নিজস্ব সংবাদদাতা : চন্দনাইশ উপজেলা আ’লীগে দ্বিধাবিভক্তি ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া প্রকাশ্যে রূপ নিয়েছে ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে। সভাপতি, সম্পাদক পৃথক আলোচনা সভা ও শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে দেখা গেছে। গত ২৫ মার্চ উপজেলা আ’লীগের সভাপতির নেতৃত্বে থানার সম্মুখে পৌর আ’লীগের অস্থায়ী কার্যালয়ে ২৫ মার্চের গণহত্যা দিবসের আলোচনা সভা সভাপতি জাহিদুল ইসলাম জাহাঙ্গীরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। সে আলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলেন না স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ব নজরুল ইসলাম চৌধুরী ও উপজেলা আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদ মেম্বার আবু আহমদ জুনু। একইভাবে গত ২৬ মার্চ সকালে চন্দনাইশ সদরে উপজেলা আ’লীগের ব্যানারে স্বাধীনতা দিবসের আলোচনা সভায় সন্নিকটে বাড়ীতে থেকেও উপস্থিত হননি উপজেলা আ’লীগের সভাপতি জাহিদুল ইসলাম জাহাঙ্গীর। সভায় সভাপতিত্ব করেন সি. সহ-সভাপতি আবুল বশর ভুইয়া।
উক্ত আলোচনা সভায় স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ব নজরুল ইসলাম চৌধুরী, উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল জব্বার চৌধুরী, উপজেলা আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু আহমদ জুনুসহ বেশকিছু সিনিয়র নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। আলোচনা সভা শেষে উপজেলা আ’লীগের পক্ষ থেকে এ সকল নেতৃবৃন্দদের নিয়ে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। ঘন্টাখানিক পর উপজেলা আ’লীগের সভাপতি জাহিদুল ইসলাম জাহাঙ্গীরের নেতৃত্বে পুনরায় শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। শুধু তাই নয় উপজেলা আ’লীগের সভাপতি উপজেলা প্রশাসনের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে দেখা যায়নি।
এ নিয়ে আ’লীগের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাদের মধ্যে ক্ষোভ ও দ্বিধাবিভক্তি সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন সিনিয়র নেতৃবৃন্দ। ২০১৩ সালের ৬ ও ৭ জুলাই সম্মেলনের মাধ্যমে কাউন্সিলরদের প্রত্যক্ষ ভোটে জাহিদুল ইসলাম জাহাঙ্গীর এবং আবু আহমদ জুনু সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। দীর্ঘদিন সাংগঠনিক কার্যক্রম সুচারুরূপে চলার পর মাঝপথে গত বছর ২৪ নভেম্বর এলডিপি থেকে বহিস্কৃত উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল জব্বার চৌধুরী আ’লীগে যোগদানকে কেন্দ্র করে দলের মধ্যে কিছুটা বিভক্তি পরিলক্ষিত হয়। দীর্ঘ ৪ মাস পর সে বিভক্তির প্রকাশ ঘটে ২৬ মার্চে।
এ ব্যাপারে স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ব নজরুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, চন্দনাইশ আ’লীগে কোনো গ্রুপিং কোন্দল নেই । শুধু একজন দলে সমস্যা সৃষ্ঠি করছে । তিনি একাধিকবার উপজেলা আ’লীগের সভাপতিকে টেলিফোন করলেও তিনি সভা-সমাবেশে আসেন নি। শুধু তাই নয় তিনি উপজেলা আ’লীগ নেতৃবৃন্দের সাথে শহীদ মিনারে ফুল না দিয়ে কোন আ’লীগ নেতৃবৃন্দ ছাড়াই গুটি কয়েকজন নিয়ে শহীদ মিনারে ফুল দিয়েছে। তার সাথে আ’লীগের তেমন কেউ ছিল না। তিনি অন্য কারো এজেন্ডা বাস্তবায়ন করার জন্য এ ধরনের কর্মকান্ড করে যাচ্ছেন বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন। তাছাড়া সভাপতি অনুষ্ঠানে আসলে সাংগঠনিক বিষয়গুলো সমাধান করবেন বলে জানিয়েছেন। তবুও তিনি সভা-সমাবেশে আসেন নি।
