শহিদুল ইসলাম, উখিয়া(কক্সবাজার) : কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির ক্যাম্পে নিবন্ধিত ১৩ হাজার ১৭৯ রোহিঙ্গা কাগজে-কলমে লিপিবদ্ধ থাকলেও বাস্তবে নেই। প্রায় ৩ হাজার ৫০০ হাজার রোহিঙ্গা মালয়েশিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থান করলেও ওইসব রোহিঙ্গা সরকারি বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে দীর্ঘদিন থেকে। এমন কি আর্ন্তজাতিক শরণার্থী অভিবাসন সংস্থা ইউএনএইচসিআরের রেশন সামগ্রী নিয়মিত উত্তোলন করে যাচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। আর এ খাতে সরকারের কোটি কোটি টাকা অপচয় হচ্ছে।
জানা গেছে, ১৯৯১ সালের শেষের দিকে সীমান্তের নাফ নদী ও স্থলপথ অতিক্রম করে প্রায় আড়াই লক্ষাধিক রোহিঙ্গা নাগরিক সপরিবারে দেশে অনুপ্রবেশ করে। এ সময় প্রশাসন জেলার বিভিন্ন স্থানে তাদের অস্থায়ীভাবে পুনর্বাসন করে খাদ্য ও মানবিক সহায়তা দেয়। পরবর্তীতে দু’দেশের উচ্চ পর্যায়ের কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে মিয়ানমার সরকার ওইসব রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে রাজি হলে, শুরু হয় প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া। ২০০৫ সালে এসে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে উখিয়ার কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্পে আটকা পড়ে যায় প্রায় ১৩ হাজার ১৭৯ জন রোহিঙ্গা নাগরিক।
দীর্ঘদিন বসবাস করার সুযোগে এসব রোহিঙ্গা স্থানীয়দের সঙ্গে আত্মীয়তার সূত্রতায় ভুয়া জাতীয় সনদ ও আনুষঙ্গিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গলাকাটা পাসপোর্ট তৈরি করে পরে তা নিয়ে আকাশপথে ও অবৈধভাবে সাগরপথে মালয়েশিয়া রওনা হয়। এভাবে নিবন্ধিত প্রায় আড়াই হাজার রোহিঙ্গা নাগরিক উধাও হয়ে যাওয়ার সত্যতা স্বীকার করে কুতুপালং ক্যাম্পের নিবন্ধিত রোহিঙ্গা শামশু মাঝি জানায়, ক্যাম্পে অনুপস্থিত থাকলেও তাদের নামে বরাদ্দ দেওয়া ত্রাণ সামগ্রীসহ যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা তারা এখনও ভোগ করে আসছে। ক্যাম্প ম্যানেজমেন্ট কমিটির সেক্রেটারি মোহাম্মদ ইসমাইল জানান, ক্যাম্প ছেড়ে মধ্যপ্রাচ্যসহ মালয়েশিয়ায় অবস্থান করা প্রবাসী রোহিঙ্গাদের নাম রেশন বিতরণ তালিকা থেকে বাদ না দেওয়ার কারণে এ খাতে সরকারের কোটি কোটি টাকা অপচয় হচ্ছে।
জানা গেছে, ইউএনএইচসিআর কর্তৃক প্রদত্ত ত্রাণসামগ্রী বিতরণের ধারাবাহিকতায় জনপ্রতি রোহিঙ্গাকে প্রতিমাসে ৬২০ টাকার মালামাল ফুডকার্ডের মাধ্যমে বিতরণ করা হচ্ছে। অনুপস্থিত রোহিঙ্গারা কীভাবে ফুডকার্ড পেতে সক্ষম হয়েছে তা নিয়ে অন্যান্য রোহিঙ্গার মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। হেলপ কক্সবাজারের নির্বাহী পরিচালক আবুল কাশেম এমএ জানান, আড়াই হাজার রোহিঙ্গার বিপরীতে বরাদ্দ দেওয়া প্রতিমাসে ১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা সরকারের অপচয় হচ্ছে। গত সোমবার মিয়ানমার থেকে ফেরত আসা দেড়শ’ বাংলাদেশি অভিবাসীর মধ্যে কুতুপালং ক্যাম্পের নিবন্ধিত রোহিঙ্গা দু’জন মানবপাচারকারী দালাল যথাক্রমে মোহাম্মদ হামিদ ও ইদ্রিসকে পুলিশ শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তোফায়েল আহমদ জানান, ওই দুইজন রোহিঙ্গার বিরুদ্ধে মানবপাচার প্রতিরোধ আইনে মামলা রুজু করা হয়েছে।
কুতুপালং ক্যাম্প ইনচার্জ দিদারুল আলম জানান, ক্যাম্পের বাউন্ডারি নিরাপত্তা বলয় না থাকার কারণে রোহিঙ্গারা কে, কোথায় যাচ্ছে তা ক্যাম্প প্রশাসনের জানা থাকে না। তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাঠানো পরিপত্রের সূত্রতায় নিবন্ধিত ১৩ হাজার ১৭৯ জন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আছে কি না তা দেখার জন্য শিগগির জরিপ কাজ শুরু করা হবে। কক্সবাজার জেলার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও আন্দোলন সংগ্রাম কমিটি চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী জানান, কুতুপালং নিবন্ধিত ক্যাম্পের পাশেই অবস্থিত অবৈধ রোহিঙ্গা বস্তিতে প্রায় লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বসবাস করছে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্প ভিত্তিক ৪৩ জন দালালচক্রের মাধ্যমে অসংখ্য রোহিঙ্গা নাফ নদী পার হয়ে কুতুপালং ও টেকনাফের নয়াপাড়া শরনার্থী শিবিরে আশ্রয় নেয়। আর এ সুযোগে সাগর পথে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে পাচারের জন্য কাজ করে গেলেও প্রশাসনের উদাসিনতার কারণে তা বন্ধ হয়নি। এদিকে মিয়ানমার সরকার ওইসব রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশী বানানোর পায়তারা ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সরকার ও বিশ্ববাসীকে এ ব্যাপারে কঠোর অবস্থান নিয়ে মিয়ানমার সরকারকে রোহিঙ্গাদের তাদের দেশের নাগরিক হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য করার জন্য তিনি আহবান জানান।
তাই এসব রোহিঙ্গার দ্রুত প্রত্যাবাসন সম্পন্ন করা জরুরি হয়ে পড়েছে। কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মোঃ আলী হোসেন বলেন, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে ইতিমধ্যে দু’দেশের সমন্বয়ে একাধিক বৈঠকে বিষয়টি সমাধানের জন্য আশ্বস্থ করলেও মিয়ানমার সরকার বার বার তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করার কারণে প্রত্যবাসন কার্যক্রম ঝুলে রয়েছে।
