রাজনীতির নষ্টালজিয়া ও ছাত্রলীগনামা

0

 জুবায়ের সিদ্দিকী – 

আওয়ামী লীগ সরকারকে বর্তমানে দ্বিতীয় মেয়াদের দুই বছরের কাছাকাছি এসে চারটি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হচ্ছে। প্রথম চ্যালেঞ্জ দেশের অভ্যন্তরে আইনের শাসন নিশ্চিত করা, দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ বহি:বিশ্বে ভাবমুর্তি পুনরুদ্ধার, তৃতীয় চ্যালেঞ্জ দলের শৃঙ্খলা বা মন্ত্রী এবং তাদের স্বজনদের লাগাম টেনে ধরা। চতুর্থ চ্যালেঞ্জ উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজনৈতিক ভাবে শক্ত অবস্থানে থাকলেও সাম্প্রতিক কয়েকটি বিষয় সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে। যদিও তাৎক্ষনিকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে সফলতার পরিচয় দিয়েছে সরকার। সচেতন মহল মনে করছেন, ভবিষ্যত এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি নিয়ন্ত্রনে নিতে হবে কার্যকর ভুমিকা।

না হলে জনবিস্ফোরন ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না কোনমতেই। সুশাসন প্রতিষ্টার ক্ষেত্রে সবার আগে প্রয়োজন আইনের শাসন। দেশে আইনের শাসনের পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে। দায়িত্বশীল পুলিশ ও প্রশাসনের কাছে জনসাধারনের বঞ্চনার খবর হরহামেশাই উঠে আসছে। অপরাধী বা দোষী ব্যক্তিদের আটকের নামে বানিজ্য চালানো হচ্ছে। সরকারী দলের লেবাস গায়ে থাকলে দোষ করেও পার পেয়ে যাচ্ছেন অনেকে। অর্থ ও ক্ষমতা অনেক ক্ষেত্রেই আইনের বারোটা বাজাচ্ছে। আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের নামে বন্দুকযুদ্ধ, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, সন্ত্রাস, খুনোখুনির মতো ঘটছে সারাদেশের মত চট্টগ্রামে। স্বাভাবিকভাবে হচ্ছে না, পুলিশ বা প্রশাসনের বদলী-পদায়নও।

সাধারন নিয়মের যোগ্য হতে তাদের অনৈতিক উপায়ের আশ্রয় নিতে হচ্ছে। অযোগ্যরা তদবির বানিজ্যে প্রতিষ্টিত হচ্ছে। বৈষম্য বাড়ার কারনে মানুষের মানবিক মুল্যবোধ দিন দিন কমে যাচ্ছে, মানুষ অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক দলের আশ্রয়ে থাকলে তাকে আর আইন স্পর্শ করে না। এখন মেধার চেয়ে আনুগত্য প্রাধান্য পাচ্ছে। রাজনীতিবিদরা এই পরিস্থিতির দায় এড়িয়ে যেতে পারেন না। আমি মনে করি, দোষারোপের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে দায়িত্বশীল অবস্থান নেওয়ার সময় এসেছে। খুন হলেই বিএনপি জামায়াত করেছে বলে দোষ চাপিয়ে সত্যকার অপরাধীদের আড়াল হতে দেওয়ার প্রবনতা ছাড়তে হবে। সরকারকে এ ব্যাপারে সত্যিকার অর্থে জিরো ট্রলায়েন্স দেখাতে হবে।

আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীন কোন্দল গ্রুপিং কমবেশি সারাদেশে। দলের শৃঙ্খলা রক্ষা করা আওয়ামী লীগের সামনে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। একজন এমপি যখন রাস্তায় মদ খেয়ে মাতাল হয়ে মানুষকে পাখি মারার মতো গুলি করে তখন সরকারের ভাবমুর্তি বিনষ্ট হয় মারাত্বকভাবে। দেশজুড়ে দলীয় পরিচয়ে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ উঠছে প্রতিদিনই। সহযোগী সংগঠনের মধ্যে কাউকে গ্রেফতার করা হলে তাকে থানা থেকে ছিনিয়ে নিয়ে আসার ঘটনাও ঘটেছে বেশ কয়েকবার। শুধু মন্ত্রী, এমপি বা দলীয় নেতারাই নন, অনেক ক্ষেত্রে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে তাদের আত্বীয় স্বজন ও মদদপুষ্টরা। চট্টগ্রামের এক উপজেলার এমপির বিরুদ্ধে সেদিন অফিসে এসে বললেন, একজন মহিলা আইনজীবি। জায়গা জমি সংক্রান্ত জটিলতার সুত্রে এক পক্ষের সমর্থনপুষ্ট হয়ে এমপি সাহেব ফোনেও তাকে বকাবকি করেছেন। এই বৃহত্তর চট্টগ্রামে প্রায় উপজেলায় এমপিদের রাজত্বে সানাই বাজাচ্ছে তাদের চামচা ও চাটুকাররা। সর্বত্র যেন ক্ষমতার ফানুস উড়ছে। বিগত বিএনপি জামায়াত সরকারের আমলে দেখেছি, এভাবে এমপি মন্ত্রীদের দাপট ও চাটুকারদের রাজত্ব। নগরীতে থানাগুলোতে রিতিমত হাট বসত নির্দোষ মানুষ বেচাকেনার। নিরহ মানুষকে হয়রানী থেকে শুরু করে এহেন কুকর্ম যে করেনি ক্ষমতার দোর্দন্ড প্রতাপে তা বলা দুরহ ব্যাপার। দেশে ঘটছে হত্যাকান্ড।