দক্ষিণ জেলা আ’লীগের সহ-সভাপতি চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান বলেছেন, দলীয় শৃংঙ্খলা ভঙ্গ করে দলের উন্নতি করা সম্ভব না, এখন যে কাজগুলো হচ্ছে তা আ’লীগের জন্য কোনভাবেই সমীচীন নয়। যে সকল নেতা-কর্মীরা মাঠের রাজপথে রয়েছে তাদের মূল্যায়ন করতে হবে। নেতা-কর্মীদেরকে ব্যক্তিগত স্বার্থ পরিহার করে স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়ার উপর গুরুত্বারোপ করেন। সে সাথে দলীয় শৃঙ্খলা মেনে সাংগঠনিকভাবে আ’লীগকে এগিয়ে না নিলে আ’লীগের পরিস্থিতি মাঠ পর্যায়ে স্বচ্ছ থাকবে না বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন। সে সাথে কিছু মানুষ সম্প্রতি চন্দনাইশে ফসলি জমির টপসয়েল কেটে ধ্বংস করছে, গরু চুরি বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ব্যাপারে সাংগঠনিকভাবে প্রশাসনকে সহযোগিতা প্রদানের উপর গুরুত্বারোপ করেছেন তিনি।
উপজেলা আ’লীগের সভাপতি জাহিদুল ইসলাম জাহাঙ্গীর বলেছেন, কেন্দ্রের কোন অনুমতি ছাড়া গঠনতন্ত্র বহির্ভুতভাবে যোগদানকারী এলডিপি থেকে বহিস্কৃত নেতা ২০০১ সালে ২ হাজার আসামী করা মামলার অন্যতম হোতা, আ’লীগের নেতা-কর্মীদের জেল-জুলুমের প্রধান কর্তা, দোহাজারী যুবলীগ নেতা রমিজ হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামী, মহানগর এলডিপি অফিসে বিস্ফোরক দ্রব্য মামলার চার্জভুক্ত আসামী আবদুল জব্বার চৌধুরীকে আ’লীগের সাংগঠনিক কাঠামো উপেক্ষা করে সভায় বিশেষ অতিথি করায় তিনি অনুষ্ঠানে যাননি বলে জানান।

জাহাঙ্গীর আরও বলেন, জব্বার চৌধুরীকে আ’লীগের কোন অনুষ্ঠানে অতিথি করার ব্যাপারে সাংগঠনিক কাঠামো মানার জন্য তিনি সংসদ সদস্যকে একাধিকবার বলেও এর সুরাহা না হওয়ায় তিনি সমাবেশে যান নাই। তাছাড়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় সংসদ সদস্য, সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা চেয়ারম্যানের ছবি দিলেও সভাপতির ছবি না দিয়ে বিভিন্ন এলাকায় পোস্টার, ব্যানার তুলার ব্যাপারে তিনি সংসদ সদস্যকে বলার পরও তিনি কোন রকম পদক্ষেপ গ্রহণ করেন নি। সামগ্রিকভাবে চন্দনাইশে দক্ষিণ জেলা আ’লীগের সহ-সভাপতি চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান, তিনি নিজেই এবং সাধারণ সম্পাদক আবু জুনু সহ যারা আ’লীগের দায়িত্বে রয়েছেন তাদেরকে যথাস্থানে উপস্থাপন করতে না করায় ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন। তাছাড়া জব্বার চৌধুরী যোগদানের ব্যাপারে দক্ষিণ জেলা আ’লীগের সাথে সংশ্লিষ্টতা ও কেন্দ্রীয় আ’লীগ নেতৃবৃন্দের অনুমতি ব্যতিরেকে এ যোগদান যথাযথ হয়নি বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।
অপরদিকে উপজেলা আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু আহমদ জুনু বলেছেন, উপজেলা চেয়ারম্যান এবং তিনি ইতিমধ্যে আ’লীগে যোগদান করায় আ’লীগের অনুষ্ঠানে স্থান পেতে পারেন। যারা আ’লীগের ক্ষতি করার জন্য বিভিন্ন জায়গায় দক্ষিণ জেলার নাম বিক্রি করে সভা করে সংবাদপত্রে দ্বিধাবিভক্তির কথা আসে, এটি আ’লীগের জন্য কোন সময় শুভ নয়। তাছাড়া এসব কাজ করছে তারা আ’লীগের শুভাকাঙ্কী নয়, আ’লীগের ক্ষতি করতে চাচ্ছে। এ ব্যাপারে নেতা-কর্মীদের সজাগ থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবসের আলোচনা সভা করে ফেইসবুকে স্ট্যাটাচ দেয়া হচ্ছে। এ ধরনের রাজনীতি আ’লীগের জন্য পজেটিভ নয়।এ ধরনের কর্মকান্ড পরিহার করে আ’লীগের ব্যানারে সংঘবদ্ধভাবে অনুষ্ঠান করার আহ্বান জানান।
