জামাল জাহেদ,কক্সবাজার : কক্সবাজার জেলার মহেশখালী উপজেলার সোনাদিয়া দ্বীপে দেশের একমাত্র গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ হওয়া এখনো অনিশ্চিত। যেহেতু গনমাধ্যমের ফলশ্রুতিতে জেনে যাচ্ছে কক্সবাজারের গভীর সমুদ্র বন্দর খুলনার দিকে হেটে চলেছে।বর্তমান সরকার তাদের মেয়াদ কালে এই গভীর সমুদ্র বন্দরটি নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করার কথা ছিল। এ বন্দর নির্মানের প্রাথমিক ভাবে যাচাই বাছাই করতে সময় লেগেছে ১২ বছর। গঠন করা হয়েছে একাধিক কমিটি। গভীর সমুদ্র বন্দর অর্থয়ানে আগ্রহ প্রকাশ করেছে একাধিক দাতা সংস্থা।কিন্তু বার বার হোঁচট খাচ্ছে সব পরিকল্পনা।
বর্তমানে কক্সবাজারের লোকেমুখে টপ অব দ্যা টপিক হিসাবে প্রাধান্য পাচ্ছে,চট্রগ্রামের দক্ষিণ উপকূলে সঠিক নেতৃত্ব না থাকাতে তদবির করে আনা সম্ভব হচ্ছেনা বাংলাদেশ ও বিদেশের অর্থায়নে কল্পিত সোনাদিয়া গভীর সমুদ্র বন্দর।সরকারের উচ্চ মহলে বার বার প্রেস মিডিয়ায় সোনাদিয়ার নাম প্রকাশ করলেও, এখনো কিন্তু আলোর মুখ দেখেনি বড় প্রকল্পটি।স্বপ্ন আর আশার দোলাচলে গভীর খাঁদে নিমজ্জিত গভীর সমুদ্র বন্দর।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, প্রতি বছর প্রকল্পটি রিভিউ করতে হচ্ছে। প্রাথমিক ভাবে ৪৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয় ধরা হলেও এখন এর ব্যয় নির্ধারণ হয়েছে ৫৫ হাজার কোটি টাকা। একযুগ অপেক্ষা করার পরও কোন অগ্রগতি না থাকায় অর্থয়াণে আগ্রহী দাতা সংস্থা গুলি হতাশা প্রকাশ করেছে বলে জানিয়েছেন সরকারি একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা। এখনও পর্যন্ত এ প্রকল্পে বিনিয়োগে একাধিক দাতা সংস্থা আগ্রহী বলা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোন প্রম্ভাবনা পাওয়া যায়নি বলে জানান ওই কর্মকর্তা।
সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে জানা গেছে, ২০১৪ সালের জুলাই মাসে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে নেদারল্যান্ড ভিত্তিক দাতা সংস্থা গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণে আগ্রহ প্রকাশ করে। এর আগে গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণে সরকারের পক্ষ থেকে আহবান জানানো হয়েছিল।২০১১ সালে বিএনপি জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই বন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা হাতে নেয়।ওই সময় প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয় ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এরপর দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও কাজের কোন অগ্রগতি হয়নি।
বন্দরটি নির্মিত হলে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরের উপর অতিরিক্ত চাপ কমবে। এই চিন্তা থেকে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রকল্পটি বাস্তবায়নের বিষয়ে আগ্রহ দেখানো হয়। প্রধানমন্ত্রীর তত্বাবধানে ফাস্ট ট্রাক মনিটরিং কমিটির ৭ প্রকল্পের বিশেষ মনিটরিং এর আওতায় আনা হয় এ বন্দর নির্মাণ প্রকল্পে। এছাড়া প্রথম সমুদ্র বন্দর নির্মাণ কাজ ত্বরানিত করতে ২০১২ সালে এর খসড়া অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা।
এ প্রসঙ্গে নৌ পরিবহন মন্ত্রীর এক দায়িতশীল কর্মকর্তা জানান, দেশের প্রথম সমুদ্র বন্দর নির্মানে নৌ পরিবহন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধিনে সরকারী বেসরকারী অংশিদারীত্ব (পিপিপি) কার্যালয় একযোগে কাজ করছে এরপরও অর্থায়নে সমস্যা কাটছেনা। সরকারের প্রনীত নীতিমালা অনুযায়ী দাতাদের কাজ থেকে সুষ্পষ্ট প্রস্তাব পাওয়া যায়নি। এর ফলে বাস্তবায়ন সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না।