কোন কিনারা করতে পারছেনা গোয়েন্দারা। প্রশাসন, মন্ত্রী ও সরকারদলীয় শীর্ষ নেতারা কাজের চেয়ে ফাউ কথাবার্তা বেশি বলছেন। কোন কোন এমপি মন্ত্রী দেশে কোন ঘটনা ঘটলেই খালেদা জিয়ার চৌদ্দগোষ্টি উজাড় করে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষন মিডিয়া কভারেজ অথবা সরকারের দৃষ্টি আকর্ষনের জন্য। অথচ দেশে এভাবে দিনে দুপুরে কোন হত্যাকান্ড ঘটলেই আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কোন সফলতা নেই। ব্যর্থতা যেন পদে পদে আমাদের সমাজে অধিষ্টিত হচ্ছে স্থায়ীভাবে। দেশে কি কোন মানুষের নিরাপত্তা নেই। রাষ্ট্র কি মানুষের কোন নিরাপত্তা দিতে পারবেন না। নৃশংসতা কি সভ্য সমাজে স্থায়ীভাবে গেড়ে বসেছে। আমাদের সন্তানরা যখন বাবার লাশ মর্গে রেখে পরীক্ষা দিতে যায়, স্ত্রীর সামনে স্বামীকে প্রকাশ্যে রাস্তার উপর ধারালো অস্ত্র দিয়ে খুন করে ঘাতকরা নির্বিঘেœ পালিয়ে যায়। ঘাতকেরা যখন ধরা পড়ে না, তখন লাশের মিছিল বাড়তে থাকে।

জনগন আজ বুঝতে পারছে না, মানুষের নিরাপত্তা কোথায়। ঘাতকরা বার বার ঘুনোখুনি করে রক্তাক্ত করছে নগর, বন্দর ও লোকালয়। কোথাও মানুষের স্বস্তি নেই। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকজন প্রনিধানযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে, হচ্ছে, খবর পাবেন, অপেক্ষা করেন, গোয়েন্দারা চেষ্টা করছে এমন সব বাক্য ছাড়েন সাংবাদিকদের কাছে তখন একজন সাংবাদিক হিসেবে নিজের বিবেক নাড়া দেয় বার বার। এসব এরা কি বলছে। অপরাধীকে না ধরার ব্যর্থতার কাহিনী। আর কত লিখব। কেন সমাজে এত হানাহানি হলেও তার লাগাম টেনে ধরতে পারছে না। জনপ্রতিনিধি ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রশাসনকে পকেটস্থ করেন দোর্দন্ড প্রতাপে তখন মানুষ অসহায় বোধ করে। এমপি-মন্ত্রী তকমাধারী কারোর জন্যই এসব সন্ত্রাসে জড়িয়ে পড়া যেমন দুঃখজনক ও দুর্ভাগ্যজনক। আমাদের দেশে জনপ্রতিনিধিরা সবাই যে একরকম তা নয়। ভাল অবশ্যই আছে।

তবে দুয়েকজনের জন্য দল ও সরকার লজ্জায় পড়ে। দুঃচিন্তায় পড়ে, তাও সঠিক। কোনকিছুই অতিরিক্ত ভাল নয়। তবে হঠাৎ বড় প্রাপ্তী অনেক সময় জনপ্রতিনিধিদের নিয়ন্ত্রনহীন কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। আমার সাংবাদিকতা জীবনে ক্ষমতাধারকদের অনেক মাস্তানীর কসরৎ দেখার সুযোগ হয়েছে। তবে এরা ক্ষমতা থেকে যাওয়ার পর নি:সঙ্গ ও ডাষ্টবিনে নিক্ষেপ যে হয়েছে তাও প্রত্যক্ষ করেছি। আমাদের বড়ই দুর্ভাগ্য যে, ক্ষমতা থেকে যে একদিন বিদায় নিতে হবে সেটা আমরা বেমালুম ভুলে গিয়ে উম্মাধনার সৃষ্টি করি। আর সরকারের আমলে জনপ্রতিনিধি ও মন্ত্রীদের আচরন অনেক সময় দেশবাসীকে ব্যাথিত করে। কারন মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের এই সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা অনেক বেশি।

