আন্তর্জাতিক : বঙ্গভঙ্গের কারণে শুধু মানুষ নয়, দুই বাংলার বন্য প্রাণীরাও যে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা আরো একবার প্রমাণ করল ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদীয়ার একটি ঘটনা। সম্প্রতি সীমান্ত পাড়ি দিয়ে পশ্চিমবঙ্গ থেকে একটি হাতি বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করেছে। এর আগেও বেশ কয়েকবার এমন ঘটনা ঘটেছিল। তবে বনকর্মীরা তৎপর থাকায় বড়সড় কোনো বিপত্তি হয়নি।
পশ্চিমবঙ্গের হাতিদের বারবার বাংলাদেশে চলে যাওয়ার অদ্ভুত ইচ্ছা কেন? এই প্রশ্ন ঘিরেই বিড়ম্বনায় পড়েছেন রাজ্যের বনকর্তারা। তাদের মতে, ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে ‘সীমান্ত’ শব্দবন্ধটি আসার আগে দুই বাংলার মানুষের মতো প্রাণীদেরও অবাধ বিচরণ ছিল। পরবর্তীকালে দুই বাংলার সীমান্তবর্তী এলাকায় হাতিদের চলাচলের জন্য করিডর ছিল। নগরায়ণ এবং সীমান্ত ভাগের চাপে সেই জঙ্গলের করিডর বর্তমানে অবলুপ্ত। সম্প্রতি হাতিদের ফের বাংলাদেশে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। এ নিয়ে তদন্তে নেমে বনকর্তাদের দাবি, পশ্চিমবঙ্গের হাতিরা যেভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে, তাতে মনে হচ্ছে যে, পুরোনো সেই সব করিডর ধরেই তারা ওপার বাংলায় ফেলে আসা ভিটের খোঁজ করতে চাইছে।
গত বছর দুই প্রতিবেশী দেশের সীমান্তে হাতির অনুপ্রবেশ নিয়ে যখন বৈঠক হয়েছিল, তখনই এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছিল। তারপর থেকেই দুদেশের বনকর্তারা নিজেদের মতো করে হাতিদের ‘অবলুপ্ত’ হওয়া করিডরের সন্ধান চালানোর কাজ শুরু করেন। সেই অনুসন্ধানের মাঝেই সম্প্রতি একটি হাতির খোঁজ মেলে। সে বাঁকুড়া থেকে নদীয়া জেলার সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। এই ঘটনা থেকেই বনকর্তারা নিশ্চিত হন যে, হাতিরা নির্দিষ্ট করিডর ধরেই বাংলাদেশে যাওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু কেন সীমান্ত ডিঙিয়ে বাংলাদেশে ঢোকার চেষ্টা? সে বিষয়ে অবশ্য নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে পারেননি বন দপ্তরের কর্তারা। তবে তাদের দাবি, নিত্যনতুন বাসস্থানের সন্ধানে মানুষের মতো বন্য প্রাণীরাও এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে দৌড়ে বেড়ায়। এ ক্ষেত্রে সে রকমই কোনো কারণ থাকতে পারে। বিশেষ করে নতুন বাসস্থানের সন্ধানে যে পথ দিয়ে তাদের পূর্বপুরুষরা একসময় যাতায়াত করত, সেই পথকেই নিরাপদ মনে করে অনুসরণ করতে চাইছে একদল হাতি। আর তাতেই বারবার অনুপ্রবেশের মতো গুরুতর অপরাধের অভিযোগ উঠছে এই অবলা প্রাণীর বিরুদ্ধে।
পশ্চিমবঙ্গের বন দপ্তরের কর্তাদের একাংশের দাবি, অতীতে হাতিদের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের যে ঘটনা ঘটেছে, আর সাম্প্রতিক কালে যা হয়েছে, সেগুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এসব তথ্যের মাধ্যমে তারা হাতিদের এই যাত্রাপথের দুটি অবলুপ্ত করিডরের সন্ধান পেয়েছেন।
বন দপ্তরের এক কর্তা বলেন, প্রথম করিডরের ক্ষেত্রে বাঁকুড়ার গঙ্গাজলঘাটি, বড়জোড়া, বর্ধমানের ভাতার, মন্তেশ্বরে প্রবেশ করছে হাতিরা। তারপর সেখান থেকে কাটোয়ার আশপাশের কোনো অংশ দিয়ে গঙ্গা পেরিয়ে নদীয়া জেলায় ঢুকছে। সেখান থেকে নাকাশিপাড়া, তেহট্ট হয়ে জলঙ্গি নদী পেরিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছে। দ্বিতীয় করিডরের ক্ষেত্রে হাতিরা বাঁকুড়ার সোনামুখীর দিক দিয়ে অণ্ডাল হয়ে দুর্গাপুর-আসানসোলের দিকে যাচ্ছে। তারপর বীরভূম-মুর্শিদাবাদ হয়ে ফারাক্কার কাছে কোনো জায়গায় পদ্মা পেরিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করছে।
সূত্রের দাবি, বাংলাদেশের রাজশাহী এবং ঢাকার বিস্তীর্ণ অংশে একসময় হাতিদের বিচরণভূমি ছিল। কিন্তু ইংরেজ আমলে একের পর এক জঙ্গল নষ্ট হয়ে যায় এবং হাতিদের বিভিন্ন কাজে ব্যবহারের জন্য পোষ মানিয়ে ফেলা হয়। সেই থেকেই এই করিডরগুলো ধীরে ধীরে অবলুপ্ত হতে থাকে।
বন দপ্তরের হাতি নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করা এক কর্মী বলেন, আজ থেকে ১০০-১৫০ বছর আগে এই রুটে নিয়মিত হাতি চলাচল করত। এমনকি এই রুট বা করিডর ভারতের ছোটনাগপুর মালভূমির দলমা পাহাড় থেকে বাংলাদেশ হয়ে ভারতের মেঘালয় পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
বন দপ্তরের এক শীর্ষ কর্তা বলেন, প্রাথমিকভাবে তারা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন ঠিকই। কিন্তু রিপোর্ট এখনো চূড়ান্ত নয়। আরো অনুসন্ধান চালানো হবে। একই সঙ্গে পরবর্তী পর্যায়ে দুদেশের বনকর্তাদের বৈঠকে এ বিষয়ে সমাধান সূত্র বের করার চেষ্টা করা হবে।

Comments are closed.