ডেসটিনির ১১ কর্মকর্তার পকেটে ১১৯ কোটি টাকা

0

সিটিনিউজবিডি : ডেসটিনির এমডি রফিকুল আমীনসহ শীর্ষস্থানীয় ১১ কর্মকর্তার নামে ১১৯ কোটি ৭৮ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য-প্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এমএলএম (মাল্টিলেভেল মার্কেটিং) ব্যবসার নামে বেশি লাভের প্রলোভন দেখিয়ে জনগণের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া অর্থে ব্যক্তিগত ওই সম্পদ গড়ে তুলেছেন তারা। এর আগে সারাদেশের ২৬ লাখ গ্রাহকের সঙ্গে প্রতারণা করে মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে ৪ হাজার ১১৯ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ৫১ জনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট পেশ করার পর এবার ১১ জনের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের খোঁজে নেমেছে দুদক। সূত্র জানায়, জ্ঞাত আয়-বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগটি অনুসন্ধান করছেন দুদকের উপ-পরিচালক মোজাহার আলী সরদার ও তৌফিকুল ইসলাম। তারা মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে দুটি মামলা দায়ের ও চার্জশিট পেশের পর ডেসটিনির কার্যক্রম পরিচালনার সঙ্গে জড়িত ১১ কর্মকর্তার সম্পদ অনুসন্ধানে নামেন। দীর্ঘ অনুসন্ধানে তাদের নামে মোট ১১৯ কোটি ৭৮ লাখ ৫৭ হাজার ৪৪১ টাকার সম্পদের তথ্য-প্রমাণ পেয়েছেন তারা।

দুদকের অনুসন্ধান ও তদন্ত বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ডেসটিনির বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং মামলার পাশাপশি অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগেও মামলা করা হবে। মানি লন্ডারিং ও অবৈধ সম্পদ অর্জন_ দুটি ভিন্ন অপরাধ। তাই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দুই ধারায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন,

অভিযুক্তরা পলাতক থাকলেও সম্পদের হিসাব চেয়ে নোটিশ জারি করা হবে তাদের কাছে। তারপর তারা সম্পদের হিসাব দেবেন কি দেবেন না_ সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দুদক সূত্র জানায়, অনুসন্ধানে ওই ১১ কর্মকর্তার বাড়ি, ফ্ল্যাট, জমি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ, কোন ব্যাংকের হিসাবে কত টাকা গচ্ছিত আছে, ব্যবসার কমিশনসহ অন্যান্য সম্পদের তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে। দুদকের হাতে রয়েছে সম্পদের সব নথিপত্র। অনুসন্ধান বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ওইসব নথিপত্র আদালতে আমলযোগ্য।

কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১১ জনের সম্পদের হিসাব চেয়ে নোটিশ জারি করা হবে। তাদের মধ্যে ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসেন ও এমডি রফিকুল আমীন জেলে ও ৯ জন পলাতক থাকায় এতদিন নোটিশ জারি করা হয়নি। খুব শিগগির তাদের অফিস ও বাসার ঠিকানায় সম্পদের হিসাব চেয়ে নোটিশ পাঠানো হবে। যারা নোটিশ অনুযায়ী সম্পদ বিবরণী পেশ করবেন, তাদের হিসাব যাচাই করে অবৈধ সম্পদ পাওয়া গেলে করা হবে মামলা। নোটিশ জারির পর সাত কার্যদিবসের মধ্যে যারা সম্পদের হিসাব পেশ করবেন না বা হিসাব পেশের জন্য সময় বৃদ্ধির আবেদন জানাবেন না, তাদের বিরুদ্ধে ‘নন সাবমিশন’ মামলা দায়ের করা হবে।

শীর্ষস্থানীয় ওই ১১ কর্মকর্তা হলেন_ ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেডের চেয়ারম্যান মোহাম্মাদ হোসেন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রফিকুল আমীন, পরিচালক মোহাম্মদ গোফরানুল হক, সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেন, মোহাম্মদ সাঈদ-উর-রহমান, মো. মেজবাহ উদ্দিন (স্বপন), ইরফান আহমেদ সানী ও ফারহা দিবা (রফিকুল আমীনের স্ত্রী), সাবেক পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার নেপাল চন্দ্র বিশ্বাস, ইঞ্জিনিয়ার শেখ তৈয়েবুর রহমান ও সাবেক কোষাধ্যক্ষ আকবর হোসেন সুমন।