কিছু মুষ্টিমেয় মানুষের অশুভ আচরন দল ও সরকারের ভাবমুর্তিকে বিনষ্ট করে। সাধারন মানুষ আর আশ্বস্ত হতে পারছেন না। ক্ষমতার গুরুত্বপুর্ন ধাপ হিসেবে সমকালীন ইন্টেলিজেন্স বিশ্বের উন্নত দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেদের আপগ্রেড রাখা। এর প্রধান দিক হল সব ধরনের অপরাধীর পুরো নেটওয়ার্ক সম্পর্কে আগাম ধারনা ও তথ্য সংগ্রহে রাখা। এর ফলে অভ্যন্তরীন এবং বাহিরের থেকেও কেউ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে চাইলে সে বিষয়েও হালনাগাদ থাকা তথ্য দিয়ে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়। এতে করে চাঞ্চল্যকর মামলাগুলোর তদন্তে তেমন কোন অগ্রগতি নেই বললেই চলে। সঙ্গত কারনে বিচার প্রক্রিয়াও সুদুর পরাহত। অভিজ্ঞ মহলের মতে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য সুপরিকল্পিতভাবে খুনের ঘটনাগুলো ঘটানো হচ্ছে। এই অপশক্তির বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কেউ কেউ আবার নমনীয় হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। তার কারন ঘটনা পুরোপুরি তদন্ত হলে থলের বিড়াল বেড়িয়ে পড়বে। এতে করে হামলার নেপথ্যে রাজনৈতিক বিষয়টি পরিস্কার হয়ে যাবে।

আমি মনে করি, পুলিশ রাজনৈতিক বলয়ে থাকার কারনে তাদের আসল কাজের গতি কমে গেছে। তাদের মেধা লোপ পেয়েছে। পাশাপাশি তাদের ভেতরেও অনেকের মুল্যায়ন হচ্ছে না। যার কারনে অনেকের গা ছেড়ে দিয়েছেন। অপরাধীদের নেটওয়ার্কে পুরোপুরি প্রবেশ করতে না পারলে খুনোখুনির ঘটনা প্রতিরোধ করা কঠিন হয়ে পড়বে। আমাদের অনেক সময় ব্যথিত যখন দেশে আইসশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ক্রেকডাউন। জনমনে অস্থির, উদ্বেগ ও উৎকন্ঠা নিয়ে যখন চলতে হয়। এখন তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সরকারের একজন মন্ত্রী মন্ত্রনালয়ে করেন মাস্তানী। মন্ত্রীত্ব আর মাস্তানী এক নয়। এটা কখনো কখনো কারো কারো পক্ষে বুঝে উঠা কঠিন হয়ে পড়ে। দেশবাসীর কাছে এ ঘটনা লজ্বার। সরকারের এমন ধরনের মন্ত্রীর উপস্থিতি থাকা উচিত কিনা সে প্রশ্নটিও জনমনে দেখা দিয়েছে। চট্টগ্রামে ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গ সংগঠন ছাত্রলীগের মারামারি, টেন্ডারবাজি, বন্দুকযুদ্ধ আবার হঠাৎ করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উপর প্রভাব ফেলেছে। চট্টগ্রামের শিক্ষাঙ্গনে ছাত্রশিবির ও ছাত্রদল অনুপস্থিত ।

এখন একক আধিপত্য। তবু বেসামাল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। আধিপত্য বিস্তার কিংবা শক্তি প্রদর্শনের হিসাবে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে নিজেরা নিজেদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে সংঘর্ষে। ক্যাম্পাসে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার, স্থানীয় রাজনীতির প্রভাব এবং সুবিধাবাদী নেতাদের উৎকোচের কারনে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। আগে ছিল প্রতিপক্ষ। এখন নিজেরা নিজেদের প্রতিপক্ষ। ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষার্থীদের অভ্যন্তনা জানাতে গিয়ে, চবি ছাত্রলীগের দুই গ্রুপ রক্ষক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এতে পুলিশ সহ অর্ধশতাধিক আহত হন।

এ ঘটনার পর ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মাঝে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ ও উৎকন্ঠা। বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন পরিস্থিতি দেখে অনেক শিক্ষার্থী পরবর্তী পরীক্ষা না দিয়ে বাড়ি ফিরে গেছে। ছাত্রলীগের ফাটাফাটি ও মারামারির দৃশ্য জনগন দেখেও উৎকন্ঠিত ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে রাজনীতিতে দায় চাপানোর সংস্কৃতির মাশুল দিচ্ছে দেশের জনগন। বড় দলের নেতারাই এই অভ্যাসের চর্চা করছেন।

বড় কোন ঘটনার পরপরই অন্য দলের উপর দোষ চাপাতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন ক্ষমতাসীনরা। এর ফলে অপরাধের সঙ্গে জড়িতরা প্রথম থেকেই পর্দার আড়ালে চলে যাচ্ছে। তদন্ত কর্মকর্তা অন্ধকারে হাতড়ে বেড়াচ্ছেন। হত্যা খুন গুম অপহরন, বোমাবাজিসহ লোমহর্ষক ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে। এতে করে রাজনীতির কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ছে। পিছিয়ে যাচ্ছে দেশ। সমাজে তৈরী হচ্ছে অস্থিতিশীলতা। মানুষের মাঝে বাড়ছে উদ্বেগ আতঙ্ক ও উৎকন্ঠা।

 

এ বিভাগের আরও খবর
আপনার মতামত লিখুন :

Your email address will not be published.