উপজেলা আ’লীগের সি. সহ-সভাপতি আবুল বশর ভুইয়া বলেছেন, তিনি সমাবেশে সভাপতিত্ব করার ব্যাপারে স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ব নজরুল ইসলাম চৌধুরীর সাথে কথা বলেছেন। এ সকল অবসানের জন্য প্রয়োজনে সবাইকে সাংগঠনিকভাবে বসে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য বলেছেন এবং তিনি শীঘ্রই এ বিষয়ে সাংগঠনিকভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ করে স্থানীয় সংসদ সদস্যের সাথে সাংগঠনিকভাবে ব্যবস্থা নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বলে জানান।
উপজেলা আ’লীগের সহ-সভাপতি এড. আবদুল হান্নান বলেছেন, চন্দনাইশ আ’লীগে এখন যা হচ্ছে তা অত্যন্ত দুঃখজনক। সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার কোন বিকল্প নেই এবং এটা অবসান হওয়া খুব জরুরী বলে তিনি মন্তব্য করেন।
পৌর আ’লীগের আহ্বায়ক কায়সার উদ্দিন চৌধুরী বলেছেন, কিছু রাজনৈতিক ভুলের কারণে রমিজ হত্যা মামলার আসামী, সরকার উৎখাত তথা বিস্ফোরক দ্রব্য মামলার চার্জশীটভুক্ত আসামী অনিয়মতান্ত্রিকভাবে যোগদানের কারণে সংগঠনে কিছুটা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে। এরা দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। তারা আ’লীগের কেউ না হয়েও আ’লীগের সিনিয়র নেতৃবৃন্দের উপরে নাম দিয়ে প্রকৃত আ’লীগের নেতা-কর্মীদের অসম্মান করা হচ্ছে বলে তিনি দাবী করেন। তিনি বলেন, যারা গাছ চুরি, গরু চুরি, জমি দখল নিয়ে ব্যস্ত আছে, আমাদের অবস্থান তাদের বিরুদ্ধে। এ ব্যাপারে তিনি দক্ষিণ জেলা নেতৃবৃন্দের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
উপজেলা আ’লীগের যুগ্ম সম্পাদক মাহবুর রহমান চৌধুরী বলেছেন, অতীতে যারা আ’লীগের নেতা-কর্মীদের মামলা দিয়ে হয়রানি করেছে এ সকল হাইব্রীড নেতারা আ’লীগে ঢুকে সংগঠনকে ধ্বংস করার চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছে। এ ব্যাপারে তিনি জেলা নেতৃবৃন্দের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। অন্যথায় দলের আরও বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে বলে তিনি মত ব্যক্ত করেন।
উপজেলা আ’লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বাবর আলী ইনু বলেছেন, এ ধরনের কাজের অবসান হওয়া উচিত। ঐক্যের কোন বিকল্প নেই। বর্তমান সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডগুলো সাধারণ মানুষের কাছে পৌছে দিয়ে আগামী নির্বাচনে নৌকার বিজয়কে নিশ্চিত করার জন্য গুরুত্বারোপ করেন। সে সাথে স্থানীয় সংসদ সদস্য, উপজেলা আ’লীগের সভাপতিকে দলের স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হয়ে মাঠ গুছানো দরকার বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।
দক্ষিণ জেলা আ’লীগের সভাপতি মোসলেম উদ্দিন আহমদ বলেছেন, তিনি এ সম্পর্কে কিছুই জানেন না। চন্দনাইশ আ’লীগে বর্তমানে কার্যকরী কমিটির অনেক সদস্যই এ সকল কারণে নিষ্ক্রীয় হয়ে পড়েছেন বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন সিনিয়র নেতৃবৃন্দ। এ ব্যাপারে তারা প্রয়োজনে জেলা নেতৃবৃন্দের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। সে সাথে এ সকল দ্বিধাবিভক্তি নিষ্পত্তির মাধ্যমে সংগঠনকে এগিয়ে নিয়ে গিয়ে আগামী নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীকে জয়ী করার জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার গুরুত্বারোপ করেছেন।
