জুবায়ের সিদ্দিকী –
রাজধানীর সবুজবাগ থেকে ৩টি বিদেশী পিস্তলসহ চারজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পুলিশী জেরায় তারা জানিয়েছেন, যশোর সীমান্ত থেকে অস্ত্র কিনে এনে তারা ঢাকায় বিক্রি করেন। ৭.৬৫ বোরের পিস্তলগুলো তরা ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকায় বিক্রি করেন। অস্ত্রগুলোর বেশিরভাগ ভারত ও পাকিস্তানের তৈরী। সারাদেশে এখন ভয়ঙ্কর সব অবৈধ অস্ত্রের ছড়াছড়ি। হাত বাড়ালে সহজেই পাওয়া যাচ্ছে আগ্নেয়াস্ত্র। বেশিরভাগ অস্ত্রই আসছে সীমান্ত এলাকা থেকে। চলে যাচ্ছে সন্ত্রাসীদের হাতে। হাতবদলও হচ্ছে এসব অস্ত্র। ভাড়ায় খাটছে অনেক অবৈধ অস্ত্র। এমনকি বৈধ অস্ত্রধারীরাও তাদের অস্ত্র ভাড়া দিচ্ছে সন্ত্রাসীদের কাছে। ভুয়া লাইসেন্স দেখিয়েও অস্ত্র কিনছে অনেক সন্ত্রাসীচক্র।
এমন এক পরিস্থিতিতে জঙ্গি থেকে শুরু করে ছোটবড় সন্ত্রাসীর হাতে এখন অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র। পাড়া মহল্লার উঠতি মাস্তানরাই শুধু নয়, ছিচকে ছিনতাইকারীরাও ব্যবহার করছে এসব অস্ত্র। ৩০ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত বেঁচাকেনা হচ্ছে অবৈধ অস্ত্র। দেশের প্রায় ৩৫টি সীমান্ত দিয়ে ঢুকছে বিপুল সংখ্যক অবৈধ অস্ত্রের চালান। এমনকি সমুদ্রপথেও আসছে অস্ত্র। সারাদেশের মত চট্টগ্রামেও টেন্ডারবাজি থেকে শুরু ছিনতাইয়ের ঘটনায় ব্যবহার হচ্ছে অস্ত্র। গোয়েন্দাদের তথ্য মতে, সারাদেশে দুই শতাধিক অবৈধ অস্ত্রের ব্যবসায়ী রয়েছেন। সীমান্তপথে ভারত ও মিয়ানমার থেকে বিভিন্ন রুটে সহজেই প্রবেশ করছে অবৈধ অস্ত্রের চালান। চট্টগ্রামের রাউজান, ফটিকছড়ি, বাঁশখালী, সাতকানিয়া ও সীতাকুন্ডে রয়েছে অস্ত্র ব্যবসায়ীদের ঘাঁটি। এসব এলাকার দুর্গম পাহাড়ে দেশি প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিপুল সংখ্যক অস্ত্র তৈরী করা হয়।
শহর থেকে মফস্বলেও ছড়িয়ে পড়েছে খুন, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি সহ নানা অপরাধ। চট্টগ্রামের সবচেয়ে বেশি অস্ত্রের ব্যবহার হচ্ছে রাউজানে। গত সপ্তাহে দিনে দুপুরে জুমার নামাজের সময় পরিবারের মহিলা সদস্যদের চোখ মুখ বেঁধে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে দুবাই প্রবাসীর ঘরে ডাকাতি হয়েছে। রাউজানের নোয়াপাড়ার ভুল্লাপাড়া গ্রামে প্রবাসী মালেকের ঘরে এই ঘটনা ঘটেছে। ইতিমধ্যে রাউজানে অনেক প্রবাসীকে প্রাননাশের হুমকি দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এখন প্রবাসীরা রাউজানের বাড়িতে যেতে চান না। নিরাপত্তাহীনতায় অনেক প্রবাসী চট্টগ্রাম শহরে বসবাস করলেও গ্রামে যেতে সাহস পান না। চাঁদাবাজি ও প্রাননাশের হুমকিতে তটস্থ রাউজানবাসী। ফটিকছড়ি, আনোয়ারা, রাঙ্গুনিয়া ও বাঁশখালীতে একই অবস্থা। তবে সবচেয়ে বেশি অস্ত্রধারীদের তাফালিং চলছে রাউজানে।
