রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর মতো উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত হয়নি: ইয়াংহি লি

0

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:: রোহিঙ্গা প্রশ্নে মিয়ানমারের ভূমিকায় শঙ্কা প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন। ‘ইউনাইটেড নেশনস হিউম্যান রাইটস কাউন্সিল’ কর্তৃক নিযুক্ত মিয়ানমারে মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ বিষয়ক বিশেষ দূত ইয়াংহি লি জানিয়েছেন, দেশটিতে অবস্থানরত অনেকের সঙ্গে টেলিফোনে আলাপ করতে গিয়ে তিনি মিয়ানমারের এমন সব পদক্ষেপের কথা জেনেছেন, যা শঙ্কিত হওয়ার মতো। লি মন্তব্য করেছেন, এখনও রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর মতো উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত হয়নি। জাতিসংঘের ইনফরমেশন সেন্টারে প্রকাশিত তার এক বিবৃতি থেকে এসব কথা জানা গেছে।

গত বছরের ২৫ আগস্ট রাখাইনের কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর পূর্ব-পরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধারার সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রায় ৭ লাখ মানুষ। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে বিপুল পরিমাণ শরণার্থীকে ফিরিয়ে নিতে পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশ ও জাতিসংঘের সঙ্গে প্রত্যাবাসন চুক্তি করতে বাধ্য হয় মিয়ানমার। তবে রোহিঙ্গা সংকট পর্যবেক্ষণে ৭ দিনের বাংলাদেশ সফরের শেষদিনে রবিবার ঢাকায় অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে লি বলেছেন, ‘যেহেতু এটি পরিষ্কার যে মিয়ানমার সরকার কার্যত কোনও অগ্রগতিই অর্জন করেনি অর্থাৎ, রোহিঙ্গাদের বঞ্চিত করার আইন, নীতি ও প্রথার বিলুপ্তিতে এবং দক্ষিণ রাখাইনকে নিরাপদ করে তুলতে কোনও ব্যবস্থা নেয়নি, সেহেতু নিকট ভবিষ্যতে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত যাওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই। ’

লি ঢাকার সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, মিয়ানমার সরকার রাখাইনে মানবাধিকার অবস্থা পর্যবেক্ষণের বিষয়ে তাকে কোনও সহায়তা করেনি। মিয়ানমারের অনেকের সঙ্গে তার টেলিকনফারেন্স হয়েছে জানিয়ে লি জানিয়েছেন, তাদের কাছ থেকে মিয়ানমার সরকারের অগ্রগতির বিষয়ে যা শুনেছেন তাতে তিনি রীতিমত শঙ্কিত। যাদের সঙ্গেই কথা হয়েছে তারা সবাই বলেছেন, ‘যথেষ্ঠ হয়েছে, আর না। এবার মিয়ানমার বাসিন্দাদের ওপর যে নির্যাতন চলছে তা বন্ধ হওয়া উচিত।’

বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হওয়ার অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে লি বলেছেন, ‘আমাদের শুধু রোহিঙ্গাদের রাষ্ট্রহীন নাগরিক হিসেবে দেখলেই হবে না, বরং তারা কীভাবে রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়লো তাও খুঁজে দেখা উচিত। ১৯৭০ সাল থেকেই রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব নিয়ে টালবাহানা করা হচ্ছে। আর ১৯৮২ সালে নাগরিকত্ব আইন পাসের পর থেকে তারা একেবারেই নাগরিকত্ব বঞ্চিত হয়ে উঠেছে। মিয়ানমার সরকার তাদের অন্যায়ভাবে নাগরিকত্ব বঞ্চিত করেছে তখন এবং এখনও সেই বঞ্চনা চালিয়ে যাছে।’

শরণার্থী শিবিরে থাকা রোহিঙ্গা নারীরা লি’কে জানিয়েছেন, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাদের বাসায় এসে তাদের স্বামীদের খোঁজ করত। সেনাবাহিনীর ভয়ে লুকিয়ে থাকা স্বামীদের সন্ধান না পেয়ে মিয়ানমারের সেনা সদস্যরা তাদেরকে ধর্ষণ করেছে। লির ভাষ্য, ‘আমি এই ঘটনা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেছি, যে একটি ১২ বছর বয়সী শিশুকে সেনা সদস্যরা কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলেছে। কারণ সে তাদের পারিবারিক মালিকানাধীন মৎস খামারে গিয়েছিল। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যতদিন তারা এনভিসি গ্রহণ না করবে ততদিন তারা ওই মৎস খামরে যতে পারবেন না। একটি শিশুর প্রতি এমন নির্মমতা অমার্জনীয়।’

ইয়াং লি মন্তব্য করেছেন, বাংলাদেশে থাকা রোহিঙ্গাদের অবস্থা অত্যন্ত সঙ্গীন, তাদের দ্রুত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে সহায়তা পাওয়া উচিত। জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান (জেএসপি) প্রয়োজনের মাত্র ২৬ শতাংশ পূরণ করতে পারছে। দাতাদের উচিত আর্থিক সহায়তা নিশ্চিতে এগিয়ে আসা। বর্তমানে রোহিঙ্গাদের মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদী সহায়তা অত্যন্ত জরুরি। রোহিঙ্গাদের জন্য তিনটি প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিতের ওপর জোর দিয়েছেন লি। সেগুলো হলো, ‘সবার জন্য শিক্ষা, জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় জীবিকার প্রকৃত সুযোগ এবং রোহিঙ্গা নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য কর্মমুখী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা।’

এ বিভাগের আরও খবর
আপনার মতামত লিখুন :

Your email address will not be published.