আইনজীবীদের আবাসন সংকটে সরকারের কার্যকর ব্যবস্থা চাই

0

এড. সালহ্উদ্দিন আহমদ চৌধুরী লিপু- 

১৭৬১ ইংরেজী সালে চট্টগ্রামের মাদ্রাসা পাহাড়ের শীর্ষে সর্বপ্রথম প্রতিষ্ঠা লাভ করে চট্টগ্রাম আদালত ভবন। এতে স্থান সংকুলানের অভাবে বিচারকার্য সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার নিমিত্তে ১৮৮৯ ইংরেজী সালে বৃটিশ সরকার তৎকালীন জমিদার অখিল চন্দ্র সেনের ব্যক্তিগত মালিকনাধীন সম্পত্তি “ফেয়ারী হিল” বা “পরীর পাহাড়” অধিগ্রহণ করে ১৮৯২-৯৪ ইংরেজী সালে তথায় পাহাড়ের চূড়ায় ৫,৬৫,৩৭২ টাকা ব্যয়ে মোগল ও ইংরেজ স্থাপত্যশৈলীতে কোলকাতা রাইটার্স বিল্ডিং এর আদলে নান্দনিক, সুরম্য ও সুদৃশ্য দ্বিতল ভবন নির্মাণ করে। এ আদালত ভবন এতদাঞ্চলে অদ্বিতীয়।

আদালত ভবন বাংলাদেশের একটি ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান। আদালত ভবনের পূর্বপ্রান্তে বাংলাদেশ ব্যাংক সংলগ্ন সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতি ভবন। দীর্ঘ পরিক্রমায় বিচিত্র ও বর্ণাঢ়্য স্মৃতিসম্ভারে সমৃদ্ধ ঐতিহাসিক চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতি আজ গৌরবান্বিত। বাংলাদেশের সমৃদ্ধশালী ও প্রাচীনতম দ্বিতীয় বৃহত্তম বার ঐতিহ্যবাহী চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতি।

তথ্য মতে, মাত্র সতের জন বিজ্ঞ আইনজীবী ১৮৯৩ ইংরেজী সালের ২৩ মার্চ প্রীতি ও প্রেমের পূণ্য বাঁধনে সহযোগি আইনজীবীদের এক গৌরবময় ভ্রাতৃত্ব ও সোহার্দ্য গড়ে তোলার লক্ষ্যে সর্বপ্রথম ‘চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতি’ গঠন করেন। সতের উজ্জ্বল নক্ষত্র হলেন যথাক্রমে ১. এড. দুর্গাদাস (প্রাঃ জিপি), ২. এড. প্রাণহরি লালা (প্রাঃ জিপি), ৩. এড. কমলা কান্ত সেন, ৪. এড. জগৎ চন্দ্র রক্ষিত (অনারারি ম্যাজিস্ট্রেট), ৫. এড. মহিম চন্দ্র গুহ, ৬. এড. রমেশ চন্দ্র সেন রায়,৭.এড. রমেশ চন্দ্র সেন, ৮. এড. রামেন্দ্র সেন (প্রাঃ মুন্সেফ), ৯. এড. মহেন্দ্র লাল দাশ,১০.এড. ক্ষিরোদ চন্দ্র দাশ, ১১. এড. সতীশ চন্দ্র সেন (প্রাঃ জিপি), ১২. এড. চৈতন্য চরণ দত্ত, ১৩. এড. যাত্রা মোহন সেন, ১৪. এড. নগেন্দ্র লাল রায়, ১৫. এড. নবীন চন্দ্র দাশ, ১৬. এড. প্রসন্ন কুমার দাশ, ১৭. এড. মৌলভী রেয়াজউদ্দিন আহমদ।

