কৃষিডেস্ক, সিটিনিউজবিডি : ভাতের পর যে খাদ্যটির চাহিদা বেশি সেটি হলো আটা ও ময়দা। আর আটা-ময়দা আসে গম থেকে। দেশের মানুষের বিশেষ করে শহরাঞ্চলে সকালের নাস্তার একটা বিরাট অংশজুড়ে থাকে গমের আটা বা ময়দার রুটি-পরোটা।
চাষের মৌসুম ও জাত : গম বীজ বোনার উপযুক্ত সময় হলো কার্তিক মাসের শেষ থেকে অগ্রহায়ণের তৃতীয় সপ্তাহ বা নভেম্বর মাস পর্যন্ত। এ সময় বোনা যায় এমন জাতের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- কাঞ্চন, আকবর, অগ্রণী, প্রতিভা, সৌরভ, গৌরব, সোনালিকা। ডিসেম্বর মাসের ১৫-২০ তারিখ পর্যন্ত বোনা যেতে পারে এই জাতগুলো হলো- সুফী, বিজয় ও প্রদীপ। যে সব এলাকায় ধান কাটতে ও জমি তৈরি করতে বিলম্ব হয় যেসব এলাকায় বপন করলে ভালো ফলন পাওয়া যায়৷
উপযুক্ত জলবায়ু : গ্রীষ্ম ও অবগ্রীষ্মমণ্ডলীয় জলবায়ু হতে শুরু করে নাতিশীতোষ্ঞ ও তুন্দ্রাঞ্চলীয় জলবায়ুতেও গম জন্মে৷ বার্ষিক বৃষ্টিপাত ১৫-৪৫ ইঞ্চি তবে ১০-৭০ ইঞ্চি পর্যন্ত বার্ষিক গড়পড়তা বৃষ্টিতেও গম ভালো জণ্মে৷ অন্যদিকে ২১-২৪ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায়ও গম চাষ করা যায়৷ তবে গরম আবহাওয়ায় ফুল ফুটার সময় ঠান্ডা পরিবেশ বর্তমান থাকা প্রয়োজনীয়, অন্যথায় গম গাছে দানার উত্পত্তি হয় না৷
মাটির ধরন : উঁচু ও মাঝারি দো-আঁশ মাটি গম চাষের জন্য বেশি উপযোগী৷ লোনা মাটিতে গমের ফলন কম হয়৷ সাধারণত উঁচু ও মাঝারি উঁচু জমি গম চাষের জন্য উপযুক্ত৷ তবে মাঝারি নিচু জমিতেও গম চাষ চলে৷
পোকা দমন: গমে সাধারণত পোকার আক্রমণ কম হয়। তবে কখনো কখনো কাটুই পোকা, জাব পোকা ও মাজরা পোকার আক্রমণ দেখা দেয়। জাব পোকার আক্রমণ দেখা দিলে ইমিডাক্লোরপিড (এডমায়ার/ইমিটাফ/টিডো ইত্যাদি) জাতীয় কীটনাশক স্প্রে করতে হয় ৭ দিন পরপর ২ বার। মাজরা পোকা নিয়ন্ত্রণের জন্য ডায়াজিনন-৫০ ইসি ২ মিলিলিটার প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে হয়।
আগাছা দমন: গম ক্ষেতে আগাছা সময়মতো নিয়ন্ত্রণ না করলে গম গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। গমের জমিতে বীজ বোনার ১৫/১৬ দিন পর আড়াআড়িভাবে দুবার আঁচড়া দিয়ে অনেক আগাছা তুলে ফেলা যায়। আঁচড়া দেয়ার ফলে মাটি আলগা হওয়ায় চারা গাছের বৃদ্ধিও দ্রুত হয়।
গমের ফলন বৃদ্ধির উপায় :গম আবাদে পানির প্রয়োজন কম। হেক্টরপ্রতি বোরো ধানে পানি লাগে ৫৫ থেকে ৬০ একর ইঞ্চি, গম আবাদে লাগে ১৫ একর ইঞ্চি। গমে রোগ-বালাই ও পোকা-মাকড়ের আক্রমণ খুবই কম। ফলে বালাইনাশকের ব্যবহার প্রয়োজন নেই বললেই চলে। গমের ফলন বৃদ্ধিতে যা করতে হবে-
উপযুক্ত জমি ও মাটি: উঁচু ও মাঝারি দো-আঁশ মাটি গম চাষের জন্য বেশি উপযোগী।
