অপ্রতিরোধ্য সরকারি দল ও জামায়াতের কৌশল

0

জুবায়ের সিদ্দিকী : উনারা রাজনীতি করেন। সবার সরকার সমর্থক। কেউ যুবলীগ, ছাত্রলীগ, কেউ আওয়ামী লীগ অথবা কোন সংগঠনের সদস্য। একই আদর্শের অনুসারী হলেও একে অন্যের সঙ্গে তাদের আজন্ম এক শত্রুতা। যেন সাপে নেউলে সম্পর্ক। কারন: এলাকার আধিপত্য, চাঁদাবাজি ও ভাগ ভাটোয়ারা অথবা টেন্ডারবাজি। যেন দাপটের ক্ষমতাধর নেতা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ক্ষমতার রাজনীতির বলয়ে এক শ্রেনীর সরকার সমর্থক রাজনৈতিক নেতাকর্মী দেশের বিভিন্ন স্থানে কি শহর বা উপজেলা বা অঁজপাড়াগাঁ খুনাখুনিতে জড়িয়ে পড়েছেন। নিজ নিজ এলাকার আধিপত্য বিস্তার নিয়ে অভ্যন্তরীন কোন্দল প্রকট হওয়ায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, ফেনী, লক্ষীপুর, মেহেরপুর ও কুষ্টিয়ায় অনেকে প্রান হারিয়েছেন। একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার মতে, দলীয় কোন্দলে এসব ঘটনা ঘটছে। সব চাঞ্চল্যকর ঘটনার তদন্ত করে দেখা গেছে, বেশিরভাগ খুনের ঘটনা ঘটে আধিপত্য ও ভাগ ভাটোয়ারার দ্বন্দ্বে। এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে পদ পদবী বা এলাকার আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এসব ঘটনা হয়।

তবে পরিবারগুলোর দাবী, রাজনৈতিক কারনে শত্রুর সৃষ্টি হয়েছে। একই দল হলেও প্রতিপক্ষ শক্তিশালী থাকলে এসব ঘটনার বি”ার হচ্ছে না। চট্টগ্রামে অহরহ ঘটেছে এ ধরনের নৃশংস ঘটন। শুধু সরকার সমর্থক নয়। একই নেতার অনুসারী হয়ে গত সপ্তাহ থেকে ছাত্রলীগের বিবাদমান দুটি গ্রুপ এখনো মুখোমুখি। এরা মিছিল করে কিরিচ ও লাঠিসোটা নিয়ে। প্রকাশ্যে গুলি ছুঁড়ে। গাড়ি ভাংচুর করে। দোকানের ক্যাস লুঠ করে। এভাবে মতবিরোধ থেকে অথবা কখনো গ্রুপিং পলিটিক্সে ঠেলে দিচ্ছে সহিংস রাজনীতির দাবানলের দিকে।

নিহত ও আহত হচ্ছে দলীয় কর্মী। অস্ত্রের মহড়ায় জনপদ ও রাজপথ প্রকম্পিত হচ্ছে। মানুষের জানমাল হুমকিতে পড়েছে। স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ব্যাঘাত ঘটছে। রাজনীতির অক্টোপাস গ্রাস করেছে নিরহ মানুষকে। এদিকে দল ক্ষমতায় থাকায় সুযোগসন্ধানীরা প্রবেশ করছে দলে। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে ভিন্ন মতের বা ভিন্ন আদর্শের লোকজনকে দলে টেনে আনা হচ্ছে। হাইব্রীড়, চামচা, চাটুকার ও নব্য আওয়ামীলীগাররা দলে এখন গুরুত্বপুর্ন হয়ে উঠেছে। এরা এখন সরকারের ভাবমুর্তি বিনষ্ট করছে।

এই তো গেল সপ্তাহে বাঁশখালীর এমপি মোস্তাফিজুর রহমান মুঠোফোনে হত্যার হুমকি দেন স্থানীয় দৈনিকের এক সাংবাদিককে। এ ঘটনায় উদ্বেগ ও উৎকন্ঠা প্রকাশ করে চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়ন নিন্দা জানিয়েছে। একজন সংসদ সদস্য যদি এভাবে সাংবাদিককে প্রাননাশের হুমকি দেয় তাহলে সাধারন মানুষের অবস্থা যে কেরোসিন হবে তা সহজেই অনুমেয়। একজন সাংবাদিকের সাথে সংসদ সদস্যের এমন ঔধ্যত্ব্যপুর্ন আচরন অত্যন্ত দু:খজনক। বেদনাদায়ক ও লজ্বার। জনগনের প্রতিনিধির আচরন এমন হতে পারে না।সেদিন আন্দরকিল্লায় ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষের সময় ফটো সাংবাদিক হায়দার আলীর ক্যামেরা ও মুঠোফোন কেড়ে নেওয়া হয়। লাঞ্ছিত হন সাংবাদিক। আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড এ ব্যাপারে সঠিক কোন বিহিত ব্যবস্থা না নিলে দুবৃত্তদের লাগাম ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।

আওয়ামী লীগে এখন অনুপ্রবেশকারী বসন্তের কোকিল ও সুযোগসন্ধানীরা সরকারের ভাবমুর্তি বিনষ্ট করছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আড়াই বছরে ৫ হাজার জামায়াত নেতাকর্মী আওয়ামী লীগে এখন সক্রিয়। জামায়াতের নেতাকর্মীদের সাদরে গ্রহন আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মীদের ভীষন অস্বস্থিতে ফেলেছে। ২০১৪ সালের জুলাই পর্যন্ত সারাদেশে বিভিন্ন স্থানে জামায়াত বিএনপি নেতাদের দলবদলের হিড়িক পড়ে যায়।