রাজনৈতিক ক্যাডার থেকে শুরু করে ছিচকে চোরের হাতেও থাকে দেশি বিদেশী অস্ত্র। ডাকাতের রাজত্ব কায়েম হয়েছে রাউজানে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন, সন্দ্বীপ, সীতাকুন্ড, রাঙ্গুনিয়া, বান্দরবান, রাঙ্গামাটির সাজেক, খাগড়াছড়ির রামগড় ও সাবরুম, ফেনি, নোয়াখালী, চাঁদপুর, খুলনা, উখিয়া, টেকনাফ, রামু ও সিলেটের বিভিন্ন সীমান্ত গিয়ে প্রতিদিন অবাধে আসছে অবৈধ অস্ত্র। দেশে নিজস্ব পদ্ধতিতেও অস্ত্র তৈরীর কারখানা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অস্ত্র ব্যবসায়ীদের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতাদের ব্যবসা রয়েছে। অনেক সময় স্থানীয় গডফাদারদের কারনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও অবৈধ অস্ত্রের ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে না।
অনুসন্ধানে ও বিভিন্ন সোর্সদের থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, দেশীয় অস্ত্র ৩০ হাজার টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। ৫০ হাজার থেকে শুরু করে ৩ লাখ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে অত্যাধুনিক বিদেশী অস্ত্র। ইতিমধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিপুল পরিমান অস্ত্র উদ্ধার করেছে। উদ্ধার হওয়া ছোট অবৈধ অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে উগনি কোম্পানীর রিভলবার, মাউজার পিস্তল, ইউএস রিভলবার, আমেরিকার তৈরী পিস্তল, নাইন এম.এম পিস্তল ও মেঘনাথ কোম্পানীর থ্রি টু বোরের রিভলবার। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের অস্ত্র আসে ভারত ও মিয়ানমার হয়ে। চাইনিজ রাইফেল, পিস্তল, রিভলবার, ষ্টেনগান, মেশিনগান, সাব-মেশিনগান, কালাশনিকভ সিরিজের একে-৪৬, একে-৪৭, একে-৫৪, একে-৫৬, একে-৭৪ ও এম-১৬ এর মতো ভয়ঙ্কর অস্ত্রও আসছে অহরহ। বঙ্গোপসাগরের বিস্তীর্ন এলাকা অরক্ষিত থাকায় অস্ত্র চোরাকারবারীরা এই পথকে সবচেয়ে ব্যবহার করে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভুয়া লাইসেন্স দিয়েও অস্ত্র বিকিকিনি চলছে। সাম্প্রতিক সময়ে একটি চক্রকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
পুলিশ জানায়, কক্সবাজারের ফজলুল করিম ও সাহাবুদ্দিন রাজধানীর পল্টনের একটি বৈধ অস্ত্রের দোকান থেকে লাইসেন্স দেখিয়েএকটি এনপিবি পিস্তল কিনে নিয়ে যায়। তাৎক্ষনিক লাইসেন্সটি পরীক্ষা করে না দেখলেও পরে এর মালিক কক্সবাজারের জেলা প্রশাসকের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পারেন লাইসেন্সটি ভুয়া। একই ব্যক্তি পরে আবারও লাইসেন্সের নাম বদলিয়ে আরেকটি অস্ত্র কিনতে এসে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। বৈধ অস্ত্র ব্যবসার আঁড়ালে অবৈধ অস্ত্রের কেনাবেচার অভিযোগ রয়েছে অনেক অস্ত্র ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে। দেশে কি পরিমান অবৈধ অস্ত্র রয়েছে তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ে। রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, ফটিকছড়ি, বাঁশখালী ও সীতাকুন্ডে অবৈধ অস্ত্রের ব্যাপক ছড়াছড়ি রয়েছে। হাতে হাতে অস্ত্র গ্রামের মেঠোপথে প্রান্তরে প্রকাশ্যে নিয়ে বেড়াচ্ছে পলিটিক্যাল ক্যাডার থেকে শুরু করে বখাটে ও মাস্তান।
