শহিদুল ইসলাম,উখিয়া(কক্সবাজার)::মিয়ানমারের রাখাইনের বিভিন্ন রোহিঙ্গা মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় স¤প্রতি বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া মোটামুটি পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসছে বলে মিয়ানমার থেকে প্রাপ্ত খবরে জানা যায়।
গত মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ কিছুটা কমে আসলেও চলতি মাসে স্থানীয় এপার ওপারের দালালদের তৎপরতায় রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে সীমান্ত এলাকার বসবাসকারী লোকজন জানিয়েছেন।
উখিয়ার রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা রোহিঙ্গাদের এপারে আনার কাজে জড়িত রয়েছে। রোহিঙ্গারা কক্সবাজার টেকনাফ সড়কের উভয় পাশে বসে থাকতে দেখা যাচ্ছে। তাবলীগ জামায়াতের আড়ালেও ত্রান সামগ্রী বিতরন করা হচ্ছে বলে নতুন আসা রোহিঙ্গারা জানিয়েছেন।
স্থানীয় বন বিভাগ অভিযান চালিয়ে ২ দফায় শতাধিক ঝুপড়ি ঘর ভেঙ্গে দেওয়ার পর আবারও স্থানীয় প্রভাবশালীর সহযোগীতায় পুণরায় ঐ ঝুপড়িগুলো নির্মাণ করতে দেখা গেছে। মিয়ানমারের নোয়া পাড়া থেকে আসা আবদুর রহিম (৫২) বলেন, স্থানীয় জাহাঙ্গীরের কাছ থেকে ১০ হাত জায়গা নিয়েছি। তার বিনিময়ে ২ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। তবে এনজিও সংস্থা কর্তৃক ২৫ কেজি চাল পেয়েছি। আমার সাথে আরো ১০ পরিবার এদেশে চলে আসেন। মিয়ানমারের সহিংস ঘটনায় এদেশে পালিয়ে আসেন ৬৫ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা মুসলিম নাগরিক।
গত বৃহস্পতিবার ও শূক্রবার দুপুরে ২ দিন ব্যাপী সরেজমিন পরিদর্শন করে উখিয়ার কুতুপালং ও বালুখালীতে নতুন গড়ে উঠা রোহিঙ্গা বস্তির লোক জনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, মিয়ানমারের রাখাইনের মংডুতে সেনা নির্যাতনের এ দুরাবস্থার মধ্যে বাংলাদেশে এ ধরনের নগদ লিল¬াহ পাওয়ার আশারও অনেকে চলে আসছে। বর্তমানে আরাকানের হত দরিদ্র রোহিঙ্গাদের খুবই দৈন্য দশায় দিন কাটাতে হচ্ছে। তাই তো আর্থিক কষ্ট ও খাদ্য সংকট লাগবে তাদের পরিবারের আংশিক অনুপ্রবেশ করে চলে আসছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
খবর নিয়ে জানা গেছে, সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের অধিকাংশের পরিবারের একাংশ মিয়ানমার নিজ গ্রামে থেকে গেছে। রাজাপালং ইউনিয়নের স্থানীয় কুতুপালং ওয়ার্ড মেম্বার বখতিয়ার আহমদ সহ অনেক গ্রাম বাসী জানালেন ক্ষোভের কথা। তারা জানান মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের উপর জুলুম নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে কিছু কিছু এলাকায়। কিন্তু ইদানিং পুরো আরাকান থেকে যে ভাবে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঘটছে তা খুবই উদ্বেগ জনক। নির্যাতনের অজুহাত তোলে এরা বাংলাদেশে বিভিন্ন সাহায্য সহযোগীতার আশায় আসছে।