এরপর দলীয় সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিন্ন দল থেকে দলে না ভেড়াতে নির্দেশ দিয়ে বলেন, জামায়াত বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে নয়- আওয়ামী লীগের কর্মী সমর্থক যথেষ্ট আছে। এ নির্দেশনা অমান্য করে জেলা উপজেলায় জামায়াত শিবিরের নেতাদের দলে ভেড়ান কেন্দ্রীয় নেতা, এমপি ও মন্ত্রীরা। চলতি বছরে ইউপি নির্বাচনের ১৫দিন আগে চট্টগ্রাম-১৫ Ñসাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনের এমপি ড.আবু রেজা নদভী জামায়াত নেতা নুর আহাম্মদকে সোনাকানিয়া ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের প্রার্থী করেন। এর আগে পৌরসভা নির্বাচনের সময় জামায়াত নেতা ওসমান গনী চৌধুরী ও সাতকানিয়া পৌর বিএনপি নেতা মোহাম্মদুর রহমানকে আওয়ামী লীগে যোগদান করিয়েছেন এমপি নদভী।

অনুসন্ধানে জানা যায় যে, সরকারীদলের নেতাদের সঙ্গে সমঝোতা সহ নানাভাবে কৌশল করে এগুচ্ছে জামায়াত। দলটির নেতাকর্মীদের অনেকেই হয় কারাগারে না হয় পলাতক অবস্থায় রয়েছেন। এই পরিস্থিতিতেও দলের বড় অংশের নেতাকর্মীরা টিকে আছেন ছদ্মবেশে। সারাদেশে জামায়াত শিবির নেতাকর্মীরা ভিন্ন ভিন্ন কৌশল নিয়েছেন নিজেদের রক্ষার তাগিদে। কেউ ব্যস্ত ব্যবসা বানিজ্যে। কেউ বিদেশে রয়েছেন। দেশের সাতক্ষীরা, রংপুর, ঝিনাইদহ, কুমিল্লা, চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড ও কক্সবাজার সহ প্রতিটি জেলা সদরে জামায়াত শিবিরের নামিদামী ব্যবসা প্রতিষ্টানের মালিক জামায়াত সংশ্লিষ্টরা। যৌথ মুলধনের ভিত্তিতে গড়ে উঠা এসব ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে সরকারদলীয়দের আঁড়ালে আশ্রয় দিচ্ছেন। সেসব প্রতিষ্টানে সরকারী দলের প্রভাবশালীদের নিয়োগ দিচ্ছেন। চিরচেনা স্বভাবের এনেছেন পরিবর্তন। দলের প্রধান আইনজীবি আবদুর রাজ্জাক দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন বিদেশে। বছরখানেক আগেও জামায়াত শিবির কর্মীদের রাজপথে ঝটিকা মিছিল করতে দেখা যেত। এখন প্রকাশ্য কোন কর্মসুচীতে দেখা যায় না জামায়াত শিবিরকে। দলটির অনেকে বোল পাল্টিয়েছেন। এখন আগের মত বেফাঁস কথা না বলে ইতিহাসকে স্বীকার করছেন।

অভিজ্ঞ মহল বলছেন, জামায়াত শিবিরের এত নেতাকর্মী গেল কোথায়। জামায়াতকে সরকার নিষিদ্ধ না করলেও আপাতত জামায়াত ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেই বিএনপির। দলটির মতে, জামায়াতকে নিয়ে রাজনীতি করবে সরকার। বিএনপি ছেড়ে দিলেই সরকার যে জামায়াতকে কাছে টানবে না তার কোন নিশ্চয়তা নেই। বিএনপির নীতিনির্ধারকরা বলছেন, সরকার নিষিদ্ধ করার আগে জামায়াতকে ছাড়বে না বিএনপি। এ ছাড়া নির্বাচনে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করায় তারা স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করতে পারছে না। সেই হিসাবে জামায়াতকে নিয়ে আগামীতে নির্বাচনে গেলে তাদের ভোট ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত হবে বলে মনে করে বিএনপি।

যার কারনে বিএনপির সাথে জামায়াতের যোগাযোগ রয়েছে। বিএনপির দলীয় অনেক কর্মসুচীতে জামায়াত শিবিরের নেতাকর্মীদের ছদ্মবেশে উপস্থিত থাকার জন্য জনগনও প্রত্যক্ষ করেছে। চট্টগ্রামে জামায়াত নিয়ন্ত্রিত ব্যবসা প্রতিষ্টানগুলো বেশ ভালভাবে চলছে। কারন: এদের সাথে সরকারীদলের কোন না কোন নেতার সাথে রয়েছে সুসম্পর্ক। সারাদেশে জামায়াতের মত বিএনপির অনেক নেতাকর্মীও দল বদল করে সরকারীদলে প্রবেশ করেছেন। চট্টগ্রামে এলডিপি নেতা ও চন্দনাইশ উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল জব্বার ডিগবাজি দিয়ে ডুকেছেন আওয়ামী লীগে। তিনি আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম চৌধুরীকে ফুলের তোড়া দিয়ে যোগদান করেন।

এ বিভাগের আরও খবর
আপনার মতামত লিখুন :

Your email address will not be published.