এড. সালাহ্উদ্দিন আহমদ চৌধূরী লিপু –
অহংকারদীপ্ত জাতীয় নেতা, দেশ বরণ্যনেতা, বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ট সহচর, বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, চট্টগ্রাম-১৩ সংসদীয় আসনে সাংসদ, পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি, ৭৭ জাতি চেম্বার অব কমার্সের ভাইস প্রেসিডেন্ট, দি ফেডারেশন বাংলাদেশ অব চেম্বার অব কমার্স ইন্ডাষ্টিজের ও দি চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স ইন্ডাষ্টিজের সভাপতি, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, দেশের শীর্ষ স্থানীয় ইউসিবি ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, খ্যাতিমান শিল্পপতি, বিশিষ্ট দানবীর, গরীব, দুঃখী, মেহনতী, মাটি ও মানুষের নেতা, চট্টগ্রামের অভিভাবক, বীর প্রসবিনী চট্টলার অহংকার ও গৌরব, বর্ষিয়ান রাজনীতিবীদ, আনোয়ারার কৃতি সন্তান এবং আমাদের সকলের অতি প্রিয় মরহুম আলহাজ্ব আখতারুজ্জামান চৌধুরীর তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলী।
এ বরণ্য ব্যক্তি চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলাধীন হাইলধর গ্রামের জমিদার এডভোকেট নুরুজ্জামান চৌধুরীর ঔরশে জন্মগ্রহণ করেন। তার অগ্রজ মরহুম বশিরুজ্জামান চৌধুরী চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামীলীগের কোষাধ্যক্ষ ও চট্টল গৌরব এম,এ আজিজের ঘনিষ্ট বন্ধু ছিলেন। তার অনুজ মরহুম বশরুজ্জামান চৌধুরী মহান মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রামের প্রথম শহীদ।
ত্যাগী এ নেতা ছাত্রজীবনে সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তিনি ১৯৫৮ ইংরেজী সালে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের সদস্য নির্বচিত হন। ১৯৬৭ ইংরেজী সাল হতে ১৯৭১ ইংরেজী সাল পর্যন্ত আনোয়ারা উপজেলাধীন হাইলধর ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। মরহুম ১৯৬৭ ইংরেজী সালে আওয়ামী রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হন। ১৯৭০ ইংরেজী সালে তিনি সাধারণ নির্বাচনে আনোয়ারা-পশ্চিম পটিয়া হতে প্রাদেশিক সদস্য হন। ১৯৭১ ইংরেজী সালে বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব বাবু মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে তার চট্টগ্রামস্থ পাথরঘাটার আন্দোলন ও সংগ্রামের সুতিকাগার ঐতিহাসিক ‘জুপিটার হাউস’ থেকে স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিষদের কর্মকান্ড পরিচালনা করেন। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র এখান থেকে সাইক্লোষ্টাইল মেশিনে ছাপিয়ে প্রচার করতেন। মহান মুক্তিযুদ্ধ চালাকালীন সময়ে তিনি বন্ধুপ্রতিম দেশ ভারতে গিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
মরহুম মুজিবনগর সরকারের ত্রাণ ও পূর্ণবাসন কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে তিনি বিশ্ব জনমত গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সফর করে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গড়ে তোলেন। ১৯৭২ ইংরেজী সালে বাংলাদেশ গণ পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি বাংলাদেশ সংবিধান প্রণয়নে অনন্য ভূমিকা পালন করেন। ’৭২ এর সংবিধানের তিনি অন্যতম স্বাক্ষরকারী। ১৯৭৫ ইংরেজী সালের ১৫ আগষ্ট ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পর জনাব চৌধুরী নিজের জীবন বাজি রেখে আওয়ামীলীগের নেতা কর্মীদের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে দল পুনরুজ্জীবন ও পুর্ণগঠনে সাহসী ভূমিকা পালন করেন। নির্ভিক এই নেতা আওয়ামীলীগের দুঃসময়ে আর্থিকভাবে সাহায্য সহায়তা করে দলকে শক্তিশালী করেন।তার সাংগঠনিক ক্ষমতা ছিল অপরিসিম। চির দুঃসময়ে তিনি দলকে দিক নির্দেশনা দিয়ে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। ৮০ দশকে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনেও তিনি বলিষ্ট ভূমিকা পালন করেন। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে তাকে কারাবরণ করতে হয়। খালেদা জিয়া আমলেও তাকে অনেক জুলুম নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে।
