সিটি নিউজ ডেস্কঃ মুক্তিযুদ্ধকালীন ৪ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার ও বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) চিত্ত রঞ্জন দত্ত (সি আর দত্ত) বীর উত্তম চলে গেলেন না ফেরার দেশে।
আজ মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) বাংলাদেশ সময় সকাল ৯টার দিকে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯৩ বছর।
এদিকে রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বার্তায় সি আর দত্তের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশ গুপ্ত জাগো নিউজকে তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘সি আর দত্ত মারা গেছেন। বাংলাদেশের সময় আজ সকাল ৯টায় তিনি মারা গেছেন। মৃত্যুর সময় তার বয়স হয়েছিল ৯৩ বছর।’
রানা দাশ গুপ্ত বলেন, ’বয়স ৯৩ বছর হওয়ায় তার নানান দুরারোগ্য রোগ ছিল। তিনি আছেন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায়। তার মেয়ে কবিতা দাশগুপ্তের বাসায় ছিলেন। ওখানে হঠাৎ করে গত শুক্রবার তিনি বাথরুমে পড়ে যান। পড়ে গিয়ে পায়ে ফ্র্যাকচার হয়েছিল। তখন তিনি অজ্ঞান হয়ে যান। ওই অবস্থায় তাকে ফ্লোরিডার হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে যাওয়ার পরপরই তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। গতকালকে তার মেয়ে ওখান থেকে ফোন করে জানায়, গতকাল রাত ৯টার দিকে তিনি ভেন্টিলেশনে আছেন। অবস্থা আশঙ্কাজনক। কিছুক্ষণ আগে খবর পেলাম যে, তিনি মারা গেছেন।’
সৎকারের বিষয়ে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘তাদের পরিবারের ইচ্ছা মরদেহটা বাংলাদেশে নিয়ে আসা। আমাদেরও ইচ্ছা, মরদেহটা বাংলাদেশে আসুক। তার মরদেহ কীভাবে আসবে? কারণ এখন বিমানগুলো বন্ধ। আমরা চাই যে, বাংলাদেশেই তার সৎকারটা করা হোক। তবে বাংলাদেশের কোথায় তার সমাধি হবে, সেটা ঠিক করি নাই। এইমাত্র খবরটা পেলাম। তাছাড়া, মরদেহটা আসতেও কিছুদিন সময় লাগবে। এর মধ্যে আমরা সবার সঙ্গে কথা বলে বিষয়টা ঠিক করব।’
সি আর দত্তের জন্ম ১৯২৭ সালের ১ জানুয়ারি আসামের শিলংয়ে। তার পৈতৃক বাড়ি হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার মিরাশি গ্রামে।
তিনি ছিলেন বাংলাদেশ রাইফেলসের (বর্তমানে বিজিবি) প্রথম ডিরেক্টর জেনারেল। মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তাকে বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত করে সরকার।
সি আর দত্তের বর্ণাঢ্য কর্মজীবন
মুক্তিযুদ্ধকালীন ৪ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার মেজর জেনারেল (অব.) চিত্ত রঞ্জন দত্ত (সি আর দত্ত) বীর উত্তম মারা গেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সকাল ৯টার দিকে তিনি মারা যান। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯৩ বছর। সি আর দত্ত মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্য বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত হন।
জন্ম ও শিক্ষাজীবন
চিত্ত রঞ্জন দত্তের জন্ম ১৯২৭ সালের ১ জানুয়ারি আসামের শিলংয়ে। তার পৈতৃক বাড়ি হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার মিরাশি গ্রামে। তার বাবার নাম উপেন্দ্র চন্দ্র দত্ত এবং মায়ের নাম লাবণ্য প্রভা দত্ত। শিলং-এর ‘লাবান গভর্নমেন্ট হাইস্কুল’ -এ দ্বিতীয় শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিলেন৷ পরবর্তীকালে বাবা চাকরি থেকে অবসর নিয়ে হবিগঞ্জে এসে স্থায়ী বসবাস শুরু করেন৷ হবিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুল থেকে ১৯৪৪ সালে তিনি মাধ্যমিক পাশ করেন। পরবর্তীতে তিনি কলকাতার আশুতোষ কলেজে বিজ্ঞান শাখায় ভর্তি হয়ে ছাত্রাবাসে থাকা শুরু করেন৷ এরপর খুলনার দৌলতপুর কলেজের বিজ্ঞান শাখায় ভর্তি হন৷ পরে দৌলতপুর কলেজ থেকেই বি.এস.সি পাশ করেন৷
মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা
১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠিত হওয়ার পর তাজউদ্দীন আহমেদকে প্রধানমন্ত্রী মনোনীত করা হয় এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি হিসেব দায়িত্ব দেয়া হয় এম.এ.জি ওসমানীকে। তিনি বাংলাদশেকে মোট ১১টি সেক্টরে ভাগ করে নেন৷ সিলেট জেলার পূর্বাঞ্চল এবং খোয়াই শায়স্তাগঞ্জ রেল লাইন বাদে পূর্ব ও উত্তর দিকে সিলেট ডাউকি সড়ক পর্যন্ত এলাকা নিয়ে ৪নং সেক্টর গঠন করা হয় এবং এই সেক্টরের কমান্ডার নিযুক্ত হন চিত্ত রঞ্জন দত্ত৷ সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর সিলেটের রশীদপুরে প্রথমে ক্যাম্প বানান তিনি৷ চারপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে চা বাগান৷ চা বাগানের আড়ালকে কাজে লাগিয়ে তিনি যুদ্ধের কৌশল নির্ধারণ করে দিতেন৷ পরবর্তী সময়ে তিনি যুদ্ধের আক্রমণের সুবিধার্থে রশীদপুর ছেড়ে মৌলভীবাজারে ক্যাম্প স্থাপন করেন৷
মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী ভূমিকা
চিত্ত রঞ্জন দত্ত ১৯৭২ সালে রংপুরে ব্রিগেড কমান্ডার হিসেবে নিযুক্ত হন৷ সেখানে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন৷ ১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য সীমান্ত রক্ষা প্রহরী গঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে সরকার৷ এই বিষয়ে চিত্ত রঞ্জন দত্তকে দায়িত্ব দেয় বাংলাদেশ সরকার৷ পরবর্তীকালে তিনি সীমান্ত রক্ষা প্রহরী গঠন করেন এবং নাম দেন বাংলাদেশ রাইফেলস। বর্তমানে এ বাহিনীর নাম বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ। চিত্ত রঞ্জন দত্ত ছিলেন বাংলাদেশ রাইফেলসের প্রথম ডাইরেক্টর জেনারেল। এছাড়া ১৯৭১-এর পর থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত তাকে নানা ধরনের দায়িত্ব পালন করতে হয়৷ ১৯৭৪ সাল থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত তিনি হেড কোয়ার্টার চিফ অব লজিস্টিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন৷ ১৯৭৭ সালে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন৷ ১৯৭৯ সালে বি আর টি সি এর চেয়ারম্যান হিসেবে কিছুদিন দায়িত্ব পালনের পর ১৯৮২ সালে তিনি পুনরায় মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন৷ ১৯৮৪ সালে তিনি অবসর গ্রহণ করেন৷
পুরস্কার ও স্বীকৃতি
মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য চিত্ত রঞ্জন দত্ত বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত হন৷ এছাড়া ঢাকার কাঁটাবন থেকে কারওয়ান বাজার সিগন্যাল পর্যন্ত সড়কটি ‘বীরউত্তম সি আর দত্ত’ সড়ক নামে নামকরণ করা হয়।
কর্মজীবন
চিত্ত রঞ্জন দত্ত ১৯৫১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন৷ কিছুদিন পর ‘সেকেন্ড লেফটেনেন্ট’ পদে কমিশন পান। ১৯৬৫ সালে সৈনিক জীবনে প্রথম যুদ্ধে লড়েন তিনি৷ ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে পাকিস্তানের হয়ে আসালং এ একটা কোম্পানির কমান্ডার হিসেবে যুদ্ধ করেন তিনি৷ এই যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য পাকিস্তান সরকার তাকে পুরস্কৃত করে৷
