করোনা ভাইরাস- বাংলাদেশে আস্থার ঘাটতি এখনো তীব্রঃ ড. হোসেন জিল্লুর
সিটি নিউজ ডেস্কঃ ড. হোসেন জিল্লুর রহমান শিক্ষাবিদ, অর্থনীতিবিদ ও উন্নয়ন বিশ্লেষক। পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী প্রধান ও বিশ্বের বৃহত্তম বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের চেয়ারম্যান এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বাণিজ্য ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেছেন, অপ্রস্তুত থেকে অনেক দেশই করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলা করছে। বাংলাদেশকেও ঠিক অপ্রস্তুত থেকেই করোনা মহামারিকে মোকাবেলা করতে হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পক্ষ থেকে বাংলাদেশের জন্য দিক-নির্দেশনা ছিল। কিন্তু আমাদের অভ্যাস হচ্ছে, দূরবর্তী কোনো ঘটনাকে গুরুত্ব না দেয়া। ঠিক তাই হয়েছে। তবে মানুষকে ঘরমুখি করে চলাফেরার ওপর কিছুটা বাধা-নিষেধ করা হয়েছে, যা অত্যন্ত জরুরি ছিল। সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে আপাতত সামাজিক এই দূরত্ব কার্যকর করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। অন্য দেশও তাই করেছে।
তিনি বলেন, করোনা সচেতনতায় মনোযোগ এবং প্রস্তুতির ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে এবং বিভিন্ন মহল থেকে করোনা নিয়ে যে তথ্য আসছে, তা ঠিক গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হয়নি। করোনা পরিস্থিতির প্রাথমিক স্তর শেষ করে এসেছি মনোযোগ ছাড়াই। এখন পরের ধাপ। চলাফেরায় বিধি-নিষেধ বা এক প্রকার লকডাউন চলছে। অন্যরা এটি অনেক আগেই করেছে। আমরা করলাম পরে। তার মানে গুরুত্ব উপলব্ধির ঘাটতিটা এখনো রয়ে গেছে।
ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, শুরু থেকেই আমরা মনোযোগের ঘাটতি দেখে আসছি। করোনা সফলভাবে মোকাবেলা করতে হলে জনগণ, সামাজিক শক্তি, সরকার, রাষ্ট্রের মধ্যে বিশ্বাস স্থাপন করে একত্র হয়ে কাজ করা জরুরি। যারাই একত্র হয়ে কাজ করেছে, তারাই করোনা মোকাবেলায় আপাতত সফল হয়েছে। কোথাও রাষ্ট্র নেতৃত্ব দিয়েছে, কোথাও ব্যক্তি বা সামাজিক শক্তিগুলো নেতৃত্ব দিয়েছে। আস্থার ঘাটতিটা এখনো তীব্র বাংলাদেশে। আংশিক তথ্য দিয়ে আসলে পূর্ণ আস্থা মেলে না। আপনি টেস্ট করছেন কম। ফলাফলও মিলছে কম। মাঠ পর্যায়ের মৃত্যু নিয়ে নানা আলোচনা আছে।
এরপরও আমি মনে করছি, মাঠ পর্যায়ে যে মৃত্যু হচ্ছে, তা সীমিত আকারেই। সরকারের তথ্যের সঙ্গে বাস্তবতার অমিল থাকলেও আক্রান্ত বা মৃত্যুর সংখ্যাটা ঠিক বিপর্যয়ের দিকে যায়নি এখনো।
তিনি আরো বলেন, নানা কারণেই করোনা বাংলাদেশে এখনো নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় আছে। এর মধ্যে অন্তত সামাজিক দূরত্বের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। সরকার এবং ব্যক্তি পর্যায়ে নানা উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে, কিন্তু অনেকটাই আংশিক তথ্যের ভিত্তিতে। আমাদের সামর্থ্য কম। হয়তো এ কারণেই পরীক্ষা কম হচ্ছে, সঠিক সেবা মিলছে না। কিন্তু সেটি স্বীকার করেও জন-আস্থা বাড়ানো সম্ভব। সবাইকে নিয়ে করা সম্ভব। নানামুখি উদ্যোগ আছে। কিন্তু কার্যকর উদ্যোগের জন্য আরও বিশ্বাস-আস্থা দরকার।
একটি মাত্র ল্যাব ছিল। এখন আরও বাড়ানো হচ্ছে। এটি আরও আগে করা সম্ভব হতো। প্রাইভেট সেক্টরকে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, তা নিয়ে উদ্যোগ ছিল না। নিয়ন্ত্রণে রেখেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজে লাগানো সম্ভব। কিন্ত এক্ষেত্রে এক ধরনের অনীহা কাজ করেছে।
তিনি বলেন, অসম্পূর্ণ বা লুকোচুরির তথ্য দিয়ে আপনি কোনো কিছুরই ভালো সমাধান দিতে পারবেন না। এরকম একটি পরিস্থিতিতে মানুষ সামগ্রিক একটি চিত্র দেখতে চায়। মানুষ যদি বুঝতে পারে যে, ঝাঁপিয়ে পড়া দরকার তাহলে কিন্তু সমাধানের পথটা এমনিতেই বেরিয়ে আসবে। খণ্ডিত চিত্র থেকে মানুষ আসলে ঝাঁপিয়ে পড়ার মতো ভরসা পায় না।
ঢাকা শহর অনেকটাই লকডাউনের মতো আছে। কিন্তু গ্রাম-গঞ্জে কী ঘটছে, তা নিয়ে কিন্তু নানা প্রশ্ন আছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে অনেক অসঙ্গতিই উঠে আসছে। সচেতনতা নিয়ে মানুষের মধ্যে এক ধরনের শিথিলতা আছে।
মসজিদগুলোতে জামাত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে মসজিদে গিয়ে নামাজ না পড়লে ধর্মের সঙ্গে কোনো বিরোধ হতে পারে না, তা বোঝানোর ব্যাপার আছে। এটি বোঝানো সম্ভব হয়নি। ধর্মের গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ হচ্ছে, ‘তোমরা দায়িত্বশীল হবে।’ এটি ধর্মেরই একটি অনুশাসন। অথচ এখানে সরকারের সমন্বিত প্রচেষ্টার অভাবে তাগাদায় ঘাটতি রয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে আসলে কী ঘটবে, তা এই মুহূর্তে বলা মুশকিল। গণকের পক্ষে বলা সম্ভব হয়তো। তবে আমরা বুঝতে পারছি, করানো নিয়ে সরকারের দেয়া তথ্য বহুলাংশেই অসম্পূর্ণ। অথবা আংশিক। এটিই সরকারও হয়তো ক্ষেত্রবিশেষে স্বীকার করবে। দ্বিতীয় প্রশ্ন হচ্ছে, করোনা আক্রান্তদের ব্যাপারে আর কীভাবে ধারণা করা যেতে পারে। পরীক্ষা তো সব জায়গায় হচ্ছে না। তাহলে জ্বর, সর্দি, কাশির উপসর্গ নিয়ে মানুষ মরছে কি-না, সে ব্যাপারে ধারণা রাখা। অর্থনীতির ভাষায় যাকে বলে প্রক্সি ইন্ডিকেটর। অর্থাৎ বিকল্প উপায়ে তথ্য সংগ্রহ করা।
এক্ষেত্রে বেসরকারি সংগঠন বা সামাজিক শক্তিগুলোকে কাজে লাগিয়ে প্রক্সি ইন্ডিকেটরের মাধ্যমে মাঠের চিত্র তুলে আনা যায়। তাহলেই আমরা বুঝতে পারব বাংলাদেশ আসলে কোথায়।
