সিটিনিউজবিডিঃ হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুসারে গত বছরের শেষদিকে দেশের প্রতিটি জেলায় খাদ্য আদালত গঠন করা হলেও শেষ হয়নি খাদ্যের মান নির্ণয়ে ল্যাবরেটরি ও রাসায়নিক পরীক্ষার নিয়ন্ত্রক নিয়োগ প্রক্রিয়া। খাদ্যে ভেজাল মেশানোর অপরাধে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে দেশের প্রচলিত আইনেই। এরপরও খাদ্যে ভেজালকারীদের আইনে নির্ধারিত সর্বোচ্চ শাস্তি দেয়ার কোনো নজির এ দেশে নেই। উন্নত বিশ্বে বা পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতেও খাদ্যে ভেজাল মেশানোর অপরাধে যথোপযুক্ত শাস্তি দেয়া হয় বলে জানা যায়। সেসব দেশে খাদ্যে ভেজাল মেশানোর হার কমিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে। আইনের সঠিক ও কঠোর প্রয়োগ না থাকায় অল্প সাজাতেই পার পেয়ে যাচ্ছে এ সংক্রান্ত মামলার আসামিরা।
হঠাৎ হঠাৎ ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযান পরিচালনা করে খাদ্যে ভেজাল কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা গেলেও এ অবস্থা থেকে দীর্ঘ মেয়াদে পরিত্রাণ মিলছেনা ভোক্তাদের। প্রচলিত আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অসাধু এ চক্রের সদস্যরা ব্যবসায়ীদের কাছে সরবারহ করে যাচ্ছে ফরমালিন, কার্বাইড, ইউরিয়া, হাইড্রোজেনসহ নানা ক্ষতিকর ও রাসায়নিক পদার্থ।
জানা যায়, খাদ্যে ভেজাল মেশানোর অপরাধের শাস্তি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে যাবজ্জীবন, চীনে মৃত্যুদণ্ড। যুক্তরাষ্ট্রে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে এ আইনে। এসব দেশে বর্তমানে এসব কঠোর আইনেই খাদ্যে ভেজাল মেশানোর মতো অপরাধের বিচার হচ্ছে। পাকিস্তানেও ভেজাল খাদ্য বিক্রিকারীদের দ্বিতীয়বার অপরাধ করার ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন তিন বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
বাংলাদেশ দন্ডবিধির ১৮৬০ সালের আইনের ২৭২ ও ২৭৩ ধারায় খাদ্যে ভেজাল মেশানোর অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া সাপেক্ষে শাস্তির বিধান রয়েছে। ২৭২ ধারায় বিক্রির জন্য খাদ্য বা পানীয়তে ভেজাল মেশানোর দায়ে কোনো ব্যক্তিকে অনধিক ছয় মাস পর্যন্ত শাস্তির বিধান রয়েছে।
২৭৩ ধারায় ক্ষতিকর খাদ্য ও পানীয় বিক্রির অপরাধেও ছয় মাসের শাস্তির বিধান রয়েছে। ওষুধে ভেজাল মেশানো বা ভেজাল ওষুধ বিক্রির জন্য দণ্ডবিধির ২৭৪ ও ২৭৫ ধারায় সর্বোচ্চ ছয় মাসের শাস্তির বিধান রয়েছে।
এরই মধ্যে ভেজাল মেশানোর প্রবণতা বাড়তে থাকায় ১৯৫৯ সালে মানুষের ভোগের জন্য খাদ্য প্রস্তুত ও বিক্রি অধিকতর নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে বিশুদ্ধ খাদ্য অধ্যাদেশ জারি করা হয়। এই অধ্যাদেশের ৬ ধারা থেকে ৩৭ ধারা পর্যন্ত খাদ্যে ভেজাল মেশানো, ভেজাল খাদ্য বিক্রি, ভেজাল খাদ্যবিরোধী অভিযানে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের বাধা দেয়ার জন্য শাস্তির বিধান করা হয়। বিশুদ্ধ খাদ্য অধ্যাদেশের এসব ধারায় সর্বোচ্চ শাস্তি তিন বছর আর সর্বনিম্ন শাস্তি ছয় মাস কারাদণ্ড করা হয়। একই সঙ্গে পাঁচ হাজার থেকে তিন লাখ টাকা জরিমানার বিধান করা হয়। কিন্তু এই আইন কার্যকর থাকলেও খাদ্যে ও ওষুধে ভেজাল মেশানো বা ভেজাল মেশানো খাদ্য বিক্রির পরিমাণ আরো বাড়তে থাকে।
আইনি বিধান ছাড়াও বিগত ছয় বছরে উপেক্ষিত হয়েছে হাইকোর্টের রায়। খাদ্যের মান বজায় রাখাসহ নিরাপদ খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে ২০০৯ সালের ২০ জুন রায়টি দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। ওই রায়ে প্রতিটি জেলায় খাদ্য আদালত গঠন এবং ল্যাবরেটরি প্রতিষ্ঠা করে খাদ্যের মান ও রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য খাদ্য পরীক্ষক নিয়োগের নির্দেশ দেয়া হয়। পরিবেশ ও মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) জনস্বার্থে দায়ের করা রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ওই রায় দেন। তবে রায়ের পর দীর্ঘ ছয় বছর সময় অতিবাহিত হয়ে গেলেও তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।