জানা গেছে, এখন পর্যন্ত ৬টি দেশ এ বন্দর নির্মাণে বড় অংকের বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে। দেশ গুলি হল ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত, নেদারল্যান্ড, ডেনমার্ক ও জামার্নি। সম্প্রতি আরব আমিরাত এর পক্ষ থেকে একটি প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। দেশটির দুবাই পোর্ট ওয়াল্ডের মাধ্যমে প্রস্তাবটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পেশ করা হয়। এভাবে বিভিন্ন দেশ আগ্রহ দেখালেও তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করা হয়নি।
মহেশখালীর এই সমুদ্র বন্দর নির্মানকারী আগ্রহী দেশ গুলি পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।
এই মেগা প্রকল্পে ১ হাজার কোটি ডলার প্রয়োজন। এই জন্য যৌথ ভাবে বিনিয়োগ দরকার। আর সম্ভাবনা যাচায়ের পর ১২ বছরের বেশী সময় লাগবে প্রাথমিক কার্যক্রম শেষ করতে।সর্বশেষ সম্ভাব্যতা যাচাই অনুযায়ী গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণে প্রথম পর্যায়ে ২২৩ কোটি ডলার প্রয়োজন এর মধ্যে পিপিপির আওতায় সম্পাদনযোগ্য ব্যয় ৭৬ কোটি ডলার। প্রকল্পে ব্যয়ের অবশিষ্ট ১০৪ কোটি ডলার ।এছাড়া রিংক প্রকল্পের জন্য অতিরিক্ত ৫৫ কোটি ৯০ লাখ ডলার অন্য উৎস থেকে সংগ্রহ করা যাবে। সব মিলে বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব তহবীল থেকে ২০১ কোটি ডলার সরবরাহ করা যাবে।
তিন পর্যায়ে এই বন্দর নির্মান শেষ করার লক্ষে ২০১০ সালের ২৬ আগষ্ট “সমুদ্র বন্দর সেল” নামের একটি সেল উদ্ভোধন করা হয়। ২০১১ সালের জানুয়ারীতে কাজ শুরু হয়ে ২০১৬ সাল নাগাদ প্রথম পর্যায়ের কাজ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা করা হয়। প্রথম পর্যায়ের নির্মান কাজ শেষ করতে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকার ব্যায় ধরা হয়। ২০৩৫ সাল নাগাদ ২য় পর্যায়ের এবং আগামী ২০৫৫ সাল নাগাদ নির্মাণ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।নৌ পরিবহণ মন্ত্রণালয় সুত্রে জানা গেছে, কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার সোনাদিয়ার গভীর সমুদ্র বন্দরটি নির্মাণ করা হলে মাত্র ১ শতাংশ আঞ্চলিক বানিজ্য সম্পন্ন হবে।দেশের আমদানী রফতানীর কাজে বাকী ৯৯ শতাংশ ব্যবহার করা যাবে।
পার্শ্ববর্তী দেশ গুলির পন্য পরিবহন কমাতে ও সময় বাচাঁতে গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মানের পরিকল্পনা হয়েছে। এজন্য ভারতে ৭ হাজার টিইউস, শ্রীংলকায় ৮ হাজার টিইউস ক্ষমতাসম্পন্ন কন্টেনারবাহী জাহাজ আসতে পারবে । কারন চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরের গভীরতা কম থাকায় বড় জাহাজ আসতে পারেনা। লাইটারেজ জাহাজের মাধ্যমে পণ্য গভীর সমুদ্র থেকে বন্দরে আনতে হয়। এছাড়া গভীর সমুদ্র বন্দর হলে পাশ্ববর্তি দেশ গুলির বন্দরের এর সাথে সংযোগ স্থাপিত হবে। গভীরতা কম থাকায় বর্তমানে বিভিন্ন দেশের বড় জাহাজ গুলো বন্দরে আসতে পারে না। সিঙ্গাপুরে পন্য খালাস করার পর সেটি ছোট জাহাজ করে বন্দরে আনা হয়। গভীর সমুদ্র বন্দরটি স্থাপিত হলে সরাসরি বড় জাহাজ গুলি বন্দরে ভিটতে পারবে।
ফলে সময় ও পরিবহন খরচ কয়েক গুন কমে যাবে। এর ফলে সবচেয়ে উপকারভোগি হবে দেশের তৈরী পোষাশ শিল্পসহ রফতানী খাত।সম্প্রতি সময়ে সরকারের ঘোষিত ৭টি মেঘা প্রকল্পের মধ্যে সোনাদিয়ার গভীর সমুদ্র বন্দেরর নাম না থাকায় মহেশখালীর মানুষ হতাশ হয়ে পড়েছে।মহেশখালী কুতুবজোমের তরুন ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি মোশাররফ হোসেন খোকন জানান,বন্দর না হয়ে যদি পর্যটনকেন্দ্র হয় সোনাদিয়া তাহলে এতোদিনে মহেশখালিবাসীর চেহারা পাল্টে যেতো।অন্যদিকে কুতুবজোম চেয়ারম্যান শফিউল আলম জানান,সরকার চাইলে মহেশখালি কে বিশ্ব দরবারে পরিচিতি গড়তে পারে একটা মডেল টুরিষ্ট এলাকা।
এ বিষয়ে মহেশখালী কুতুবদিয়ার স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ব আশেক উল্লাহ রফিক জানান,সরকারের বড় বড় পরিকল্পনা সব মহেশখালীকে ঘিরে,গভীর সমুদ্র বন্দর ও সোনাদিয়ার করার প্রস্তাব নিয়েছে, সরকার অবশ্যই বাস্তবায়ন করবেন এ প্রকল্প।
