সাকার শীর্ষ ক্যাডাররা বিদেশে চামচারা সরকারী দলে

0

জুবায়ের সিদ্দিকী  –

চট্টগ্রামের রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও ফটিকছড়ি এই তিন উপজেলায় প্রায় চার দশক ধরে একছত্র আধিপত্য ছিল যুদ্ধাপরাধে ফাঁসি হওয়া সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর। অর্থবিত্তের বাহিরেও ছিল তার সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী। যা স্থানীয়দের কাছে সাকা বাহিনী হিসাবে ব্যাপক পরিচিত। এই বাহিনীর সদস্যদের অর্থ অস্ত্র জোগান েিয় রীতিমতো এদের ভরনপোষন করতেন সাকা চৌধুরী। বিভিন্ন ইস্যুতে ও নির্বাচনসহ নানাভাবে প্রতিপক্ষ দমনে বছরের পুরো সময়ই তাদের ব্যবহার করা হত এইসব অস্ত্রধারী ক্যাড়ারদের। এদের বিরুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্তরা আদালত বা থানায় মামলা করলে সে সব মামলা মোকাবেলায় আইনি প্রক্রিয়াতে একটি নিজস্ব আইনজীবি টিম কাজ করেছে। আইনী সহায়তা করতে এই টিম কাজ করেছে। ক্যাডারদের কোন সদস্য কারাগারে গেলে তাকে কারাগারে ও তার পরিবারের কাছে প্রতিমাসেই দেওয়া হতো নির্দিষ্ট মাসোহারা। সাকা চৌধুরী ৬ বার এমপি নির্বাচিত হলেও জনগনের চেয়েও তিনি নির্ভর করতেন সন্ত্রাসীদের ওপর গত ৪ দশকে সাকা বাহিনীর হাতে খুন হয়েছেন প্রায় শতাধিক মানুষ। সাকার ক্যাডারদের অত্যাচারের ভয়ে আওয়ামী লীগের বেশিরভাগ নেতাকর্মী টানা পাঁচবছর এলাকায় যেতে পারেননি। এই সাকা বাহিনীর হাতে বর্তমান গনপুর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনও আক্রান্ত হয়েছিলেন।

সাকার শীর্ষ ক্যাডারদের অনেকে আছেন মধ্যপ্রাচ্যের ওমান, জেদ্দা, দুবাই ও ব্হারাইনে। ছোট সাইজের ক্যাডাররা দল পরিবর্তন করে এখন সরকারী দলে যোগ দিয়েছে। এমনকি এসব দল বদলের অনেক ক্যাডার ও চামচারা সরকারীদলে যোগ দিয়ে এমপি মন্ত্রীদের পেছনেও ঘুর ঘুর করে এমনভাবে যে, এরাই এখন প্রকৃত দলপ্রেমী ও ত্যাগী নেতা। এতেকরে প্রকৃত নেতাকর্মীরা অনেক ক্ষেত্রে রয়েছে কোনঠাসা। রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও ফটিকছড়ির চিত্র এমন জানিয়ে অনেক আওয়ামী লীগ নেতা বলেছেন, এরা এখন অনেক কাজের কাজী। রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, ফটিকছড়িতে খুনের তালিকায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মী সহ তার নিজ দলের নেতাকর্মী ও সাধারন মানুষও রয়েছেন। খুনের বেশিরভাগ ঘটনা ঘটছে রাউজানে। যারা ভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ছিলেন মুলত তারাই ছিলেন টার্গেট। এমনকি নির্যাতনের শিকার অনেক নিরহ মানুষ এখনও পঙ্গুত্ব জীবনযাপন করছেন। সাকার ক্যাডারদের মধ্যে বিদেশে আছেন ফজল হক জেদ্দায়, আলী হামজা দুবাইয়ে, আজিজুল হক ও রমজান রয়েছেন ওমানে। বিধান বড়ুয়া, এসকান্দার, ফজল হক, নাছির সহ প্রায় দেড়শতাধিক ক্যাডার ছিল সাকার। এদের কাছে ছিল অত্যাধুনিক অস্ত্র। বিভিন্ন সময়ে এই ক্যাডারদের অনেকে র‌্যাবের ক্রসফায়ারে ও অভ্যন্তরীন কোন্দলে নিহত হন। তবে অনেকে এখন এলাকায়ও আছে।

অনুসন্ধানে জানা যায় যে, রাউজানে টিটু ও বিটু নামে দুই ছাত্রলীগ কর্মীকে একটি মেহেদি অনুষ্টানে ক্রসফায়ার করে হত্যা করা হয়। রাউজান ছাত্রলীগের সভাপতি ফারুক ডিগ্রী পরীক্ষা দিয়ে বের হওয়ার পর সাকার ক্যাড়ারদের হাতে খুন হন। ১৯৯১ সালে ১৫ জুলাই রাউজানের গুজরা ইউপি চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা আখতার হোসেন রাজুকে ইউনিয়ন পরিষদেই ক্রসফায়ার করে খুন করা হয়। ওইদিনই রাউজান উপজেলার সব ইউনিয়নের নির্বাচিত চেয়ারম্যানকে সাকার গুডসহিলে তলব করা হয়েছিল। কিন্তু রাজু গুডসহিলে হাজিরা না দেওয়াতে এবং সাকার বশ্যতা স্বীকার না করায় হত্যা করা হয়। জোট সরকারের আমলে বর্তমান গনপুর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ফটিকছড়ি ছাত্রলীগের সম্মেলন থেকে চট্টগ্রাম ফেরার পথে ফটিকছড়ি ও রাউজানের মধ্যবর্তী সাহাত্তারহাটে সাকা ক্যাডারদের আক্রমনের শিকার হন। এই ঘটনায় ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের গাড়ির ভেতরেই গুলি করে হত্যা করা হয় পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা হারুন বশরকে। একই ঘটনায় নিহত হন এক ছাত্রলীগ কর্মী। ওই ঘটনায় ভাগ্যক্রমে প্রানে বেঁচে যান ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। সে সময়ে নগরীর হলিক্রিসেন্ট হাসপাতালে তাকে আমি দেখতে গিয়েছিালাম। তিনি আমাকে বলেছিলেন, কিভাবে বেঁচে এসেছি তা আল্লাহ জানেন। বাঁচবো মনে করিনি।

