বন্দরের উন্নয়নকাজে গতি বাড়বে

0

সিটিনিউজবিডি : দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ছয় মাস অনুসন্ধান শেষে চট্টগ্রাম বন্দরের শীর্ষ কর্মকর্তাকে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়ায় হ্যান্ডলিং, ডেলিভারি, চলমান ও পরিকল্পিত উন্নয়নকাজে গতি বাড়বে বলছেন বন্দর ব্যবহারকারীরা।

তারা জানান, ‘সমৃদ্ধির স্বর্ণদ্বার’ খ্যাত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ মাথায় নিয়ে স্বাভাবিক কাজ করাটা অস্বস্তিকর। তারপরও গত কয়েক বছরে বন্দরের যে উন্নয়ন হয়েছে তা অকল্পনীয়। সবই দৃশ্যমান প্রকল্প।

শতবর্ষী বাণিজ্য সংগঠন চিটাগাং চেম্বারের পোর্ট-শিপিং-কাস্টমস কমিটির চেয়ারম্যান মাহফুজুল হক শাহ বলেন, একজন সাধারণ মানুষও মামলা-অভিযোগ ইত্যাদির কারণে মানসিক চাপে থাকে। সমস্যা হচ্ছে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তাদেরই প্রমাণ করতে হয় নির্দোষের বিষয়টি। এতে একজন ডায়নামিক অফিসারও মানসিক চাপে ভোগেন। ভালো কাজ, বড় কাজ করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।

তিনি বলেন, এক্ষেত্রে বন্দর চেয়ারম্যান ব্যতিক্রম। তিনি অভিযোগে মানসিকভাবে ভেঙে না পড়ে দ্বিগুণ মনোবলে চলমান উন্নয়নকাজ, আপকামিং প্রজেক্ট বে টার্মিনাল, বাল্ক টার্মিনাল নিয়ে অগ্রসর হয়েছেন। আশাকরি, এখন বন্দরের গতি বাড়বে।

খ্যাতনামা শিপিং এজেন্টের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ৩৬ হাজার কনটেইনারের ভেতর দ্রুত প্রয়োজনীয় কনটেইনারটি ডেলিভারি নিতে কনটেইনার টার্মিনাল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (সিটিএমএস), বন্দরের জেটিতে আসা-যাওয়ার সময় কর্ণফুলী চ্যানেলে ছোট ছোট নৌযান, লাইটার জাহাজ, অয়েল ট্যাংকারের সঙ্গে সংঘর্ষ এড়াতে ভ্যাসেল ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম (ভিটিএমআইএস) কত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে তা কি অভিযোগকারীরা জানেন!

তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর একজন নেতা বলেন, সরকারের ভিশন ২০২১ এর জন্য আমাদের যে ৫০ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা তা চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নয়নকাজে ধারাবাহিকতা না থাকলে মুখ থুবড়ে পড়বে। কয়েক বছর ধরে বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে যে প্রবৃদ্ধি তা ধরে রাখার জন্য শিগগির বে-টার্মিনাল চাই, কর্ণফুলী কনটেইনার টার্মিনাল (কেসিটি) চাই। নতুন নতুন আইসিডি-আইসিটি চাই।

তিনি বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ওপর চাপ কমিয়ে কম ভাড়ায় বন্দর থেকে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, আশুলিয়ার কারখানায় পোশাকশিল্পের কাঁচামাল নিয়ে যেতে নদীপথের বিকল্প নেই। এখন সরকার নারায়ণগঞ্জে পানগাঁও আইসিটি করেছে কিন্তু তিন ডজনের বেশি লাইসেন্স দেওয়ার পরও যখন কেউ জাহাজ নামায়নি তখন বন্দর নিজের টাকায় জাহাজ কিনে যাত্রা শুরু করেছিল। এর জন্য যদি দুর্নীতির অভিযোগ মাথায় নিতে হয় তবে বড় কাজে অন্য কোনো কর্মকর্তা সাহস করবে না। অথচ কয়েকবছর পর নদীপথে কনটেইনার পরিবহনের বিকল্প থাকবে না।