বীজ গজানোর হার: বীজ গজানোর হার ৮০ ভাগ বা তার অধিক হলে প্রতি শতকে আধা কেজি বীজ বপন করতে হবে। গজানোর হার ৮০ ভাগের কম হলে প্রতি ১ ভাগ কম গজানোর জন্য বিঘা (৩৩ শতক) প্রতি ১৩০ গ্রাম করে অতিরিক্ত বীজ বপন করতে হবে। গজানোর হার ৭০ ভাগের কম হলে ওই বীজ বপন করা ঠিক নয়।
বীজ শোধন: বপনের আগে প্রতি কেজি বীজের সাথে ৩ গ্রাম হারে প্রোভেক্স-২০০ ডব্লিউ পি মিশিয়ে বীজ শোধন করতে হবে।
সার ব্যবস্থাপনা: প্রতি বিঘায় ইউরিয়া ২৪ থেকে ২৫ কেজি, টিএসপি ১৮ থেকে ১৯ কেজি, এমওপি ৫ থেকে ৬ কেজি, জিপসাম ১৪ থেকে ১৫ কেজি, ১ কেজি ৩০০ গ্রাম বোরাক্স, গোবর/কম্পোস্ট ১০০০ থেকে ১২০০ কেজি। ইউরিয়া সারের তিন ভাগের দুই ভাগ এবং সম্পূর্ণ টিএসপি, এমওপি ও জিপসাম শেষ চাষের সময় এবং বাকি তিন ভাগের এক ভাগ ইউরিয়া প্রথম সেচের সময় উপরি প্রয়োগ করতে হবে। জমিতে দস্তা সারের ঘাটতি থাকলে এবং পূর্ববর্তী ফসলে দস্তা সার প্রয়োগ করা না হলে বিঘা প্রতি ১.৫ কেজি দস্তা সার (জিংক সালফেট) শেষ চাষের সময় প্রয়োগ করুন। অম্লত্ব বৃদ্ধির সাথে সাথে মাটিতে ফসফরাস সারের কার্যকারিতা কমে যায় এবং এর ফলে গমের ফলন কম হয়। অম্ল মাটিতে বিঘায় ১৩০ কেজি হারে ডলোচুন ছিটিয়ে দিলে ফলন ১৫ থেকে ২০ ভাগ বৃদ্ধি পায়। জমি তৈরির প্রায় দুই সপ্তাহ আগে ডলোচুন প্রয়োগ করতে হবে।
চিটা ব্যবস্থাপনা: উত্তরাঞ্চলের মাটিতে মাঝে মাঝে গমে চিটা দেখা যায় এবং এর ফলে ফলন কমে যায়। অনুমোদিত মাত্রায় জৈব ও রাসায়নিক সার প্রয়োগ এবং বিঘা প্রতি ৮০০ গ্রাম বরিক এসিড বা ১ কেজি ৩০০ গ্রাম বোরাক্স প্রয়োগ করে চিটা দূর হয়।
পাখি তাড়ানো: বীজ বপনের পর ১০ থেকে ১২ দিন পর্যন্ত পাখি তাড়ানোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
সেচ ব্যবস্থাপনা: প্রথম সেচ চারার তিন পাতার সময় (বপনের ১৭ থেকে ২১ দিন পরে), দ্বিতীয় সেচ গমের শীষ বের হওয়ার সময় (বপনের ৫৫ থেকে ৬০ দিন পর) এবং তৃতীয় সেচ দানা গঠনের সময় (বপনের ৭৫ থেকে ৮০ দিন পর) দিতে হবে। গম ক্ষেতে ধানের মত ঢালাও সেচ দেয়া যাবে না। নালা অথবা ফিতা পাইপের মাধ্যমে সেচের পানি ছিটিয়ে দিতে হবে। সঠিক সেচ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ফলন ৫৮% পর্যন্তু বৃদ্ধি করা সম্ভব। বপনের ২৫ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে ১ম সেচের পর একটি নিড়ানী দিলে ফলন প্রায় ১০ থেকে ১২ ভাগ বৃদ্ধি পায়।
ইঁদুর দমন: ক্ষেতে ইঁদুরের আক্রমণ শুরু হলে ফাঁদ পেতে, গর্তে পানি ঢেলে বা বিষটোপ (জিংক ফসপাইড/লানির্যাট) দিয়ে ইঁদুর দমন করতে হবে।
ফসল সংগ্রহ: গম পেকে গেলে বা হলুদ বর্ণ হলে কাটতে হবে। রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে সকালের দিকে গম কেটে দুপুরে মাড়াই করাই উত্তম।
সতর্কতা: গম ক্ষেতে কখনোই কলা গাছ অথবা বরইয়ের কাঁটা টানবেন না, মই দিবেন না এত গমের ক্ষতি হবে।
