বিএনপির রাজনীতি : না ঘরকা-না ঘটকা

0

জুবায়ের সিদ্দিকী  :      বিএনপির রাজনীতিতে চলছে ভাটা। আন্দোলন সংগ্রামে ক্লান্ত নেতাদের অনেকে হামলা মামলায় জর্জরিত হয়ে এলাকা ছাড়া। বাড়িতে বা এলাকায় গেলেই পুলিশ তাড়া করে। শহর কি মফস্বল একই চিত্র। উপজেলা পর্যায়েও অনেক নেতা ফেরারী। শহরের নেতাকর্মী গ্রামে ও গ্রামের নেতাকর্মীরা শহরে পলাতক ভাবে বসবাস করছেন। তবে যাদের বিরুদ্ধে কোন মামলা নেই তাদের এলাকায় থাকতে কোন সমস্যা নেই। এরাই এখন ছোটখাট ভাবে সভা ও মিছিল করে ঘুড়ে দাঁড়াবার চেষ্টা করছেন।

মামলায় জর্জরিত এমন একজন চট্টগ্রাম মহানগরীর মধ্যমসারীর নেতার সাথে আলাপ হলে জানান, ’আমার মামলার খোঁজ নেওয়ার জন্য এখন পর্যন্ত বড় নেতাদের কেউ ফোন করেননি। এখন যেন আমাকে কেউ চেনে না। আবার আন্দোলন হবে। আমি আন্দোলনে রাজপথে যাব। বড় ভাইদের নির্দেশনা মেনে চলবো। এক সময় হারিয়ে যাব। কিন্তু মনে রাখার মত দলে আমার কোন পরিচিতি নেই।’ নেতাকর্মীরা জানান, এরকম চিত্র এখন দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপিতে। যার যেখানে যোগ্যতা তার সেখানে পদায়ন হয় না। আর্শিবাদ ছাড়া কোন পরিচিতি হয় না। বড় ভাইদের গ্রুপের সুনজর না থাকলে নেতা হওয়া যায় না।

সিন্ডিকেট ভাঙ্গার দীর্ঘদিনের দাবী এখন আর উচ্চারিত হয় না। যার কারনে নেতা হওয়ার দৌড়ে পেরে উঠে না অনেক যোগ্য নেতৃত্ব। আড়াল থেকেই সবসময় ভালবাসতে হয় দলকে। আবার সময়ের প্রয়োজনে তাদের খোঁজ পড়ে। সময় ফুরিয়ে গেলে আর কেউ চেনেন না। এটাই এখন দলের বাস্তবতা। নেতাকর্মীরা জানান, বিগত দিনের বড় দুটি আন্দোলনে হতাহতদের পাশে এখনো বিএনপি বটবৃক্ষের মত দাঁড়াতে পারেনি। হামলা মামলায় আহত নেতাকর্মীদের খোঁজও নিতে পারে না দলটি। বিএনপির রাজনীতি এখন হয়ে পড়েছে না ঘরকা না ঘটকার রাজনীতি।
অন্যদিকে মোসাহেবী ও সুবিধাভোগীরা দাপটের সাথে আছেন দলের অভ্যন্তরে। এখানে ত্যাগী আর মাঠের নেতাদের কোন দাম নেই। দল আবার ঢেলে সাজানো হবে এমন কথা বলে নীতিনিধারকরা এতদিন আসার আলো সঞ্চার করেছিলেন তৃনমুলে। কিন্তু সেই আশাও এখন ফিকে হতে চলেছে। দিন যায়, বছর ঘুরে আসে। কিন্তু পরিবর্তন আর হয় না। কবে হবে তাও জানেন না এসব নেতাকর্মী।
অনুসন্ধানে ও নেতাকর্মীদের সাথে আলাপ করে উঠে এসেছে অনেক তথ্য। দলের অভ্যন্তরে পদ পদবি আঁকড়ে থাকা নিস্ক্রিয় নেতারা এটাকে তাদের পৈত্রিক সম্পত্তি কিংবা টাকার বিনিময়ে অর্জিত পদ বলে ঘাপটি মেরে বসে আছেন। আর রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন ত্যাগী ও নির্যাতিতরা। ভবঘুরের মতো, আজ সেখানে, কাল এখানে। দলকে নিয়ে স্বপ্ন দেখাই তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। কর্মীরা জানান, ২০১৩ সালের শেষের দিকে আর ২০১৫ সালের শুরুর দিকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট সর্বাত্তক আন্দোলনের ডাক দেয়।

এর প্রেক্ষিতে দলের নেতাদের কাউকে খুঁজে পাওয়া না গেলেও মাঠ পর্যায়ের তৃনমুল নেতাকর্মীরা ছিলেন সর্বাগ্রে।তাদের অনেকে জীবন দিয়েছেন, কারাগারে গেছেন, আহত হয়েছেন আবার অনেকে বাড়িঘর ছেড়ে ফেরারী জীবন বেছে নিয়েছেন। দুই বারের ব্যর্থ আন্দোলন শেষ হলেও এখনো দলের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার বা নেতাকর্মীদের সঠিক তালিকা পর্যন্ত করতে পারেনি দল। দলের কোন মনিটরিং সেল না থাকার কারনে যোগ্য নেতাকর্মীদের পরিসংখ্যানও নেই দলটির কাছে। শুধু যখন রাজপথের আন্দোলন মিছিলে বা সভা সমাবেশের প্রয়োজন হয় তখনই তাদের ডাক পড়ে! এরপর প্রয়োজন শেষ হলে তাদের অবদানও যেন বাতাসে মিলিয়ে যায়। সময়ের বিবর্তনে তারা রাজনীতির মানচিত্র থেকে হারিয়ে যায়।

