মো: সাইফুল উদ্দীন, রাঙামাটি : পিতা-মাতা হারা কিংবা পিতা হারা মেয়েদের ঠিকানা হচ্ছে শিশু পরিবার। সারা দেশের ন্যায় রাঙামাটির ভেদভেদীতে রয়েছে ঠিক এমনি একটি শিশু সদন বা শিশু পরিবার। দুই একর জমিতে ধর্মেটরি ২টি (একটি ৪তলা অন্যটি ৩ তলা), অফিস ভবন ১টি, প্রশিক্ষণ ভবন ১টি, রান্না ঘর ১টি, অফিসার কোয়াটার ১টি, কর্মচারী কোয়াটার ১টি (২ তলা) নিয়ে রয়েছে এই পরিবারের স্থাপনা।
শিশু পরিবারে আসন হচ্ছে ১৭৫টি অবস্থানরত মোট বালিকা ১৬১ জন, খালি রয়েছে আরো ১৪টি। অবস্থানরতদের মধ্যে চাকমা ৭০ জন, মুসলিম ৪৮ জন, মারমা ১৮ জন, ত্রিপুরা ০৯ জন, পাংখোয়া ০৫ জন, তংঞ্চঙ্গা ০৫ জন, হিন্দু ০২ জন, বম ০১ জন, খেয়াং ০২ জন, বড়–য়া ০২ জন।
কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দদের মধ্যে উপ-তত্ত্বাবধায়ক পদ ১টি সে পদে কেউ না থাকায় সমাজ সেবা থেকে একজন অতিরিক্ত ভাবে দায়িত্ব পালন করছেন। সহকারী উপ-তত্বাবধায়ক পদ ১টি সে পদ খালি রয়েছে। খন্দকালিন চিকিৎসক পদ রয়েছে ১টি, সে পদে ১ জন দায়িত্ব প্রাপ্ত রয়েছে, সহকারী শিক্ষক পদ রয়েছে ২টি, সে পদ খালি রয়েছে, অফিস সরকারী পদ ১টি দায়িত্বে আছে ১জন, কমপাটমেন্ট পদ রয়েছে ১টি, সে পদ খালি রয়েছে, নার্স পদ ১টি, সে পদে খালি রয়েছে, অফিস সহায়ক পদ রয়েছে ৬টি আছে ২ জন, বাবুচি পদ রয়েছে ২টি আছে ১ জন, কারিগরী প্রশিক্ষক পদ ১টি দায়িত্বে আছেন ১জন, খালাম্মা পদ রয়েছে ৪টি আছেন ১জন।
এই শিশু পরিবারের অতিরিক্ত উপ-তত্ত্বাবধায়ক রুপনা চাকমা জানান, এই শিশু পরিবারে ভর্তি পদ্ধতি পিতৃহীন হতে হবে কিংবা পিতৃ-মাতৃহীন হতে হবে। বয়স ৬ থেকে ৯ বছরের মধ্যে।
শিশু পরিবারে থাকতে পারে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত কিংবা এইচএসসি পরীক্ষা পর্যন্ত। যারা ভালো রেজাল্ট করবে তারা গ্রেজুয়েশন পর্যন্ত থাকতে পারে বলে তিনি জানান।
তিনি আরো জানান, একজনের মাসিক মাথা পিছু ব্যায় ২৬০০ টাকা। যার মধ্যে খাওয়া ২০০০ টাকা, শিক্ষা সহায়ক ২৫৫ টাকা, প্রশিক্ষণ ৫০ টাকা, সাধারণ পোষাক পরিচ্ছন ১৬৫ টাকা, চিকিৎসা ৬০ টাকা, তৈল, সাবান অন্যন্যা প্রসাধনী ৭০ টাকা। তাদেরকে প্রতিদিন সরকারী নির্ধারীত ম্যানু অনুসারে খাবার পরিবেশন করা হয় বলে জানান তিনি।
উপ-তত্ত্বাবধায়ক রুপনা চাকমা আরো জানান, এই টাকা রাজস্ব বাজেট থেকে আছে। যা সমাজ কল্যাণ মন্ত্রাণালয়ধীন সমাজ সেবা অধিদপ্তর এর মাধ্যমে ব্যয় করা হয় এবং এই প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব পালন করে থাকেন। বার্ষিক আসবার পত্রের জন্যও একটি বরাদ্ধ দেওয়া হয় মন্ত্রাণালয় থেকে।
তিনি বলেন, শিশু পরিবারে একটি হলরুমের প্রয়োজন, হলরুম না থাকায় তাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠান করতে সমস্যা সৃষ্টি হয়। লোকবল সংকটের কারণে এই শিশু পরিবার পরিচালনায় আরো বেশি সমস্যা হয় বলে জানান তিনি।