গৌরব ও মর্যাদায় চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতি অবিভক্ত বাংলায় আলীপুরের পরই দ্বিতীয় মর্যদাপ্রাপ্ত সমিতি হিসেবে বিবেচিত হতো। সে থেকে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির অভিযাত্রা এবং গঠনতন্ত্রের মাধ্যমে সমিতি পরিচালিত হতে থাকে। আইনজীবীগণ নিজেদের প্রচেষ্টায় পুস্তক সংগ্রহের মাধ্যমে সমিতির বার লাইব্রেরী গঠন করেন বর্তমানে এক সমৃদ্ধশালী লাইব্রেরী গড়ে তোলা হয়েছে। শতাব্দীর অধিক প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির ইতিহাস নানাভাবে অত্যন্ত গৌরবময় ও সমৃদ্ধশালী। এই সমিতি বহু যশস্বী আইনজীবীর নানামুখী গৌরব ও প্রতিভাস্মৃতিতে ভরপুর।

গৌরবদীপ্ত চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির অভিযাত্রা সতের জন বিজ্ঞ আইনজীবী কতৃক গঠিত হলেও বর্তমানে সমিতির সদস্য সংখ্যা প্রায় ৫০০০ এর মতো। আজ আইনজীবী সমিতির পরিধি বিস্তৃত ও সমৃদ্ধি হয়েছে। তথ্য মতে, প্রতিষ্ঠাকালে ভাড়াঘরে সমিতির কার্যক্রম আরম্ভ হয়। ১৯৭৮ সালে সমিতির মূল ভবন নির্মিত হলে সমিতির কার্যক্রম প্রথমে দ্বিতলে শুরু হলেও ২০০৩ সালে সেখান হতে স্থানান্তিিরত হয়ে চতুর্থ তলায় সমিতির সুদৃশ্য কার্যালয় স্থাপন করা হয়।

১৯৯৮ সালে সমিতির মূল ভবনের পশ্চাতে বাংলাদেশ ব্যাংক সংলগ্ন এক্সটেনশন ভবন নির্মাণ হয়। আইনজীবীদের চেম্বারের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৫ সালে নির্মিত হয় ‘আইনজীবী এনেক্স বিল্ডিং-০১’,২০০৯ সালে নির্মিত হয় ‘আইনজীবী এনেক্স বিল্ডিং-০২’। বিজ্ঞ আইনজীবীদের প্রয়োজনে বর্তমানে ‘শাপলা’ ও ‘দোয়েল’ নামের দু’টি ভবনের নির্মিত হয়েছে। গৌরবোজ্জ্বল চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতি এখন বাংলাদেশের একটি স্বয়ং সম্পূর্ণ বার। এখানে রয়েছে সম্পূর্ণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত দেশের সর্ব বৃহৎ অডিটরিয়াম। সমিতির নিজস্ব ওয়েব সাইট, ওয়াইফাই জোন। আইনজীবী সমিতির প্রসার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

আইন পেশার চর্চা শুরু হয় আইনের সুতিকাগার প্রাচীন গ্রীসের এথেন্স থেকে। আইন, বিচার ও শাসন বিভাগ রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ও মূল উপাদান। যাতে আইনজীবীরা প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। আইন পেশা একটি মহান ও মর্যাদাপূর্ণ পেশা। আইনজীবীরা জাতির বিবেক এবং দর্পন। দেশের বুদ্ধিজীবি ও নেতা। জাতির দিক নির্দেশক। দেশের প্রথম শ্রেণীর নাগরিক। আইনজীবীকে কোর্ট অফিসার বলা হয়। বিভিন্ন মনসীগণ আইন পেশাকে রাজকীয় পেশা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

সমগ্র বিশ্বে বিচারক ও আইনজীবীদের বিজ্ঞ বলা হয়, কিন্তু অন্য পেশার ব্যক্তিদের বিজ্ঞ বলা হয়না। আইনজীবীরা দেশের রাষ্ট্র ক্ষমতা হতে সর্বক্ষেত্রে প্রতিনিধিত্ব করে আসছেন। আজকে দেশের সর্বোচ্চ পদ রাষ্ট্রপতি পদে একজন আইনজীবী সমাসীন আছেন। সংসদে স্পীকার ও ডেপুটি স্পীকার আইনজ্ঞ ব্যক্তি।

