সদস্য হতে পারবেন না। ব্যক্তিটি সরকারের যে প্রতিষ্টানে চাকরী করবেন, সেই প্রতিষ্টান নিজের নামে বা আত্বীয় স্বজনের নামে ঠিকাদারী করা যাবে না।
কারন এ ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ আছে। সরকারী কর্মকর্তা বা কর্মচারীটির স্ত্রীটি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন বা ঠিকাদারীও করতে পারবেন। তবে এ ক্ষেত্রে তার স্বামী যে প্রতিষ্টানে চাকরী করেন সে প্রতিষ্টানে না। এদিকে সাম্প্রদায়িক উস্কানিমুলক কটুক্তি করার অভিযোগে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রকিউরমেন্ট শাখার নির্বাহী প্রকৌশলী (দায়িত্বপ্রাপ্ত) শাহীনুল ইসলাম চৌধুরীকে শোকজ করা হয়েছে।
গত ৩ মে চসিকের সচিব আবুল হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে তিন কার্যদিবসের মধ্যে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দেয়া হয়। এতে বলা হয় নির্বাহী প্রকৌশলী সুদীপ বসাককে কটুক্তি করেছেন শাহীনুল ইসলাম, যা চাকরির শৃঙ্খলা আচরনপন্থী।