এদের মধ্যে মোহাম্মাদ হোসেনের নামে ১৩ কোটি ১১ লাখ ৭১ হাজার ৫০৮ টাকার ও রফিকুল আমীনের নামে ১৮ কোটি ২ লাখ ২৯ হাজার ৩২৩ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া মোহাম্মদ গোফরানুল হকের নামে ১৮ কোটি ২৯ লাখ ৮৫ হাজার ৫১৪ টাকার, সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেনের নামে ৬ কোটি ৪২ লাখ ৫৩ হাজার ৩০৭ টাকার, মোহাম্মদ সাঈদ-উর-রহমানের নামে ১৪ কোটি ৩৭ লাখ ৯৮ হাজার ৬৮৪ কোটি টাকার, ইরফান আহমেদ সানীর নামে ৫ কোটি ৯৯ লাখ ৫৫ হাজার ৯৭৯ টাকার, ইঞ্জিনিয়ার নেপাল চন্দ্র বিশ্বাসের নামে ৫ কোটি ৮৪ লাখ ২০ হাজার ৫৬০ টাকার, ফারহা দিবার নামে ১২ কোটি ৩৩ লাখ ৬৭ হাজার ২৭৩ টাকার, মো. মেজবাহ উদ্দিনের (স্বপন) নামে ৯ কোটি ৪৩ লাখ ৮১৩ টাকা, ইঞ্জিনিয়ার শেখ তৈয়েবুর রহমানের নামে ৯ কোটি ৬ লাখ ৮২ হাজার ৯৪১ টাকা ও আকবর হোসেন সুমনের নামে ৬ কোটি ৮৬ লাখ ৯১ হাজার ৫৩৯ টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ রয়েছে। এর মধ্যে মোহাম্মদ গোফরানুল হকের বিরুদ্ধে সম্পদের হিসাব পেশ না করার অভিযোগে ‘নন সাবমিশন’ মামলা করা হলেও তার সম্পদের ব্যাপারে অনুসন্ধান চলছে। এ পর্যায়ে অবৈধ সম্পদ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়-বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে আরেকটি মামলা করা হবে।

ওইসব সম্পদের মধ্যে বাড়ি, গাড়ি, ফ্ল্যাট, জমি, বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, শপিং সেন্টারে বিনিয়োগ, ব্যবসায় কমিশন, বিভিন্ন ব্যাংকে গচ্ছিত টাকা, মেয়াদি আমানত, প্রাইজবন্ড, বীমাসহ অন্যান্য সম্পদ রয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।এর মধ্যে রফিকুল আমীনের নামে ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেডে ২ কোটি টাকার শেয়ার, সফটেক অনলাইন (প্রা) লিমিটেডে ২ লাখ টাকার শেয়ার, ডেসটিনি শপিং সেন্টারে ৫ লাখ টাকার শেয়ার, ডিএমসিএসএলে ১ কোটি টাকার শেয়ার, সেভিংস স্কিম এমএসএস-ডিএমসিএসএলে ৪৮ লাখ টাকার শেয়ার, কমিশন ও অন্যান্য ব্যবসায় ৫ কোটি ৭১ লাখ ১৫ হাজার ২৯০ টাকা, বিভিন্ন ব্যাংকে গচ্ছিত ৩ কোটি ২০ লাখ ৯০ হাজার ৩৩৩ টাকা, রাজধানীর মগবাজারে ৫০ লাখ টাকা মূল্যের ৯১৭ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট, ধানমণ্ডিতে ১৫ লাখ টাকার (প্রদর্শিত দলিল মূল্যে) ২ হাজার ৬৩৩ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট, মোহাম্মদপুরে একটি ফ্ল্যাটের জন্য সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে অগ্রিম দেওয়া হয়েছে ৩৫ লাখ টাকা। এ ছাড়া তার নামে রয়েছে আরও সম্পদ। একইভাবে বাকি দশ কর্মকর্তার নামেও স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ পাওয়া গেছে।

প্রতারণা করে ৩ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সাবেক সেনাপ্রধান ও ডেসটিনি গ্রুপের প্রেসিডেন্ট লে. জেনারেল (অব.) হারুন অর রশিদসহ ২২ জনকে আসামি করে দুটি মামলা করা হয়েছিল ২০১২ সালের ৩১ জুলাই। মামলা দুটির দীর্ঘ তদন্ত শেষে মোট ৪ হাজার ১১৯ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুটি মামলায় ৫১ জনকে আসামি করে আদালতে আলাদাভাবে দুটি চার্জশিট পেশ করা হয় ২০১৪ সালের ৪ মে। তদন্ত পর্যায়ে অর্থ আত্মসাতের পরিমাণ ও আসামির সংখ্যা বেড়েছে। ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডের (ডিএমসিএসএল) ও ডেসটিনি ট্রি প্ল্যানটেশনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দুটি পেশ করেন তদন্ত কর্মকর্তা মোজাহার আলী সরদার ও তৌফিকুল ইসলাম। ওই দুটি মামলার বিচার চলছে।

এ বিভাগের আরও খবর
আপনার মতামত লিখুন :

Your email address will not be published.