বিএনপি নেতা আবদুল্লাহ আল নোমানের অনুসারী ছাত্রদল ক্যাডার নিটোল ১৯৯৬ সালে গুডস হিলের সামনে খুন হয়। সাকা ক্যাডাররা তাকে গুলি করে হত্যা করে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই ঘটনায় সাকা চৌধুরীকে কোতোয়ালী থানা পুলিশ আটক করে রাতভর থানা হাজতে বসিয়ে রেখে পরের দিন আদালত থেকে জামিন পেয়ে যান। ১৯৯৪ সালের ৩রা সেপ্টেম্বর রাউজানের কমলাদিঘির পাড় এলাকায় ট্যাক্সি থেকে নামিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয় উত্তর জেলা ছাত্রলীগ নেতা ইকবাল হোসেন ও জামিলকে। ১৯৯৫ সালের এপ্রিলে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হশ্চি নয়ারহাট গিয়ে তাদের পরিবারকে সমবেদনা জানান। সেই মামলার আসামীরা এখন এলাকায়। ২০ বছরেও সেই ডাবল মার্ডারের কোন বিচার হয়নি। এখন সাকার অনেক চামচা আওয়ামী লীগের নেতা। এদিকে সাকা চৌধুরীর দুইছেলে ফাইয়াজ কাদের চৌধুরী ও হুমাম কাদের চৌধুরীকে কঠোর নজরদারীতে রাখা হয়েছে। প্রতিহিংসার বশবতী হয়ে যাতে তারা নাশকতামুলক কিছু করতে না পারে সে জন্য সরকারের একটি প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থা তাদের উপর নজরদারী করছে।

তাদের বেড়ে উঠা এবং বিদেশ সফর সংক্রান্ত সব তথ্য সংস্থাটির হাতে পৌছেছে। কোন কোন দেশের নাগরিকের সঙ্গে তাদের যোগসুত্রও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দেশেও তাদের চলাফেরার উপর চলছে নজরদারী। সুত্র মতে জানা গেছে, যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ফাঁসির কাষ্টে ঝুলানোর আগে সাকার পরিবার বিচার বাধাগ্রস্ত করতে নানাভাবে চেষ্টা করেছেন। দেশে বিদেশে বসে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র করা হয়। এদিকে পুলিশের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেছেন, রায় কার্যকরের পর প্রতিহিংসামুলক সাকার পরিবার কোন ধরনের অপরাধের চেষ্টা বা অপরাধে জড়ালে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলছেন, কেউ যদি নাশকতার চেষ্টা করেন তাহলে গোয়েন্দারা বসে থাকবেন না। জানা গেছে, দুই ছেলের ব্যবহার করা ইন্টারনেট প্রটোকলের তথ্য সাইভার নিরাপত্তা দল পর্যবেক্ষন করছে। তারা যে ধরনের এ্যান্ডোয়েট অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহার করেন সে পদ্ধতিগুলো ইতিমধ্যে পর্যবেক্ষন করা হচ্ছে। অনুসন্ধানে জানা যায় যে, ১৯৭৯ থেকে ২০০৮ সাল। টানা ২৯ বছর রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও ফটিকছড়ি সম্প্রাজ্যের আধিপত্য বিস্তার ছিল সাকা চৌধুরীর।

এমনকি ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালেও রাউজানে তার প্রভাব প্রতিপত্তি ছিল অপ্রতিরোধ্য। তিন উপজেলায় তার ছিল শত শত ক্যাডার। ১৯৭৯ সালের মুসলিম লীগ থেকে রাউজানে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন সাকা চৌধুরী। রাজনীতি মুসলিম লীগ থেকে শুরু করে জাতিয় পার্টি, এলডিপি হয়ে বিএনপিতে যোগ দেন তিনি। ১৯৮৬ সালে জাতিয় পার্টির টিকেটে নিজের এলাকা রাউজান থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। এরপর এরশাদ তাকে দল থেকে বহিস্কার করেন। ১৯৯১ সালে নির্বাচন করেন এনডিপি থেকে। ১৯৯৬ সালেও রাউজান থেকে বিএনপির সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ সালে রাঙ্গুনিয়া থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

২০০৮ সালে রাঙ্গুনিয়া ও ফটিকছড়ি থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ফটিকছড়ি থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন সাকা চৌধুরী। বিগত ৮০র দশক থেকে সংবাদের শিরোনামে থাকতেন সাকা চৌধুরী। শুধু গনহত্যা নয়, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে চট্টগ্রামের রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, ফটিকছড়ি, হাটহাজারী, বোয়ালখালী ও চট্টগ্রাম শহরে নির্যাতন, লুন্ঠন, হিন্দুদের বাড়িঘর দখল এবং দেশান্তরে বাধ্য করার মত মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিলেন সাকা চৌধুরী। সে সময়ে পুরো চট্টগ্রাম জুড়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন মুসলিম লীগ নেতা সাকা চৌধুরী।

এ বিভাগের আরও খবর
আপনার মতামত লিখুন :

Your email address will not be published.