মহেশখালীতে  বাল্য বিবাহের প্রবনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে “ প্রশাসন নীরব’’

0

জামাল জাহেদ, ককসবাজার  :  গল্প ও কল্পনা নয় বাস্তব, মহেশখালীর নিত্য দিনকার কাহিনী! বাল্য বিবাহ  । এবার সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী।ভাল বর আর বুনিয়াদি ঘর পেয়ে বাবা মশিউল আলম তাকে বিয়ে দিয়েছেন ৪৩ বছর বয়সি এক ছেলের সাথে। যে বয়সে তার বই খাতা নিয়ে বিদ্যালয়ে যাবার কথা আর বান্ধবীদের সাথে খেলায় মেতে থাকার কথা আজ সে একজন পাক্কা গৃহিনী।একই অবস্থা আফসানার চাচাতো বোন শাহানার,শাপলাপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেনীর ছাত্রী।

মেয়ের গায়ের রং কালো আর কোন যৌতুকের দাবী না থাকায় তার পিতা দুলাল হোসেন তাকে বিয়ে দিয়েছেন। স্বামী সংসার না বোঝায় এখন সে তার পিতার বাড়িতেই রয়েছেন।বাহ্ এফ এম রেডিওতে যাহা বলিবো সত্য বলিতে কিশোরী মেয়ের আর্তচিৎকার, কিভাবে বাচ্চা মেয়ে থেকে বাচ্চা প্রসব হয়!!তারপরেও কেন সচেতন নয়।শুধু শাহানা কিংবা আফসানা নয় তাদের মত অপ্রাপ্ত বয়ষ্ক মেয়েদের বিয়ে হচ্ছে মহেশখালী উপজেলার প্রতিটি গ্রামে গ্রামে প্রতিনিয়ত।

অভিভাবকদের সচেতনতা, ইউপি মেম্বার চেয়ারম্যানদের অনৈতিকতা আর অসৎ কাজীদের কারণেই এ বাল্য বিয়ের প্রবণতা বেড়েছে বলে জানিয়েছেন মহেশখালীর সচেতন মহল।বেসরকারী স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রুরাল ভিষনের(আর ভি) নির্বাহী পরিচালক আনারুল ইসলাম জানান, গত ৬ মাসে মহেশখালীতে ২/১টি বিয়ে ছাড়া কোন বাল্য বিবাহ বন্ধ করেছে কিনা কার জানা নেই। আর এসময় বিয়ের পিড়িতে বসেছেন কয়েকশত কিশোরী।এক্ষেত্রে অসৎ কাজী ও বিবাহ রেজিষ্টার ছাড়াও অভিভাবকদের কারণেই এ বিয়ের ঘটনাগুলো ঘটেছে।