এই বছর শিশু পরিবার থেকে ৮ শ্রেণীর পরীক্ষা দিবে ১৫ জন, এসএসসি দিবে ১৩জন এবং এইচএসসি দিবে ৩ জন।
শিশু পরিবারের মেয়েরা শিশু সদনের পাশে প্রাথমিক স্কুল ও ভেদভেদী পৌর উচ্চ বিদ্যালয়ে এবং রাঙামাটি সরকারী কলেজে পড়ালেখার জন্য যায়। পড়ালেখার পাশাপাশি এখানে সেলাই, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়ে থাকে। সাংস্কৃতিক ও খেলাধুলার জন্য আলাদা বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে এখানে।
শিশু সদনের থেকে ভেদভেদী সরকারী প্রাইমারি স্কুলে পড়ালেখা করে কৃরামতি ত্রিপুরা, তিনি বলেন, আমি এখানে বিগত ৪ বছর ধরে রয়েছে। আমার বাবা নেই, মা জুম চাষ করে। আমাদের বাড়ি সাজেক। আমি এখানে থেকে পড়ালেখা করি বড় হয়ে আমি একজন শিক্ষক হতে চাই এবং আমাদের সাজেক দূর্গম এলাকার ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা করাতে চাই।
ঠিক তেমনি বিলাইছড়ি পাংখোয়া পাড়া থেকে এসে এই শিশু সদন থেকে পড়ালেখা করে লানেংপ্রু পাংখোয়া, তিনি বলেন, আমাদের বাবা নেই, মা জুম চাষ করে বাড়িতে। আমরা দুই বোন, দুই জনই এই শিশু পরিবারে থাকি। আমার বোন ৭ম শ্রেণীতে পড়ে আর আমি ৪র্থ শ্রেণীতে।
অন্য একজন এই পরিবারের সদস্য লাকি প্রাপ্ত বলেন, আমি বড় হয়ে শিক্ষক হবো। আমার বাবা নেই, মা চট্টগ্রাম শহরে গারর্মেন্সে কাজ করে। তাই আমি এখানে থাকি। ৪ বছর ধরে এখানে আছি, আমার খুব ভালো লাগে এইখানের সবাইকে। সবাই আমাদেরকে আদর করে, পড়ালেখার সময় পড়তে বলে আর খেলার সময় খেলতে দেয়। এখানের সবাই আমাদের যন্ত্র নেয়।
ভেদভেদী পৌর উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর ছাত্রী শিশু পরিবারের অন্য সদস্য পিংকি চাকমা বলেন, আমি এই শিশু পরিবারে আজ ১০ বছর ধরে রয়েছে। এখানে সবাই খুবই ভালো। আমাদের প্রতি বিশেষ যন্ত্র নেয়। আমার বাড়ি বরকল উপজেলায়, বাবা নেই তাই আমি এখানে থেকে পড়ালেখা করি। এখানে আমাদের সকল সুযোগ-সুবিধা রয়েছে, তবে এখানে একজন শিক্ষক থাকলে ভালো হতো এবং পড়ালেখার জন্য আলাদা রুম’র ব্যবস্থা। তাহলে আমাদের পড়ালেখার জন্য আরো বেশি সুবিধা হতো। সরকার এই ধরণের সুযোগ করে দেওয়ায়, সরকার’র প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ধন্যাবাদ ব্যক্ত করেন এই শিশু পরিবারের সদস্য।
বম সম্প্রদায়ের একজন শিশু পরিবারের সদস্য মইনু বম বলেন, আমি এই শিশু পরিবারে থেকে পাশের উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ালেখা করি। এইবার আমি দশম শ্রেণীতে। আজ প্রায় ১০ বছর থেকে এখানে আমার বসবাস। আমাদের এখানে তেমন কোন অসুবিধা হয় না। আমরা পড়ালেখা ও খেলাধুলা সহ বিভিন্ন বিনোদন করার সুযোগ পাই। সরকার ও সমাজ কল্যাণ দরিদ্র ও অসহায় মেয়েদের পাড়ালেখা ও থাকার জন্য এমন সুন্দর ব্যবস্থা করে দেওয়ায় তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ব্যক্ত করেন তিনিও।
