দক্ষিণ চট্টগ্রামের ছাত্র রাজনীতির পোষ্টমর্টেম রিপোর্ট

0

জুবায়ের সিদ্দীকী-

এক সময়ের রাজপথ কাপানো ছাত্র নেতাকর্মীর বর্তমানে বড়ই অভাব। দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ছাত্রনেতৃত্ব উঠে না আসলে আগামীদিনের মূল রাজনীতি হাইব্রিড, ভূঁইফোড়, কালো টাকার মালিক ও ব্যবসায়ীদের হাত থেকে নামানো সম্ভব হবেনা। দেশের ছাত্রসমাজ ভুলে গেছে ডাকসু, চাকসুর নির্বাচন কবে হয়েছে। দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ছাত্রসংগঠন গুলোর ভূমিকা এখনো ফুরিয়ে যায়নি। দেশের প্রতিটা আন্দোলন সংগ্রামে তথা নির্যাতিত গণমানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে ছাত্র সমাজ অগ্রনী ভূমিকা পালন করে আসছে।

৫২ এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে প্রতিটা আন্দোলনে সংঘঠিত ছাত্রসমাজগুলো তাদের ভূমিকা না রাখতে পারলে দেশের গৌরব গাথা ইতিহাস হয়তো অন্যভাবে লেখা হতো। সেই ছাত্রসমাজের ঐতিহ্য আজ নানাবিধ কারণে প্রশ্নবিদ্ধ। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখলবাজি ছাড়াও ভাড়াটিয়া হিসেবেও বর্তমান ছাত্রসংগঠনের কতিপয় নেতাকর্মী সরাসরি জড়িত। যে দল ক্ষমতায় যায় সে দলের ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীরা এক একটা হয়ে যায় লংকার রাবণ। বর্তমানে বৃহত্তর চট্টগ্রামে ছাত্ররাজনীতি নেতৃত্বহীনতায় ভূগছে।

হত্যা, নির্যাতন, সন্ত্রাসবাদে জড়িত থেকে অনেকেই ছাত্র রাজনীতি থেকে হারিয়ে যাচ্ছে বা মামলা হামলায় জড়িয়ে ঝড়ে পড়ছে। নিজ সংগঠনের নেতাকর্মীদের অন্তর্দলীয় কোন্দলের কারণে যুগ পার হলেও ভারপ্রাপ্ত বা আহবায়কের দায়িত্ব নিজ কাঁধ থেকে নামে না। অনেক সময় তারা নিজেরাই ভার বহন করে চলে। দক্ষিণ চট্টগ্রামের বড় দুই রাজনৈতিক দল আওযামীলীগ ও বিএনপির ছাত্র সংগঠনগুলো বর্তমানে নেতৃত্বহীন। ছাত্রলীগ বর্তমানে এলাকার আধিপত্য ও টেন্ডারবাজি নিয়ে ব্যস্ত। দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের নেতাদের বর্তমানে লন্ঠন জ্বালিয়ে খুজতে হয়। এলাকায় কোন সাংগঠনিক কার্যক্রম না থাকলেও সন্ত্রাস চাঁদাবাজিতে ব্যস্ত। আর ছাত্রদল প্রতিপক্ষের মামলা হামলায় জর্জরিত হয়ে বর্তমানে এলাকা ছাড়া।

জেলা ছাত্রলীগের এক নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, গত আড়াই বছর ধরে ছাত্রলীগের কোন কমিটি নেই। ছাত্রলীগের অভিভাবক সংগঠন আওয়ামীলীগের অবিরাম চলা অন্তর্দলীয় কোন্দলে আওয়ামীলীগ দক্ষিণ চট্টগ্রামে বর্তমানে দ্বি-ত্রি ধারায় বিভক্ত যার প্রভাব ছাত্রলীগেও বিরাজমান। যার কারনে দলের চেইন অব কমান্ড ভেঙ্গে পড়েছে। কাকে রেখে কাকে দিবে নেতৃত্ব সে দোদল্যমানতায় ভ’গে কেন্দ্রীয় নেতারা। কারণ কমিটি দেবার আগে অভিভাবক সংগঠনের নেতাদের পছন্দ অপছন্দ প্রাধান্য দিতে হয়।