জননেতা আলহাজ্ব আখতারুজ্জামান চৌধুরী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১৩ সংসদীয় আসন হতে ১৯৮৬, ১৯৯১ ও ২০০৮ সালে সাংসদ নির্বাচিত হন। তিনি বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের শিল্প ও বাণিজ্য সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৮ ইংরেজী সাল হতে আমৃত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি পদে অধিষ্টিত ছিলেন।
ব্যবসায়ী আলহাজ্ব আখতারুজ্জামান চৌধুরী রাজনীতি ব্যতীত তিনি একজন সফল ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনি বেসরকারী ব্যাংকিং সেক্টরে অন্যতম পথিকৃত। মরহুম একে একে গড়ে তোলেন রনি কেমিক্যাাল, আরামিট লিঃ, ইউসিবি ব্যাংক, জনতা ইনসুরেন্স সহ অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান। তিনি একজন শিল্প উদ্যেগতাও বটে। তিনি একমাত্র ব্যক্তি ১৯৮৯ সালে ৭৭ জাতি চেম্বার অব কমার্সের ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে বাংলাদেশের জন্য বিরল সন্মান এনেছিলেন। তার খ্যাতি ছিল দেশে বিদেশে। তিনি অত্যন্ত সৌখিন ছিলেন। তিনি ব্যক্তিগত ভাবে পৃথিবীর অনেক দেশ ভ্রমণ করেছেন।
দানবীর আলহাজ্ব আখতারুজ্জামান চৌধুরী একজন দানশীল ব্যক্তি ও বিশাল হৃদয়ের অধিকারী ছিলেন। সবসময় দুঃস্থ, অনাথ ও অসহায় ব্যক্তিদের প্রতি সাহায্যেও সহযোগিতার হাত প্রসারিত ছিল। কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠি রিক্ত হস্তে ফিরে যেতে হয়নি। তার পর্বতসম হৃদয় দিয়ে মানবসেবা করে গেছেন। তিনি চট্টগ্রামের আনোয়ারা, পশ্চিম পটিয়া সহ দক্ষিন চট্টগ্রামের অনেক এলাকায় বিভিন্ন মসজিদ, মাদরাসা, স্কুল কলেজ মন্দির, মঠ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা ও আর্থিক সহায়তা করে গেছেন।
স্নেহ পরায়ণ ও মমতাময়ী মরহুম আলহাজ্ব আখতারুজ্জামান চৌধুরীর ঘনিষ্ট সহচর হিসেবে তাকে খুব কাছে থেকে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। তিনি আমাকে খুব স্নেহ করতেন। আত্মীয়তার সুবাদে তিনি আমাকে নাতি হিসেবে সম্বোধন করতেন। মরহুম অত্যন্ত বিনয়ী, মিষ্টিভাষী, সদালাপী ও নিরহংকারী ছিলেন। তার ব্যবহারে যে কোন লোক মুগ্ধ হতেন। তিনি অতি সহজে মানুষকে আপন করে নিতে পারতেন। তার কাছে কোন অহংকার, গৌরব ক্ষমতার দম্ভ এসব কিছু ছিলনা। কেন্দ্রীয় নেতা থেকে আঞ্চলিক নেতা পর্যন্ত তাকে সম্মান করতেন। সব দলের নেতাদের সাথে তার ছিল সদভাব ও গ্রহণযোগ্যতা। মরহুম উদার রাজনৈতিক নেতা ছিলেন। তার প্রতি মানুষের অকুণ্ঠ ভালোবাসা ছিল।
বুদ্ধি, মেধামত্তা, বিচক্ষণতা ও যোগ্যতা তিনি দেশ-বিদেশে সব মহলেই ছিলেন আলোচিত ব্যক্তি। ন্যায় ও নীতিবান আলহাজ্ব আখতারুজ্জামান চৌধুরী একজন আদর্শবান ব্যক্তি ছিলেন। কোন লোভ লালসা তাকে তার আদর্শ থেকে বিচ্যূতি করতে পারেনি। এমনকি বিএনপি ও জাতীয় পার্টির আমলে মন্ত্রীত্বের লোভনীয় প্রস্তাব পেলেও তিনি তা প্রত্যাখান করেন। তিনি চিরজীবন বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অবিচল ছিলেন। জীবনের অধিকাংশ সময় তিনি রাজনীতি ও মানুষের জন্য ব্যয় করেছেন। অন্যায়ের সাথে তিনি কখনো আপোষ করেননি। সকল লোভ লালসার উর্ধে থেকে তিনি দলকে ভালোবেসেন।