আইনজীবীরা আইনের শাসন ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার অতন্দ্র প্রহরী। আইনের শাসন ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় আইনজীবীগণ গৌরবদীপ্ত ভূমিকা পালন করে আসছেন। আইনজীবীরা তাদের প্রজ্ঞা, সততা, কর্তব্যনিষ্ঠা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি সমুজ্জল রেখেছেন। আইনজীবীদের অতীত ভূমিকা গৌরবোজ্জ্বল।

আইনজীবীরা ’৫২ভাষা আন্দোলন, ’৭১ মহান মুক্তিযুদ্ধে, ’৯০ গণ অভ্যত্থান, ১/১১ বা দেশের ক্রান্তিলগ্নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। কায়েমী স্বার্থবাদীদের বিরুদ্ধে এ সমিতি গর্জে উঠেছে। অন্যায়, অবিচার ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অত্র সমিতি একটি সাহসী প্রতিষ্ঠান। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সবসময় আপোষহীন ভূমিকা রেখেছে। শাসন বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ, আইনের শাসন ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার দাবিতে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতি সবসময় অবিচল।

বিশেষ করে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি চট্টগ্রামের লালদিঘি ময়দানে জনসভায় যাওয়ার প্রাক্কালে তার গাড়ি বহরে পুলিশ নির্বিচারে গুলি বর্ষণ করলে অত্র সমিতির আইনজীবীগণ জীবনবাজি রেখে মানব বর্ম তৈরী করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আইনজীবী সমিতিতে নিয়ে এসে প্রাণে রক্ষা করেন। সেদিন পুলিশী হামলায় আহতদের অত্র সমিতির সদস্যগণ স্বেচ্ছ্বায় রক্ত দান করেন। সে বর্বরোচিত হামলায় ২৪ জন নিহত ও প্রায় দু শতাধিক লোক আহত হয়।

এরশাদ সরকারের পতন হলে ১৯৯২ সালের ০৫ মার্চ এ হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে প্রয়াত এডভোকেট শহীদুল হুদা বাদি হয়ে মূখ্য মহানগর হাকিমের আদালত, চট্টগ্রামে একটি মামলা দায়ের করলে তৎকালীন চট্টগ্রামের পুলিশ কমিশনার রকিবুল হুদা সহ ০৮ জনকে অভিযুক্ত করে ১৯৯৮ সালের ০৩ নভেম্বর বিজ্ঞ আদালতে চাজৃশটি দাখিল করা হয়। ২০০০ সালের ০৯ মে আসামীদের বিরুদ্ধে বিচারকার্য শুরু হলেও এখনও বিচারকার্য সমাপ্ত করা হয়নি। প্রতি বছর ২৪ জানুয়ারি ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। যা ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

আইনজীবীরা আজ অবহেলিত ও সর্বক্ষেত্রে উপেক্ষিত। আইনজীবীরা সমাজে সন্মান ও পূর্ণ মর্যাদার সাথে বসবাস করতে চায়। অধিকাংশ আইনজীবীরা গ্রাম থেকে আগত। পেশাগত কারণে তারা চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন স্থানে ভাড়া বাসায় দিনাতিপাত করছেন। অন্যান্য পেশাজীবিদের জন্য সরকারি বা বেসরকারিভাবে আবাসনের ব্যবস্থা থাকলেও আইনজীবীদের জন্য কোন ব্যবস্থা নেই। আইনজীবীদের প্রধান সমস্যা আবাসন সংকট। অত্র আইনজীবী সমিতির সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় এ সমস্যা দিন দিন প্রকট হচ্ছে। আবাসন সমস্যা নিরসন বিজ্ঞ আইনজীবীদের দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি।