সূত্র জানায়, সর্বশেষ ২০১১ সালের ১৯ এপ্রিল আব্দুল মালেক জনিকে আহবায়ক এবং সালাউদ্দিন সাকিব, নূরুল আমিন , ফরহানুল আলম, আবু জাহেদ ও মহিউদ্দিন মাহিকে যুগ্ম-আহবায়ক করে একটি আহবায়ক কমিটি দেয় কেন্দ্রীয় কমিটি। ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্র মোতাবেক আহবায়ক কমিটি গঠনের ৩মাসের মধ্যে পূর্নাঙ্গ কমিটি গঠনের নির্দেশনা থাকলেও আহবায়ক কমিটি তা করতে ব্যর্থ হয়।

নির্ধরিত সময়ে জেলা বা উপজেলা কমিটির সম্মেলন করতে না পারা এবং বিভিন্ন সন্ত্রাস চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিতে জড়িয়ে পড়া এবং দীর্ঘদিন ধরে ছাত্ররাজনীতির সাথে জড়িত থেকেও পদবঞ্চিত থাকায় আহবায়ক কমিটির সাথেও দ্বন্ধে জড়িয়ে পড়ে অনেকে। ৬ সদস্যে আহবায়ক কমিটিতেও শুরু হয় গ্রুপিং কোন্দল। সেই অন্তর্দলীয় কোন্দলের বলি হয় আহবায়ক আব্দুল মালেক জনি। ২০১২ সালের ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কর্মসূচী পালন কালে নগরীর আন্দরকিল্লাস্থ জেলা কার্যালয়ে প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর অনুষ্ঠানে প্রতিপক্ষের হামলায় আব্দুল মালেক জনি গুরুতর আহত হন। এর চার দিন পর জনি মারা যান।

পরে জনি হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি তিন যুগ্ম-আহবায়ক ফরহাদুল আলম, আবু জাহেদ ও মহিউদ্দিন মাহিকে সংগঠন থেকে বহিস্কার করে সালাউদ্দিন সাকিব কে ভারপ্রাপ্ত আহবয়ক এবং নূরুল আমিন কে যুগ্ম-আহবায়কের দায়িত্ব দেন।

দলীয় সূত্র জানায়, ২০১৪ সালে অন্তর্দলীয় কোন্দলের আর এক বলি হন আর এক ছাত্রলীগ নেতা তৌকির ইসলাম। তার বাড়ী লোহগাড়া উপজেলায়। ২০১৪ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সমাবেশ থেকে ট্রেনে করে ফেরার পথে কোন্দলের জের ধরে তৌকির কে চলন্ত ট্রেন থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় আরো বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী গুরুতর আহত হয়।

ঘটনার পরদিন ১ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় কমিটি দক্ষিণ জেলার অবশিষ্ট্য আহবায়ক কমিটিও বিলুপ্ত ঘোষনা করেন। এর পর থেকে গত দুই বছর ধরে নেতৃত্বহীন হয়ে পড়েছে দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগ। নতুন কমিটি ঘোষিত হবে নাকি সম্মেলন হবে একথা কেউ বলতে পারছেন না। দীর্ঘদিন ধরে দলের ত্যাগী নেতারা একপ্রকার হতাশায় ভূগছেন।

কারণ কমিটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ন পদে যোগ্যতা থাকা সত্বেও কমিটির ধারাবহিকতা না থাকায় ছিটকে পড়বেন তারা। কেন্দ্রীয় কমিটি ২/১ মাসের মধ্যে কমিটি হবে বলে বলা হলেও তার কোন কার্যক্রম চোখে পড়ছে না। জেলার যুবলীগের মধ্যে ও রয়েছে চরম অসন্তোষ। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ভূঁইফোড় হাইব্রিড চিহ্নিত ইয়াবা ব্যবসায়ীদের দেয়া হয়েছে সাধারণ সম্পাদকের মত গুরুত্বপূর্ন দায়িত্ব। ফলে দীর্ঘ দিনের ত্যাগী নেতারা পদ বঞ্চিত হয়ে ফুঁসে উঠছেন।

অন্যদিকে একই অবস্থা বিএনপির অঙ্গসংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলেও। দেশের রাজনীতির মাঠের প্রধান বিরোধী দল বিএনপির কোন্দলের কারনে চট্টগ্রাম দক্ষিণজেলা ছাত্রদলের কমিটি হচ্ছেনা । জানা গেছে, কেন্দ্রীয় ছাত্রদল ২০১১ সালের ২০ ফেব্রয়ারী চন্দনাইশ উপজেলার জসিম উদ্দিনকে আহবায়ক ও বাঁশখালী উপজেলার শহীদুল ইসলামকে সিনিয়র যুগ্ম-আহবায়ক করে ১৩ সদস্য বিশিষ্ট একটি আহবায়ক কমিটি ঘোষনা করে।

