সুন্দরবনে অন্যরকম একদিন

0

পর্যটন ও পরিবেশ : কথায় আছে, মানুষ সুন্দরের পুজারী, সৃষ্টি সুন্দরের অন্বেষনে মানুষ খুঁজে ফিরে এধার থেকে ওধার। এমন একটি নজর কাড়া সুন্দর স্থানের নাম সুন্দরবন। তাহলে আর নতুন করে বলার প্রয়োজন থাকে না কতটা সুন্দর ঐ বনটি।

গত মাসের মাঝা-মাঝি সময় যাত্রা শুরু করি সুন্দরবনে। তখন মনেহয় সকাল প্রায় ৭টা। মংলা পৌছে ৪৮০ টাকায় ঠিক করা হলো একটি ইঞ্জিন চালিত নৌকা। অজস্র ঢেউ ভেঙ্গে বাসযোগ্য এলাকাকে পিছনে ফেলে গহীন পানিতে নোঙ্গর করা বড় বড় জাহাজ দেখতে দেখতে প্রায় ৪০ মিনিট পর পৌছে গেলাম নয়নাভিরাম দৃষ্টিনন্দন করমজল ফরেষ্ট রেঞ্জে।

চোখ জুড়ানো সবুজ গাছের সমাহার চোখের সামনে এঁকে দিলো নতুন এক পৃথিবী। আজ বাংলাদেশের একমাত্র সরকারী কুমির প্রজনন কেন্দ্রটি শেষ সিড়ি ভেঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে ধ্বংশের দারপ্রান্তে। চাহিদার তুলনায় প্রাপ্তির অপ্রতুলতায় অনাহারে থাকা কুমিরগুলো যে কোন সময় প্রজনন কেন্দ্রের মানুষ খেতে আক্রমন করতে পারে। এক সময় খাবারের অভাবে কুমির মানুষ খাওয়ার জন্য আক্রমন করতেই পারে।

এখানে বন্য প্রানী হাসপাতালও আছে। ১২৫টি ফরেষ্ট অফিসের অধীন জব্দকৃত অসুস্থ বন্য প্রাণীর চিকিৎসা দেওয়া হয় এখানে। কিন্তু নেই পর্যাপ্ত ঔষুধ সরবরাহ। পৃথিবীর মোট ২৬ প্রজাতীর কুমিরের মধ্যে বাংলাদেশে ৩ প্রজাতীর কুমির ছিল। ২টি প্রজাতী বিলুপ্ত হয়ে বর্তমানে বাংলাদেশে কেবলমাত্র বিলুপ্ত প্রায় ১টি প্রজাতী সল্ট ওয়াটার ক্রোকোডাইল পাওয়া যায়। এ পর্যন্ত এই বন্য প্রানী হাসপাতালে ১২৯টি হরিণ, ৫৩টি বানর, ১২টি মেছো বাঘ, ৮টি সাপ ও ৬টি বিভিন্ন প্রজাতীর পাখি চিকিৎসা শেষে সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হইয়াছে। সাপ নিয়ে তার গবেষণার ফলাফল আমাদের ধারনাকে পাল্টে দেয়। ৩ প্রজাতির কোবরা সহ ৩০ প্রজাতির সাপ আছে সুন্দরবনে। সুন্দরবনের সাপ মানুষকে কখনো প্রতিপক্ষ মনে করে না। তাই সুন্দরবনের সাপ মানুষকে দংশন করে না। গ্রামে গঞ্জে যেসব সাপ মানুষকে প্রতিপক্ষ হিসাবে চিনে সেসব সাপই কেবলমাত্র মানুষকে দংশন করে।

আমরা একজন বনরক্ষী সাথে নিয়ে প্রবেশ করলাম বন এলাকায়। সুন্দরী, কেওয়া, জারুল, ধুন্দল সহ নাম না জানা অসংখ্য গাছের সমরোহ মাঝে কাঁঠ দিয়ে নির্মিত প্রায় ১ কিঃমিঃ পুলের উপর দিযে হেটে হেটে বনের ভিতর যাওয়ার পর পুল শেষ হয়ে যায়। এরপর পায়ে চলা আঁকা-বাঁকা মেঠো পথ। পথের দু’পার্শ্বে বড় বড় গাছে বানরের লাফা-লাফি আর ভেংচি কাটা উপভোগ করতে করতে অনেকটা পথ বনের গহীনে চলে এসেছি কথাটা ভুলে গেলে বনরক্ষী স্মরন করিয়ে দিলেন নরম মাটিতে বাঘের পায়ের ছাপ দেখিয়ে। বেশ কিছু পায়ের ছাপ দেখে বাঘের পদচারনা অনুভব করলাম সেখানে।

বিভিন্ন রংয়ের পাতায় মোড়ানো বৃক্ষরাজি আর তৃণলতা সোভিত গহীন অরণ্য মাঝে বনরক্ষীদের নির্মিত একটা কাঠের চৌকি (পাহারা দেওয়ার ঘর) পেয়ে ক্লান্ত শরীরে কিছুটা বিশ্রাম নেওয়ার উদ্দেশ্যে বসলাম। গোলাকৃতি ঘরের উপরে গোলপাতার ছাউনি। পাশ দিয়ে ছোট্ট একটি নালা দিয়ে জোয়ারের পানি কুল-কুল শব্দে গড়িয়ে যাচ্ছিল। তখন সবে দুপুর ২টা। বাহারী নাম না জানা পাখির কলরব ছন্দ আর মৃদু শীতল হাওয়ায় ক্লান্ত শরীর যেন নিস্তেজ হয়ে পড়ছিল।

এবার অন্য পথে বনের মধ্যে দিয়ে হেটে হেটে পৌছে গেলাম করমজল ফরেষ্ট রেঞ্জের ক্যান্টিনের কাছে। এখানে কাঠের পুলের উপর অনেক দেশী বিদেশী পর্যটকের ভিড় দেখে এগিয়ে গিয়ে দেখি বন্য হরিণের একটি দল দর্শনার্থীদের হাত থেকে চিপস্ নিযে খাচ্ছে। এমন সুযোগ আর ভ্রমনের অভিজ্ঞাতা আমাকে অন্যরকম স্মৃতী দিয়ে গেল।

এ বিভাগের আরও খবর
আপনার মতামত লিখুন :

Your email address will not be published.