উখিয়ায় গহীন অরন্যে অবৈধ ইটভাটা

0

শহিদুল ইসলাম, উখিয়া (কক্সবাজার) : উখিয়া উপজেলার পার্শ্ববর্তী উপজেলা নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুমের গহীন অরণ্যে অবৈধভাবে গড়ে তোলা হচ্ছে একের পর এক ইট ভাটা। বনভূমির পাহাড় কাটা মাটি দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে ইট। জ্বালানী হিসেবে যোগান দেওয়া হচ্ছে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মূল্যবান গাছগাছালি। গত ৫ বছরে এ পাহাড়ী এলাকার গহীন অরন্যে প্রায় ৫টির অধিক অবৈধ ইটভাড়া গড়ে তোলা হয়েছে প্রশাসনের চোখে ধুলো দিয়ে। ঐ সমস্ত ইট ভাটার আশে পাশে নির্বিচারে বন জঙ্গল লুটপাট, পাহাড় কর্তনসহ নানাবিদ তান্ডবে বনভূমি লন্ডভন্ড হয়ে গেলেও দেখার কেউ নেই। ইট ভাটার বিষাক্ত কালো ধোঁয়ায় আক্রান্ত এলাকাবাসী প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দেওয়ার পরও বহাল তবিয়তে চালিয়ে যাচ্ছে অবৈধ ইট তৈরির কার্যক্রম। স্থানীয় গ্রামবাসীর অভিযোগ, প্রভাবশালী চক্রের হাতে বনবিভাগের দুর্নীতি পরায়ন কর্তাব্যক্তিরা ম্যানেজ হওয়ার কারণে অবৈধ ইটভাটা কার্যক্রম বন্ধ হচ্ছে না।

উখিয়া সদর থেকে রওনা হয়ে ৫ কিলোমিটার অদূরে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নের রেজু আমতলী এলাকায় গিয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি বললেন, পূর্ব দিকের গহিন অরণ্যে বেশ কয়েকটি ইটভাটাটি স্থাপন করা হয়েছে। পরে আরো ঘন্টা খানেক পায়ে হেঁটে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, একটি ইটভাটায় শ্রমিকেরা পাহাড় কেটে ইট তৈরির মাটি মজুদ করছে। আরো কিছূ দূর ভিতরে গিয়ে দেখা যায়, বনাঞ্চলের গাছ কেটে শত শত মেট্রিকটন লাকড়ি মজুদ করা হয়েছে। উখিয়ার বালুখালী গ্রামের আলী হোছনের ছেলে নুরুল হক কোম্পানী রেজু আমতলী মগপাড়া এলাকার কারবারী চালপ্রু থেকে পাহাড়ী জমি ১০ বছরের জন্য লিজ নিয়েছে।

এ ছাড়াও উখিয়ার আ’লীগ নেতা নামধারী আলী আহমদ কোম্পানী একটি ইট ভাটার কাজ পুরোদমে চালিয়ে যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, আজু খাইয়ার আবুল কালাম ও চাইল্ল্যতলীতে লক্ষী কান্তি মেম্বার ইট ভাটা তৈরি করার কজ শুরু করেছে। পাশে সরকারী পাহাড় থেকে লাকড়ী সংগ্রহ করে ইট ভাটায় মজুদ করছে। ইট ভাটার মাটির জন্য এস্কেবেল্টার দিয়ে পাহাড়ের মাটি কেটে ইট ভাটায় মজুদ করছে। শুধু আলী আহামদ কোম্পিনীর ইটভাটা নয়, প্রভাবশালী আওয়ামীলীগ নেতা নামধারীরা প্রভাব বিস্তার করে বেশ কয়েকটি ইটভাটা চালিয়ে যাচ্ছেন গহীন অরন্যে। স্থানীয় প্রশাসন এসব ই্টভাটার ব্যাপারে অবগত থাকলেও রহস্যজনকভাবে নিরব তারা।
কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারি পরিচালক সর্দার শরিফুল ইসলাম জানান, সংশোধিত আইনে সংযোজিত পরিবেশ ও জীববৈচিত্র সংরক্ষণ ও উন্নয়নের স্বার্থে আধূনিক প্রযুক্তির ইট ভাটা অর্থাৎ জিগজাগ কিলন, টানেল কিলন বা অনুরূপ উন্নততর প্রযুক্তিতে ইট ভাটা স্থাপন করতে হবে। কৃষি জমি বা পাহাড় বা ঢিলা থেকে মাটি কেটে বা সংগ্রহ করে ইটের কাচাঁমাল হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে ইট তৈরি করার জন্য মজা পুকুর, খালবিল, নদনদী, চরাঞ্চল বা পাহাড় কেটে মাটি সংগ্রহ করা যাবে না।

মাটির ব্যবহার কমানোর জন্য কমপক্ষে ৫০ শতাংশ ফাঁপা ইট তৈরি করতে হবে। নির্ধারিত মান মাত্রায় কয়লা ব্যবহার করতে হবে। যেসব জায়গায় ইটভাটা স্থাপন করা যাবে না সেগুলো হচ্ছে উপজেলা সদর, সরকারি বা ব্যক্তিমালিকানাধীন বন, অভয়ারণ্য বাগান বা কৃষি জমি, পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা, নিষিদ্ধ এলাকার সীমা রেখা থেকে নূন্যতম ১ কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে ইট ভাটা করা যাবে না। পার্বত্য জেলায় পরিবেশ উন্নয়ন কমিটির নির্ধারিত স্থানছাড়া অন্যকোন স্থানে ইট ভাটা তৈরি সম্পূর্ণ নিষেধ রয়েছে। তিনি জানান, বান্দরবানের বিভিন্ন স্থানে প্রায় ৩৫টি ইট ভাটা রয়েছে। যার একটিও নীতিমালায় পড়ে না।
এদিকে ইটভাটা মালিক বালুখালী গ্রামের নুরুল হক কোম্পানী জানান, তার কাছে ইট ভাটার কোন বৈধ কাগজ পত্র নেই।
লক্ষী কান্ত মেম্বার জানান, সে ইট ভাটা করার জন্য চাইল্ল্যাতলীতে অন্যজনকে জমি ইজারা দিয়েছি।
আজুখাইয়ার আবুল কালাম জানান, ইট ভাটা করতে কোন কাগজ পত্র লাগেনা, প্রশাসন ঠিক থাকলে সবই ঠিক।
ঘুমধুম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান একেএম জাহাঙ্গীর আজিজ অবৈধ ইটভাটাগুলো উচ্ছেদের ব্যাপারে স্থানীয় সাংবাদিকদের সহযোগীতা কামনা করে বলেন, পত্রপত্রিকায় ফলাও করে ইটভাটার তথ্য প্রচার করা না হলে তা বন্ধ করা সম্ভব হবে না।
তিনি বলেন, ঘুমধুম ইউনিয়নে অবৈধ ভাবে গড়ে উঠা এসব ইটভাটার কারণে পাহাড় কাটা, বন সম্পদ ধ্বংসের তান্ডবলীলা চলছে।
নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবু মোঃ সায়েদুল ইসলাম বলেন, ঘুমধুম ইউনিয়নে যে সব ইট ভাটা তৈরি হচ্ছে একটারও বৈধতা নেই। ওই সব ইট ভাটার মালিকের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
লামা বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোঃ কামাল উদ্দিন বলেন, অবৈধ ইট ভাটার মালিকদের বিরুদ্ধে যত দ্রুত সম্ভব ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বান্দরবান জেলা প্রশাসক দীলিপ কুমার জানান, ওই সব ইট ভাটার কোন বৈধতা থাকার কথা নয়, তবে শিঘ্রই ওই সব ইট ভাটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ বিভাগের আরও খবর
আপনার মতামত লিখুন :

Your email address will not be published.