এমনকি এখন মাদক ব্যবসায়ীদের হাতেও আগ্নেয়াস্ত্র শোভা পাচ্ছে। এতে করে শহরে ও মফস্বলে মাদক ব্যবসায়ীরাও বেপরোয়া। এরাও খুন খারাবীতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। বৃহত্তর চট্টগ্রামের ১৬টি উপজেলার মধ্যে বেশকিছু উপজেলায় প্রবাসীরা বাড়িতে এলে আতঙ্কে দিনযাপন করেন। নিরাপত্তাহীনতায় কেউ বা শহরের বাসায় বা হোটেলে ছুটি কাটিয়ে প্রবাসে ফিরে যান। এভাবে চরম নিরাপত্তাহীনতায় দেশে এসে দিনাতিপাত করেন প্রবাসীগন। চট্টগ্রাম শহরের কালামিয়া বাজার, বাকলিয়া বাস্তুহারা কলোনি সহ নগরীর একাধিক স্থানে অস্ত্র ব্যবসায়ীদের তৎপরতা রয়েছে। পুলিশের মাঝেমধ্যে অপারেশন চললেও থেমে নেই অস্ত্র ব্যবসা। নগরীতে এই অস্ত্র রাজনৈতিক কোন গোলযোগ বাঁধলেই পুক্ষ প্রতিপক্ষ শুরু করে গোলাগুলি। এমনকি টেন্ডারবাজিতে ব্যবহুত হচ্ছে আগ্নেয়াস্ত্র। অত্যাধুনিক অস্ত্রের ব্যবহারের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের বোমাও তৈরী হচ্ছে নগরীতে। সভা সমাবেশ থেকে শুরু করে মিছিল মারামারিতে কথায় কথায় অস্ত্রের ব্যবহার এখন ফ্যাশনে পরিনত হয়েছে।
বিএনপি জোট সরকারের আমলে একজন বিএনপি কর্মী এক নিউজের ব্যাপারে চট্টগ্রাম শহরের একজন সিনিয়র সাংবাদিককে ফোনে বললেন,’ ওড়া সাংবাদিক পিস্তল ঠেক দিয়্যুম তোরে! হাত কাটি লইয়্যম।’’ এভাবে অনেক নেতাকর্মী প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে অস্ত্র প্রদর্শন সহ অঘটন ঘটাচ্ছে। সেদিন এক প্রবাসী বললেন,’ বাড়ি যেতে ভয় হয় ডাকাতির। বিমানবন্দর থেকে চট্টগ্রাম স্বজনের বাড়িতেই থাকতে হয়। বৃহত্তর চট্টগ্রামের অনেক উপজেলায় ইদানীং ডাকাতি, চুরি, প্রতারনা, মাদক ব্যবসা সহ নানা অপরাধ বৃদ্ধিতে আতংকিত সাধারন মানুষ।
সাতকানিয়ার পুলিশ জামায়াত শিবির আখ্যা দিয়ে পথচারী, দোকানী সহ সাধারন মানুষকে অযথা হয়রানী করছে। পুলিশের এই বানিজ্যের লাগাম টেনে ধরতে ব্যর্থ হচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন। যে প্রবাসীর পাঠানো অর্থে দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা হয়, সে প্রবাসীর নিরাপত্তা দিতে আমরা ব্যর্থ হই। এ লজ্জা কোথায় রাখি। অস্ত্রের রমমরা বানিজ্য ঠেকাতে প্রয়োজন পুলিশের সাঁড়াশী ও চিরুনী অভিযান। অস্ত্রধারী যে দলের হোক তাকে আইনের আওতায় আনতে ব্যর্থ হলে এদের লাগাম টেনে রাখা সম্ভব হবে না। অস্ত্র ব্যবসা ও অস্ত্রধারীদের বেপরোয়া তাপালিং বর্তমান সময়ে স্বাভাবিক পরিবেশকে কলুষিত করছে।
