গোলাম সরওয়ার : চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন ঢাকায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রনালয়ে বদলি হয়ে গেছেন। তবে তিনি চলে যাওয়ার আগে জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের কর্মচারীদের গন বদলির ঘটনা ঘটেছে। মাত্র সপ্তাহে ৫০ কর্মচারীকে বদলী করা হয়েছে। এদের প্রায় সবাই বদলি হয়েছেন পছন্দের ভুমি অফিসে। অভিযোগ উঠেছে এসব বদলির মাধ্যমে বিপুল অর্থের লেনদেন হয়েছে।
জেলা প্রশাসন অফিসের সিবিএ নেতারাই এ টাকা লেনদেনের কাজটি সমন্বয় করেছেন। দেখা যায়, যাদের বদলি করা হয়েছে, তারা আগের চেয়ে ভালো জায়গায় আসা যাওয়া করেছেন। অনেকে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় কাজ করলেও নতুন বদলী আদেশে তাদের শহরে থাকার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ফলে তারা উপজেলার ভুমি অফিস কিংবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে কাজ করলেও চট্টগ্রাম শহরের সরকারী বাসায় থাকার সুবিধা পাবেন। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন বদলির বিষয়ে বলেন, মন্ত্রী পরিষদ থেকে একটি আদেশ এসেছে। তাতে এক জায়গায় যাদের চাকরির সময় তিন বছর পুর্ন হয়েছে, তাদের বদলি করতে বলা হয়েছে।
সেই অনুযায়ী আমরা প্রথমে ভুমি অফিসের বদলীগুলো সম্পন্ন করেছি। এরপর অন্য বিভাগগুলোয় হাত দেব। অর্থের লেনদেনের কথা অস্বীকার করে তিনি বলেন, ভুমি অফিসের ব্যাপারে অনেক বেশি তদবির এসেছিল। তবে আমরা খুব সতর্কতার সাথে এ কাজ শেষ করেছি। যেসব সিবিএ নেতা এই নেতা এই বদলি কাজের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত, তারা হলেন জেলা প্রশাসনের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেনির কর্মচারীদের সংগঠন কেসিদে ইনষ্টিটিউট অফিসার্স ক্লাবের সভাপতি মোহাম্মদ ইউনুচ ও যুগ্ন সাধারন সম্পাদক জামাল উদ্দিন। তাদের মধ্যে জামাল উদ্দিন নিজেও জেলা প্রশাসনের পরিত্যক্ত সম্পদ (ভিপি) বিভাগ থেকে সীতাকুন্ড ভুমি অফিসে বদলী হয়েছেন।
এদের দুজনের বিরুদ্ধেই অবৈধ সম্পদ অর্জনের ব্যাপারে দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ করা হয়েছে। যেসব অভিযোগ বর্তমানে তদন্তের পর্যায়ে রয়েছে। পাশাপাশি জেলা প্রশাসনের একাধিক উচ্চপদের কর্মকর্তাও এই বদলিবানিজ্যের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। অবশ্য বদলি আদেশে ভুমিকা রাখার কথা অস্বীকার করেছেন মোহাম্মদ ইউনুচ ও জামাল উদ্দিন। তারা বলেন, জেলা প্রশাসকের নিজ ইচ্ছাতেই সব বদলি আদেশ হয়েছে। বদলি আদেশ যাচাই করে দেখা যায়,৫০ জনের মধ্যে কেবল ভুমি অফিস থেকে ভুমি অফিসে ১১ জনকে বদলি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে মো: নাছির উদ্দিন সীতাকুন্ড ভুমি অফিস থেকে চান্দগাঁও ভুমি অফিসে, আলী আজম খান আগ্রাবাদ ভুমি অফিস থেকে হাটহাজারী ভুমি অফিসে, মো: আবু তালেক চান্দগাঁও ভুমি অফিস থেকে পটিয়া ভুমি অফিসে বদলি হন।
এ ছাড়া মোহাম্মদ আলী সীতাকুন্ড ভুমি অফিস থেকে মিরস্বরাই ভুমি অফিসে, দেবাশীষ রুদ্র পটিয়া ভুমি অফিস থেকে সাতকানিয়া ভুমি অফিসে, নোমান হাবিবুর রহমান হাটহাজারী ভুমি অফিস থেকে ফটিকছড়ি ভুমি অফিসে ও দয়াল কান্তি মিত্র আনোয়ারা ভুমি অফিস থেকে চন্দনাইশ ভুমি অফিসে বদলি হন। আর প্রবাল দে পটিয়া থেকে সাতকানিয়া ভুমি অফিসে. মো: আলী হোসেন সদর ভুমি অফিস থেকে বোয়ালখালী ভুমি অফিসে ও মোহাম্মদ মুসা লোহাগাড়া ভুমি অফিস থেকে ফটিকছড়ি ভুমি অফিসে বদলি হন। অসীম কুমার রক্ষিত মিরসরাই ভুমি অফিস থেকে সার্কিট হাউসের সংযুক্তি আদেশ বাতিল করে পুনরায় মিরসরাই ভুমি অফিসে বদলী হন। এর বাইরেও অনেকে বিভিন্ন শাখা থেকে ভুমি অফিসে বদলি হন। এ ধরনের আছেন ১৯ জন। ফলে ৫০ জনের মধ্যে ৩০ জনই বদলি হয়ে এসেছেন ভুমি অফিসে। তাদের মধ্যে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের (সার্বিক) গোপনীয় মো: সাইফুর রহমান বর্তমানে রেকর্ড রুম শাখায় সংযুক্ত।
কিন্তু সেই সংযুক্তি আদেশ বাতিল না করে তাকে চান্দগাঁও ভুমি অফিসে বদলি করা হয়েছে। ফলে নতুন বদলি আদেশের কারনে চাইলে তিনি এখন দুই জায়গায় চাকরি করতে পারবেন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জমি রেজিষ্ট্রি থেকে ভুমি অধিগ্রহন পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে নানাভাবে অর্থ আয়ের সুযোগ রয়েছে। ফলে কর্মকর্তা কর্মচারীদের সবচেয়ে পছন্দের জায়গা হলো ভুমি অফিস।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক বদলি হয়ে যাওয়ার আগে যে ৫০ জনকে বদলি করা হয়েছে তার মধ্যে ৩০ জনই বদলি হয়েছেন তাদের পছন্দের ভুমি অফিসে। নাম প্রকাশে অনিশ্চুক জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের এক কর্মী জানান, কর্মচারীরা যেখানে যেতে চেয়েছেন, তিনি সেখানে যেতে পেরেছেন। জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন তিন বছর অতিবাহিত হওয়ায় বদলির কথা বলেছেন। তবে দেখা গেছে, আর্থিক লেনদেনে অসামর্থ্যরা বছরের পর বছর একই জায়গাতেই রয়ে গেছেন। এবারের আদেশেও তাদের ক্ষেত্রে সরকারি বিধান কাজ করেনি।
আবার অনেকে ভালো জায়গায় চাকরি করায় তদবির করে একই জায়গায় বছরের পর বছর রয়ে যাচ্ছেন। জানা যায়, মোহাম্মদ সেলিম গত জুলাই মাসে পটিয়া ভুমি অফিস থেকে জেলা প্রশাসকের সাধারন শাখায় আসেন। দেড় মাসের মাথায় তিনি সাতকানিয়া ভুমি অফিসে বদলি হন। অপরদিকে কেসিদে ইনষ্টিটিউটের সভাপতি মোহাম্মদ ইউনুচ সাধারন শাখায় একটানা সাত বছর আছেন। তার কোন বদলি আদেশ হয়নি।