দয়ালু মরহুম আলহাজ্ব আখতারুজ্জামান চৌধুরী অত্যন্ত পরোপকারী ছিলেন। উপকার করা যেন তার নেশা। মানুষের ধন-সম্পদ হয়, কিন্ত দুহাতে বিলানোর মানুষ কম আছে, তিনি মানুষের জন্য সব সময় দুহাতে বিলিয়ে দান করেছেন। যেটি শেখ হসিনা পঞ্চদশ অধিবেশনের প্রথম বৈঠকে শোক প্রস্তাবে বলেিেছলেন। তার মতো মানুষ এ সমাজে বিরল। তার সবসময় তার সার্সন রোডের ‘ভলকার্ট হাউস’ এর আঙিনা দলীয় নেতা, কর্মী ও সাধারণ জনগণের পদচারণায় মুখরিত থাকতো। কোনদিন বিরক্তি প্রকাশ করতেন না। তিনি মানুষের দুঃখ, দুর্দশার কথা ধৈর্য্য সহকারে শুনতেন এবং তা সমাধানের সাধ্যমতো চেষ্টা করতেন। তিনি সহজে মানুষকে যেকোন সমস্যার সমাধান দিতে পারতেন। রিক্ত হাতে মানুষকে তিনি বিমুখ করেননি। এই মহান ব্যক্তি ইউসিবি ব্যংক, নিজস্ব প্রতিষ্ঠান সহ বিভিন্ন সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন জনকে চাকরী দিয়ে পুর্নবাসন ও প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
জননন্দিত আখতারুজ্জামান চৌধুরীর সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ মৃত্যুর পর ঢাকা হতে হাইলধর গ্রামের বাড়ি পর্যন্ত যতগুলো জানাজা অনুষ্ঠিত হয়, ততগুলো জানাজাতে অগণিত মানুষের ভীষণ ভিড় ও সাধারণ মানুষের কান্না দেখা পরিলক্ষিত হয়। প্রতিটি জানাজায় আমি উপস্থিত ছিলাম। সেদিন আমি নিজে অভিভিত হয়েছিলাম। এ জীবনে অনেক জানাজা দেখেছি, কিন্তু এত লোকের সমাগম কোন জানাজায় দেখিনি। এ জানাজার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে মানুষ তাকে কত ভালোবাসতো। তার প্রতি অগণিত মানুষের দোয়া ও আর্শীবাদ রয়েছে।
চট্টল দরদী বাবু ভাই শুধু নেতা ছিলেন না। তিনি নেতৃত্ব সৃষ্টি করতেন। বাবু ভাই বীর চট্টলার অহংকার ও গৌরব। চট্টগ্রাম ইতিহাসের তিনি অবিচ্ছেদ্র অংশ। তিনি ছিলেন চট্টগ্রামের অভিভাবক। চট্টগ্রামবাসী হারালো তাদের প্রিয় অভিভাবককে। তার মৃত্যুতে জাতি ও বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের অপুরণীয় ক্ষতি হলো। তার অভাব কোনদিন পুরণ হবেনা। বাবু ভাই আজ আমাদের মাঝে নেই এ কথা ভাবতে অবাক লাগছে। এ ক্ষনজন্মা নেতা বারে বারে আসবেন না এই মর্তলোকে। তার মতো উদার নেতা কোনদিন বীর চট্টগ্রামে জন্ম হবেনা। তিনি কালজয়ী মানুষ। এই সুযোগ্য নেতার মহা প্রয়াণে চট্টগ্রামবাসী শোকাহত। তার অবদান চির অম্লান। তার অবদান জাতি চিরদিন মনে রাখবে। তিনি মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল। আশা আকাঙ্খার মূর্ত প্রতিক আখতারুজ্জামান চৌধুরী সর্বদা চট্টগ্রামের উন্ন্য়ন নিয়ে চিন্তাভাবনা করতেন। প্রাজ্ঞ, ত্যাগী, প্রবীণ ও সিনিয়র নেতা আলহাজ্ব আখতারুজ্জামান চৌধুরীকে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ যথাসময়ে যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি। যখন তাকে মন্ত্রী করার উদ্যেগ গ্রহণ করা হয়েছিল, তখন তিনি পরপারে পাড়ি জমিয়ে ছিলেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি প্রশ্ন, আলহাজ্ব আখতারুজ্জামান চৌধুরীর দলের জন্য এত ত্যাগ, শ্রম থাকা সত্ত্বেও তাকে সময় মতো মন্ত্রী করা হলো না কেন? তাকে মন্ত্রীত্ব দেয়া গেলে চট্টগ্রামের ব্যাপক উন্ন্য়ন সাধন হতো।
আখতারুজ্জামান চৌধুরীর সুযোগ্য উত্তরসূরী সৎ, নির্ভিক ও কর্মবীর আলহাজ্ব সাইফুজ্্জামান চৌধুরী জাবেদকে ভূমি প্রতিমন্ত্রী করায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আমরা চট্টগ্রামবাসী চির কৃতজ্ঞ। আশা করি মাননীয় প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা তার মাধ্যমে চট্টগ্রামের উন্নয়নে যথেষ্ট অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারবেন এই আমাদের প্রত্যাশা।
আজকের এইদিনে বাবু ভাই আমাদের মাঝে না থাকলেও আমাদের অন্তরে তিনি প্রতি নিয়ত জাগরুক আছেন। আমরা তার কাছে চির কৃতজ্ঞ। আল্লাহ যেন তাকে বেহশতের শ্রেষ্ঠতম স্থানে অধিষ্ঠিত করেন, মৃত্যুবার্ষিকীতে এই কামনা করি।
লেখক :- সভাপতি, পরিচালনা পরিষদ, বটতলী এস, এম, আউলিয়া উচ্চ বিদ্যালয়, আইন উপদেষ্টা, ইউনাইটেড কমর্শিয়াল ব্যাংক লিঃ ও কলামিষ্ট।