সামাজিক সচেনতা সৃষ্টির জন্য বিভিন্ন সভা সেমিনার ছাড়াও জনপ্রতিনিধিদেরকে বাল্য বিবাহের কুফল জানানো স্বত্ত্বেও অনেকেই বিবাহ দিচ্ছেন তাদের কিশোরীদের।তাজিয়াকাটার মোজাম্মেল  জানান, মূলতঃ বুনিয়াদি ঘর,সসৌদি প্রবাসী ছেলে ভাল বর আর যৌতুক কম লাগার কারণেই এসব বাল্যবিবাহ ঘটেছে বলে তারা মনে করেন,তবে যৌতুক প্রথমে চাইনা বলে পরে ভাত রান্নার লাকড়ি শুদ্ধ চায় বর পক্ষ। অথচ সরকারী প্রজ্ঞাপণ অনুযায়ি ১৮ বছরের নীচের বয়সী কিশোরীদের বিবাহ দেয়া আইনতঃ দ-ণীয় অপরাধ। সরকারের এই প্রজ্ঞাপণকে বৃদ্ধাঙ্গুলী প্রদর্শণ করে বাল্য বিবাহের ঘটনা ঘটছে।ঘটিভাংগা বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোখতার আহমেদ জানান, অভিভাবকদের অসচেতনতা ছাড়াও কাজী ও বিবাহ রেজিষ্টারেরা মোটা টাকা নিয়ে এসব বিয়ে পড়াচ্ছেন। এ ছাড়াও চেয়ারম্যান ও মেম্বারেরা এলাকায় নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে অল্প বয়সিদেরকে বেশী বয়স দেখিয়ে সনদপত্র প্রদান করে বিবাহ রেজিষ্টারকে সহায়তা করছেন।এসব অসৎ প্রতিনিধি ও বিবাহ রেজিষ্টারদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলেন তিনি,এমনকি  ঘটিভাংগায় তার চাকরি জীবনে অহরহ দেখেছেন বাল্যবিবাহ,শনিবার ৫ম শ্রেনীর মেয়ে ক্লাসে দেখলে সোমবারে উপস্থিত নেই, ছাএদের কাছে জানতে চাইলে বলে বিয়ে হয়ে গেছে বাহ্ বাল্যবিবাহ।বাল্যবিবাহের ভারে নিমজ্জিত বাংলাদেশ।বাড়ির উঠানে একটি মেয়ের মৃতদেহ। পাশেই মেয়েটির বাবা রহমতের এবং মা আমেনার গগনবিদারী চিৎকার। মেয়েটিকে মাত্র ১২ বছরে বিয়ে দিয়েছিলেন তারা হানিফ আলির ৩২বছর বয়সি ছেলের সঙ্গে। কিন্তু বছর ঘুরতে না ঘুরতেই মেয়ের লাশ নিতে আসতে হলো তাদের। দারিদ্র্যের অভিশাপ থেকে মেয়েকে মুক্তি দিতে গিয়ে রহমত-আমেনা মেয়ের কাছ থেকেই মুক্তি পেয়ে গেলেন। উৎসুক জনতা জানল যে, সন্তান প্রসব করতে গিয়ে মারা গেল রহমতের বাচ্চা মেয়েটি। রহমতের মতো এরকম হাজার করুণ কাহিনী বাংলার পথে-প্রান্তরে বিদ্যমান।যার ১০% মহেশখালীতে।কোথায় মহেশখালিতে বাল্যবিবাহ বেশি হয় জানতে চাইলে একাধিক সচেতন নাগরিকেরা বলেন,ঘটিভাংগা, সোনাদিয়া,ততাজিয়াকাটা, শাপলাপুর,ছোটমহেশখালি,নলবিলা,বড়মহেশখালীর মাহারাপাড়া,কালামারছড়া,ধলঘাটা,মমাতারবাড়ি ইত্যাদি জায়গার নাম বলেন।মজার ব্যাপার হলো আমরা যারা তথাকথিত সচেতন জনগোষ্ঠী বা প্রশাসন তাদের চোখের সামনে অহরহ ঘটে চলেছে এ ধরনের অনাচার।আমরা নির্বাক কেন কার জন্য এদেশে কি ফিরে আসবে রাজা রামমোহন রায়,নেতাজি বসু,মহাবীর,চৈতন্য দেব,ঈ্বশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর,হোসেন শহীদ,শেরে এ বাংলা,বেগম রোকেয়া,সুফিয়া কামালমাদার তেরেসা।বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে পিতৃতান্ত্রিক পরিবার এবং অশিক্ষাকে যদিও বাল্য বিবাহের মূল কারণ হিসেবে দায়ী করা হয়ে থাকে কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপট বলছে ভিন্ন বাস্তবতা। বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এদেশে মিডিয়ার প্রসার বেড়েছে। কিন্তু বাড়েনি সামাজিক মূল্যবোধের প্রচার প্রসার। আকাশ সংস্কৃতির দৌরাত্ম্যে আমাদের মূল্যবোধের ক্ষয়ের পরিমাণ দিন দিন বেড়েই চলেছে। এরই এক নগ্ন প্রকাশ হলো বাল্যবিবাহ। দারিদ্র্য, ইভটিজিং, জনসচেতনতার অভাব ও রাজনৈতিক অস্থিরতা বাল্যবিবাহকে আরও বহুমুখী রূপ প্রদান করেছে। দারিদ্র্যের কারণে আধুনিক শিক্ষা থেকে অধিকাংশ মেয়েরা বঞ্চিত হচ্ছে। অশিক্ষা-কুশিক্ষা জনসাধারণকে করছে বিপথগামী। যে কারণে অপরিণত বয়সে মেয়েদের বিবাহ হচ্ছে। বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক এন্ড হেলথ সার্ভে ২০০৭-এর তথ্য অনুযায়ী ১৮ বছরের আগে ৬৬ শতাংশ মেয়ে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছে। গত দুই দশক ধরে এ হার অপরিবর্তিত রয়েছে। আবার ঐ ৬৬ শতাংশের এক তৃতীয়াংশ ১৯ বছর হওয়ার আগেই গর্ভবতী হচ্ছে। বাল্য বিবাহ সম্পর্কিত জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিল বিষয়ক কার্যক্রম (ইউএনএফপিএ)র প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন দেখা যায়, পৃথিবীর সেরা ১০টি দেশের মধ্যে বাল্য বিবাহের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অধিক ঝুঁকিপূর্ণ। বাংলাদেশের অঞ্চল অনুযায়ী বাল্য বিবাহের হার খুলনা অঞ্চলে শতকরা ৭৫ ভাগ, বরিশালে ৭২ ভাগ, ঢাকায় ৬৬ ভাগ, চট্টগ্রামে ৫৮ ভাগ এবং সিলেটে শতকরা ৪৮ ভাগ। প্রতিবেদনে আরও বলা হয় ২০১২ সালে বাল্য বিবাহের ক্ষেত্রে উচ্চহার সম্পন্ন ৩০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) কর্তৃক প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশের ১৮ বছরের আগে ৬৬ শতাংশ মেয়ে এবং একই বয়সের ৫ শতাংশ ছেলের বিয়ে হচ্ছে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে ১০-১৯ বছর বয়সের দুই তৃতীয়াংশ কিশোরী বাল্য বিবাহের শিকার হয়। সেভ দ্যা চিলড্রেন-এর ২০১০ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের ৬৯ শতাংশ নারীর ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। জাতীয় কন্যা শিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম-এর তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের বাল্য বিবাহের হার ২০০৯ সালে ছিল ৬৪ শতাংশ, যা ২০১১ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ৬৬ শতাংশে। এসব তথ্য উপাত্ত পরিসংখ্যান আমাদের দেশের জন্য সুখকর কিছু নয়। কারণ বাল্যবিবাহ শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি করে না পারিবারিক, সামাজিক এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রের ক্ষতিসাধনও করে থাকে। অল্প বয়সের একটি মেয়ে যে তার নিজের সম্পর্কেই সচেতন নয়, পরিবার সম্পর্কে তার ধারণা না থাকাই স্বাভাবিক। ফলে মা হওয়ার পর তার পক্ষে শিশুর স্বাভাবিক পরিচর্যা করা সম্ভব হয় না। অশান্তি, পারিবারিক কলহ, নির্যাতন প্রভৃতির কারণে শিশুরা ভোগে নানা মানসিক অশান্তিতে।বাংলাদেশ সরকার ১৯৯২ সালে বাল্য বিবাহ বিরোধী আইন পাশ করেন। এ আইন অনুযায়ী বাল্য বিবাহ শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ আইনে পুরুষের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ২১ বছর এবং নারীর ন্যূনতম ১৮ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। এ আইন লঙ্ঘন করে বিয়ের সঙ্গে জড়িত বর-কনের অভিভাবক, আত্মীয়, ইমাম বা কাজীসহ সবার শাস্তির বিধান রয়েছে। জড়িত পুরুষদের এখনও পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদ- অথবা এক হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দ- এবং নারীর ক্ষেত্রে জরিমানা হতে পারে। ছেলে সাবালক ও মেয়ে নাবালক হলে ছেলের এক মাস পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদ- অথবা এক হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দ- হতে পারে। বর-কনে দু’জনই নাবালক হলে তাদের কোনো শাস্তি হবে না। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি হলো কাজির গরু গোয়ালেই রয়েছে- এসব আইন আছে ঠিকই, কিন্তু তার প্রয়োগ নেই। এর কারণ একাধিক। অধিকাংশ দরিদ্র পরিবার কন্যা সন্তানকে বোঝা বলে মনে করে। ফলে ভরণ পোষণের বাড়তি চাপ থেকে মুক্তি পেতে অনেকে কিশোরী বয়সে মেয়েদের বিয়ে দিয়ে থাকে। এছাড়া বয়স হলে মেয়ের বিয়ে হবে না, এ ভয়েও অনেক অভিভাবক অল্প বয়সে মেয়ে সন্তানকে বিয়ে দেন। ছেলে এবং তার পরিবারের মানসিকতাও এক্ষেত্রে অনেকাংশে দায়ী। তাছাড়া রাস্তাঘাটে মেয়েদের যৌন নির্যাতন এবং ইভটিজিং এর ভয়ে অভিভাবকরা অপ্রাপ্ত বয়সে মেয়েদের বিয়ে দিয়ে থাকে। তাদের ধারণা মেয়ে স্বামীর বাড়িতে গেলে নিরাপদ থাকবে। কিন্তু তারা এটা ভুলে যায় যে, প্রকৃতপক্ষে মেয়েকে তারা সম্পূর্ণ অচেনা অজানা পরিবেশে এই অল্প বয়সে তাকে বিয়ে দিয়ে নিঃসঙ্গ করে দিচ্ছে। তারা যে শুধু মেয়েটির ভবিষ্যত ভাবনাকে অঙ্কুরে বিনষ্ট করছে তা নয়, শারীরিক ও মানসিকভাবে পঙ্গুত্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছে তাকে।সরকার সর্বশক্তি দিয়ে বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করেছে, এ বিষয়ে ব্যাপক প্রচারও করছে। এক্ষেত্রে বিভিন্ন এনজিও সংগঠনের কার্যক্রমও পরিপূরক ভূমিকা পালন করছে। কিন্তু এতদসত্ত্বেও কার্যকরভাবে বাল্যবিবাহ রোধ করা যাচ্ছে না। ফলে বেড়ে যাচ্ছে বিবাহ বিচ্ছেদ, বহুবিবাহ, নারী-নির্যাতন, পরকীয়া, আত্মহত্যা, পুষ্টিহীন ও প্রতিবন্ধী শিশু প্রসব এবং গর্ভজনিত ও অপুষ্টিজনিত মৃত্যু। উদ্ভূত এসব সমস্যা মোকাবিলায় সরকারকে প্রতিনিয়ত ব্যতিব্যস্ত থাকতে হচ্ছে।কুতুবজোমের কাজী কায়সার সাহেবের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন,কেউ যদি বিবাহের ব্যাপারে ডাকেন তবে তিনি আগেই জানতে চায় মেয়ের বয়স কতো,আর সে যদি চেয়ারম্যানের জম্মনিবন্ধন বা সরকার ঘোষিত আইডি কার্ড পায় তবে করেন নাহয় করেন না।অন্যদিকে মেহেররিয়া পাড়ার জসিম বলেন,১৫০টাকা দিলে পরিষদে ইচ্চামতো কার্ড বানাইদেন,কোন সমস্যা নেই, হাজার সসিল স্বাক্ষর ভুয়া বানাইদেন বলে তিনি জানান।বাল্যবিবাহ রোধে সর্বপ্রথম দরকার পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং দেশের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর অগ্রসর ভূমিকা। সবার সম্মিলিত প্রয়াসই কেবল রুখে দিতে পারে বাল্যবিবাহের এই বিপজ্জনক। মহেশখালীর উপজেলা প্রশাসনের নির্বাহী অফিসার আনোয়ারুল নাসের বলেন,কেউ যদি ফোনে কিংবা সরাসরি অভিযোগ করে কোথাও জোর করে বাল্য বিবাহ দিচ্ছে তাহলে সাথে সাথে তিনি আইনি প্রকিয়ায় তা বন্ধ করবেন বলে জোর প্রতিশ্রুতি দেন।বাকিটা ভবিষ্যতের ব্যাপার।

এ বিভাগের আরও খবর
আপনার মতামত লিখুন :

Your email address will not be published.