কুতুপালং রোহিঙ্গা বস্তি পরিচালনা কমিটির সভাপতি আবু সিদ্দিক জানান, কুতুপালংএ অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের আনাগোনা অনেকটা কমেছে। তবে বালুখালীতে নতুন গড়ে উঠা রোহিঙ্গা বস্তি চাঙ্গা করতে সীমান্ত এলাকার কিছু প্রভাবশালী লোক দালালের মাধ্যমে সীমান্তবর্তী গ্রাম গুলো থেকে ব্যাপক হারে রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশ ঘটাচ্ছে। বিগত ৪দিনে সেখানে ২৫০ পরিবারের প্রায় হাজার খানেক রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশ ঘটেছে বলে তিনি জানান। বালুখালীর নতুন রোহিঙ্গা বস্তির মাঝি খলিলুর রহমানসহ কয়েকজন জানালো এখানে আসার পর থেকে প্রতিদিন স্থানীয় জনৈক ২/৩জন প্রভাবশালীর নেতৃত্বে চাল, ডাল, তেল, শীতের কম্বল ও অন্যান্য সাহায্য সহযোগীতা পেয়ে আসছি।
কুতুপালং শরনার্থী ও সংলগ্ন বস্তিতে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের নজরদারি দায়িত্বে নিয়োজিত একাধিক নির্ভরযোগ্য সংস্থার মতে, নির্যাতনের অজুহাতে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের নিয়ে আরএসও, এআরআইএফ, এআরএনও সহ বেশ কয়েকটি রোহিঙ্গা বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন এখানে তৎপরতা চালাচ্ছে। তাদের সাথে আন্তঃ সংযোগকারী বাংলাদেশী কিছু উগ্র সংগঠনও রয়েছে বলে জানা গেছে।
পূর্ব থেকে কুতুপালং এ অবস্থানকারী আরএসওর সাবেক সামরিক ট্রেইনার ডাক্তার জয়নাল প্রকাশ ফায়সাল আনোয়ার, মৌলভী আবদুস সালাম, ডাক্তার লালু, হাফেজ নাইম, হাফেজ জালাল আহমদ সহ রোহিঙ্গা বিচ্ছিন্নতাবাদীরা বিভিন্ন ভাবে রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন দুর্দশার চিত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার চালিয়ে বিভিন্ন এনজিও, আইএনজিও এর মাধ্যমে নগদ অর্থ, ত্রাণ সহায়তা পাওয়ার ব্যবস্থা করছে। এতে মিয়ানমার থেকে আরো ব্যাপক হারে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঘটানোর ষড়যন্ত্র করছে।
এসব ব্যাপারে কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও তারা আইনের আওতায় না আসায় পরিস্থিতি অন্য রকম হওয়ার আশংকা তাদের। উক্ত অভিযোগের সাথে স্থানীয় সচেতন লোকজন ও অধিকাংশ নিরহ রোহিঙ্গা নেতারা একমত পোষন করে এসব বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া দাবি জানান। গতকাল মঙ্গলবার জাতি সংঘের বরাত দিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম জানিয়েছে মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গা মুসলিমদের অনুপ্রবেশের সংখ্যা হঠাৎ করে তীব্র আকারে বৃদ্ধি পেয়েছে। জাতিসংঘ বলেছে শুধু মাত্র গত সপ্তাহে ২২ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশের সীমান্ত অতিক্রম করে অনুপ্রবেশ করেছে। যার ফলে রাখাইন রাজ্যের সা¤প্রতিক সহিংসতায় বাংলাদেশে মোট রোহিঙ্গা মুসলিমের প্রবেশের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৫ হাজারের বেশি। রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ও তাদের বিচ্ছিন ভাবে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ প্রতিরোধ ও প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটির আহবায়ক অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী সহ সচেতন মহল উদ্বেগ প্রকাশ করে দালালসহ সংশি¬ষ্টদের কঠোর ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না হলে পরিস্থি দ্রুত অবনতির দিকে ধাবিত হওয়ার আশংকা রয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকতা মোঃ মাঈন উদ্দিন বলেন, রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে।