দেশের প্রধান এ সমুদ্রবন্দরের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল নিজামউদ্দিন আহমেদসহ চারজনের বিরুদ্ধে তদন্ত শেষে বুধবার দুদক সচিব আবু মোহাম্মদ মোস্তফা কামালের সই করা চিঠিতে অভিযোগ থেকে অব্যাহতির বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। বাকি তিনজন হলেন বেঙ্গল লয়েড লিমিটেডের চেয়ারম্যান জিয়াউল হক চিশতি, ইকম ট্রেড হোল্ডিং প্রাইভেট লিমিটেডের পরিচালক রফিকুল ইসলাম ও অরূপ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী নাজমুল হক খান।

চলতি বছরের মার্চের প্রথম সপ্তাহে বন্দর চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে যন্ত্রপাতি ক্রয়ের টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, রাজস্ব ক্ষতি ও আত্মসাতের অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু করেছিল দুদক। দুদকের উপ-পরিচালক শেখ মো. ফানাফিল্যাকে অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা ও দুদক পরিচালক মো. নূর আহাম্মদকে তদারককারী কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়।

অভিযোগে বলা হয়, চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান নিজামউদ্দিন আহমেদ তিনটি জাহাজ ক্রয়ে ৩৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। তার ভায়রা ভাই জিয়াউল হক চিশতির মাধ্যমে ১৮-২০ বছরের পুরোনো ২০ কোটি টাকা মূল্যের জাহাজ ৫৫ কোটি টাকা দিয়ে কেনেন। একই কোম্পানিকে দরপত্র ছাড়াই জাহাজ ব্যবস্থাপনায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

এ ছাড়া বন্দরের ১০ টন মোবাইল ক্রেন কেনায় ৬ কোটি ৩৮ লাখ টাকা এবং স্ক্যানার মেশিন কেনায় প্রায় ৫ কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয় অভিযোগে।

বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল নিজামউদ্দিন আহমেদ এ প্রসঙ্গে বলেন, আইন ও বিধির বাইরে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কোনো কাজ হয় না। সেটি জাহাজ ক্রয় হোক বা যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করা হোক। এক্ষেত্রেও যে অভিযোগ তোলা হয়েছিল তা ছিল ভিত্তিহীন, মিথ্যা। দুদকের অনুসন্ধানেও তা-ই প্রমাণিত হয়েছে।

তিনি বলেন, রাষ্ট্রের একটি চ্যালেঞ্জিং প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। দেশের আমদানি-রপ্তানির ৯৩ শতাংশ পরিবাহিত হয় এ বন্দর দিয়ে। আমরা নতুন অকশন শেড করলাম, কারশেড করলাম, পানি বিশুদ্ধকরণ কারখানা করলাম, দুটি ভালো মানের কলেজ করলাম, ডক অফিস করলাম, স্লিপওয়েকে পুনর্জীবন দিলাম, এনসিটি চালু করলাম। এ ছাড়া হাসপাতাল ভবন করছি, আইএসপিএস কোড বাস্তবায়ন করছি, বাধাবিপত্তি পেরিয়ে বে টার্মিনাল, বাল্ক টার্মিনাল করতে যাচ্ছি। এত কাজ ১২৮ বছরের ইতিহাসে বন্দরে হয়নি।

ঢাকার কনটেইনারগুলো নদীপথে পরিবহনের জন্য পানগাঁও আইসিটি করলাম যখন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স নিয়েও জাহাজ নামাচ্ছিল না তখন তাদের উদ্বুদ্ধ করতে তিনটি জাহাজ কিনলাম। এখন তার সুফল আমদানিকারক, রপ্তানিকারক তথা দেশবাসী ভোগ করছেন। প্রশ্ন হচ্ছে-ভালো কাজ করতে গিয়ে যদি অপবাদ সইতে হয় তখন আমার অধীনস্থ কর্মকর্তারা তো ভালো কাজে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। এটা সবাইকে উপলব্ধি করতে হবে। যোগ করলেন বন্দর চেয়ারম্যান।

এ বিভাগের আরও খবর
আপনার মতামত লিখুন :

Your email address will not be published.