আইনজীবী সমিতির পক্ষে সরকারি সহযোগিতা ব্যতীত এই সংকট নিরসন কোনভাবে সম্ভব নয়। এই আবাসন সংকট নিরসনের জন্য সরকারিভাবে সার্বিক সহযোগিতা প্রয়োজন। বিভিন্ন সময়ে সরকারের আশ্বাস পাওয়া গেলেও অদ্যাবধি জমি বরাদ্দ পাওয়া যয়িনি। আমরা আর আশ্বাসের বৃত্তে আবদ্ধ থাকতে চাইনা, এবার তা বাস্তবায়ন চাই। সরকারি অনেক পরিত্যক্ত সম্পত্তি বা খাস সম্পত্তি রয়েছে। সরকার উক্ত সম্পত্তি হতে কিছু পরিমাণ জমি আইনজীবীদের আবাসনের জন্য বরাদ্দ দিলে আবাসন সংকট অনেকাংশে নিরসন হবে বলে আইনজীবী মহল মনে করে।

সরকারি খাস জমি বরাদ্দ ও আবাসনের জন্য যাদের বেশী প্রয়োজন তারা উভয়ে চট্টগ্রামের কৃতি সন্তান বর্তমান সরকারের মাননীয় গৃহায়ন ও পূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশারফ হোসেন এবং মাননীয় ভুমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামাান চৌধুরী জাবেদ। আইনজীবী মহল আশা প্রকাশ করেন, তাদের সার্বিক সহযোগিতার মাধ্যমে আইনজীবীদের আবাসন সংকট দ্রুত লাঘব হবে। এবার চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির কার্যনির্বাহী পরিষদ নির্বাচনে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক সহ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছে আওয়ামীলীগ সমর্থিত সন্মিলিত আইনজীবী সমন্বয় পরিষদ।

বর্তমান কার্যনির্বাহী পরিষদ সরকারের সাথে জোর প্রচেষ্টা চালালে তবে মনে হয় আইনজীবীদের আবাসন সমস্যা নিরসন হবে সুনিশ্চিত। যে আবাসন প্রকল্পে থাকবে বিশ্বদ্যিালয, মহাবিদ্যালয়, বিদ্যালয়, মাদরাসা, মসজিদ, মন্দির, গীর্জা, খেলার মাঠ, পার্ক, বিপণী কেন্দ্র, বিনোদন কেন্দ্র, নিজস্ব পরিবহণ, নিরাপত্তাসহ যাবতীয় সুযোগ সুবিধা।
প্রাচ্যের রাণী খ্যাত চট্টগ্রাম বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী এবং সমুদ্র বন্দর। এ বন্দরের মাধ্যমে সরকারে শতকরা আশি ভাগ রাজস্ব আদায় হয়। উক্ত রাজস্ব সারাদেশে উন্নয়নে যথেষ্ট অবদান রাখে। এই অগ্নিগর্ভা চট্টগ্রাম হতে ’৭১ স্বাধীনতা ঘোষিত হয়েছে। ১৯৬৮ সালের ১৭ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী ডঃ ওয়াজেদ মিয়ার বিবাহ সম্পন্ন হলে তাদেরকে তৎকালীন চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগ ১৯৬৮ সালের ০১ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম রাইফেল ক্লাবে সংবর্ধনা প্রদান করেন। শেখ হাসিনার অনেক স্মৃতিবিজড়িত স্থান চট্টগ্রাম।

তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইতিপূর্বে ঘোষণা দিয়েছেন চট্টগ্রামের উন্ন্য়নের দায়িত্ব তিনি নিজেই নিয়েছেন। আমরা জানি প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রামের উন্নয়নের ব্যাপারে যথেষ্ট আন্তরিক।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইতিপূর্বে সাংবাদিক, পুলিশ ও গত ১৫ এপ্রিলে বিচারকদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থার ঘোষণা দেন। আশাকরি তদ্রুপ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আইনজীবীদের দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি আইনজীবীদের আবাসন সংকট নিরসনে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

লেখক:এড. সালহ্উদ্দিন আহমদ চৌধুরী লিপু

কলামিস্ট ও সাবেক পাঠাগার সম্পাদক, চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতি

এ বিভাগের আরও খবর
আপনার মতামত লিখুন :

Your email address will not be published.