ওই কমিটিতে রাখা হয় বাঁশখালীর মো.শাহনেওয়াজ, পটিয়ার বখতেয়ার উদ্দিন, ফজলুল কাদের, জমির উদ্দিন, আনোয়ারার লোকমান শাহ্, চন্দনাইশের সাইফুল ইসলাম, বোয়ালখালীর মোহাম্মদ আজগর, মোহাম্মদ আলী, সাতকানিয়ার এহতেশামুল আজিম, লোহাগাড়ার ফৌজুল কবির ও কর্ণফুলী থানার ছালেহ জহুরকে যুগ্ম-আহবায়ক করা হয়। ছাত্রদল কেন্দ্রীয় কমিটি একই বছর ডিসেম্বরে আহবায়ক কমিটির সাথে যুক্ত করে ১৫১ সদস্য বিশিষ্ট আহবায়ক কমিটি ঘোষনা দেন।

দলীয় সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা উপদলীয় কোন্দল নিরসনের জন্য আহবায়ক কমিটির সাথে আরো ১৩৮ জন যোগ করে আহবায়ক কমিটির নাম ঘোষনা করে কোন্দল নিরসনের চেষ্টা করে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল। কিন্তু সে কোন্দল নিরসনতো হয়নিই আরো বেড়েছে। সে কোন্দলে যোগ দিয়েছেন অভিভাবক সংগঠন বিএনপির নেতারা। এতে করে গ্রুপিং কোন্দলের প্রভাব আরো বেড়ে যায়।

পরে এ কোন্দল সামাল দিতে দলীয় গঠনতন্ত্রকে পেছনে ফেলে ২০১২ সালের ৭ ফেব্রুয়ারী পুর্বের ১৫১ সদস্যের আহবায়ক কমিটির সাথে আরো ৫৪ জন যোগ করে ২০৫ সদস্য বিশিষ্ট মাথাভারী একটা কমিটি তৈরী করে কেন্দ্রীয় কমিটি। এ কমিটি চলে প্রায় সাড়ে ৫ বছর। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যেও জেলা সম্মেলন করতে না পারা বা কমিটি ঘোষনা করতে ব্যর্থতার অভিযোগে গত ২৩ জুন ২০৫ সগস্য বিশিষ্ট কমিটি বিলূপ্ত ঘোষনা করে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল। এরপর থেকে আর কোন কমিটি দেয়া হয়নি। সেই থেকে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রদলেও নেতৃত্বশুন্যতা বিরাজ করছে।

চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রদলের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ প্রতিবেদককে বলেন, বর্তমানে জেলা বিএনপিতে যেমন গ্রুপিং কোন্দল চলছে অনুরূপ জেলা ছাত্রদলেও বিভিন্ন কোন্দল গ্রুপিং চলছে। বিএনপির নেতাদের পছন্দসই না হওয়াতে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি বার বার চেষ্টা করেও কোন কমিটি ঘোষনা দিতে পারছেন না। বিএনপির বহমাত্রিক কোন্দল গ্রুপিং এর জের ধরে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রদলের কমিটি দিতে বার বার পিছু হাঁটছে কেন্দ্রীয় কমিটি। তবে ঐ নেতা জানান, খুব শিগ্গির চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রদলের কমিটি আসছে।

পাদটীকা : 
চট্টগ্রামের চাঞ্চল্যকর কমোডর রব্বানী হত্যা মামলার আসামী সাইফুল ইসলাম ওরফে বিলাই সাইফুলকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। গত সোমবার চট্টগ্রাম বিভাগীয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল জজ এম মুহিতুল হক এনাম চৌধুরীর আদালতে জামিনের আবেদন জানান। শুনানিশেষে আদালত সাইফুলকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এর আগে ট্রাইব্যুনালের রায়ে খালাস পাওয়া অভিযুক্ত সাইফুলের নতুন করে বিচার কার্যক্রমের আদেশ দেন উচ্চ আদালত। ফলে রায়ের ১১ বছর পর মামলাটি আবারো সচল হয়েছে। উল্লেখ্য,২০০৫ সালে কমোডর রব্বানী হত্যা করা হয়।

এ বিভাগের আরও খবর
আপনার মতামত লিখুন :

Your email address will not be published.