অনেক নেতাকর্মী বলেছেন, গেল বছরগুলোতে এই দলের জন্য যারা মামলা খেয়েছেন, জেল খেটেছেন তারাই বিএনপি সরকারের সময়ে ক্রসফায়ারে পড়েছেন। আজ তাদের শুন্যতা দল হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। ভবিষ্যৎ বিএনপি এমনটা করবে না তারও গ্যারান্টি নেই। আজ তৃনমুল পর্যায়ের এই ধরনের বিপর্যস্ত চিত্র যে বাস্তবে রুপ নিয়েছে। বিএনপি দলীয় সুত্র অবগত হওয়া গেছে যে, ওয়ান ইলেভেন পরবর্তী সময়ে দলের নেতাকর্মীদের দুর্দিন শুরু হয়। যা এখনো চলমান এবং আরও ভয়াবহ আকার ধারন করেছে। শুরুতে দুর্দশাগ্রস্ত এসব নেতাদের বিভিন্ন উপায়ে সাহায্য সহযোগিতা করা হলেও এখন তা ক্ষীন হয়ে পড়েছে। ফলে দুর্ভোগ আর কষ্ট যেন নিয়তির বিধান হয়ে পড়েছে।

সারাদেশে বিএনপির কত নেতাকর্মীর নামে মামলা রয়েছে তার সঠিক পরিসংখ্যান দলের কাছেও সংগ্রৃহীত নেই। তবে অসমর্থিত একটি সুত্র জানায়, গত ৫ জানুয়ারী থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত সারাদেশে নাশকতার অভিযোগে ১ হাজার ৮০০টি মামলা দায়ের করা হয়। বিএনপি বলছে, এ সংক্রান্ত মামলায় ১৮ হাজার ৫০ জনকে সারা দেশে গ্রেফতার করা হয়েছিল। কিছু জামিন হলেও অধিকাংশ নেতাকর্মী এখনো জেলে এই দাবী করেছে বিএনপির নেতৃবর্গ।

মামলার পাহাড় নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় জীবন তৃনমুল নেতাকর্মীরা থাকলেও মামলার জন্য দলীয় আইনজীবি কিংবা নেতাদের কাছে পাওয়া যায় না। বাবা বা নিজের টাকায় এসব মামলা পরিচালনা করলেও টাকার অভাবে অনেক নেতাকর্মীই এখন জামিনের চেষ্টা করছেন না। এর জন্য তারা ফেরারী জীবন বেছে নিয়েছেন। কিন্তু কোথাও কোন কাজও খুঁজে পাচ্ছেন না। আজ এই আত্বিয়ের বাসা তো কাল আরেকজন। এভাবেই তাদের সারাদিনের ব্যস্ত সময় পার করতে হচ্ছে। আজ দেশের অন্যতম বৃহৎ একটি রাজনৈতিক দলের তৃনমুলের নেতাকর্মীদের মাঝে এমন মানবেতর জীবনের চিত্র দেখা গেলেও বহাল রয়েছে সুবিধাভোগী, তদবিরবাজ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলা নেতাকর্মীরা।
চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণের বিএনপি, ছাত্রদল ও যুবদলের একাধিক নেতাকর্মীর সাথে আলাপ করে জানা গেছে, নেতাকর্মীগন হতাশ। ঘুরে দাঁড়াবার চেষ্টা করেও তৃনমুলের নেতাকর্মীগন থমকে শীর্ষ নেতাদের মাঠ পর্যায়ে অনুপস্থিতির কারনে। চট্টগ্রাম মহানগরের নেতাকর্মীগন বর্তমান সময়ে রাজপথে আবার সরব হওয়ার চেষ্টা করছে।

তবে মামলায় যারা জর্জরিত তারা এলাকা ছাড়া। বিএনপির মহানগর উত্তর ও দক্ষিনে কোন্দল, গ্রুপিং প্রকট। যে কারনে নেতাকর্মীগন কোনভাবেই ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন করতে পারছেন না। শীর্ষ নেতৃবর্গ কেউ বিদেশে, কেউ ঢাকায় বসে ব্যবসা বাণিজ্য করছেন। শীর্ষ নেতাদের অনেকেই এবং সাবেক মন্ত্রী, এমপিদের সাথে সরকারের অনেক এমপি-মন্ত্রীদের সাথে রয়েছে দহরম মহরম।

এ সখ্যতার কারনে মামলা ও পুলিশি হয়রানী থেকে শীর্ষ নেতারা রক্ষা পেলেও মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের রক্ষা না পাওয়াতে হতাশ ও ক্ষোভ প্রকাশ করছে ত্যাগী নেতারা। সরকারীদলের এমপি মন্ত্রীদের মালিশ ও মোসাহেবিতেও জড়িয়ে পড়েছেন বিএনপির কোন কোন মধ্যমসারীর নেতা। যার কারনে গ্রেফতার এড়িয়ে এরা রাজকীয়ভাবে বিলাসীজীবন যাবপ করে সরকার বিরোধী আন্দোলনের তকমা ছুঁড়েছেন বিবৃতি দিয়ে পত্র পত্রিকায় ও ইলেক্ট্রিক মিডিয়ায়।

এ বিভাগের আরও খবর
আপনার মতামত লিখুন :

Your email address will not be published.