রাজনীতি এখন ফেসবুক ও ড্রয়িংরুমে রাজপথ ফাঁকা

0

গোলাম শরীফ টিটু / গোলাম সরওয়ার :  গেল এক বছরের ব্যবধানে দেশের রাজনীতি অন্দরমুখী হওয়ায় এবার হাফ ছেড়ে বেঁচেছে এসএসসি পরীক্ষার্থীরা। দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির অভ্যন্তরে এখন ঘর গোছানোর তৎপরতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। আগামী দিনের রাজনৈতিক পথচলাকে সামনে রেখেছে যোগ্য নেতৃত্ব নির্বাচনের পথেই হাঁটছে দল তিনটি। আর একাত্তরে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে নিষিদ্ধ হওয়ার মুখে থাকা জামায়াত ইসলামী অনেকটাই অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। রাজনৈতিক সুত্র মতে, বাঙালীর ভাষার মাস ফেব্রুয়ারীতে এসএসসি পরীক্ষা, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের কর্মসুচীসহ বিভিন্ন কারনে রাজনীতিতে এ মুহুর্তে আন্দোলনের অপরিহার্যতা রয়েছে বলে মনে করেন না সরকার বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো।

আবার আগামী মার্চে দেশজুড়ে শুরু হচ্ছে স্থানীয় সরকারের ইউপি নির্বাচন। যা ধারাবাহিকভাবে চলবে জুন মাস পর্যন্ত। সদ্য সমাপ্ত পৌরসভা নির্বাচনের আদলে ইউপি নির্বাচনেও চেয়ারম্যান পদে প্রথমবারের মত দলীয় মনোনয়ন ও প্রতীক ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে ইতিমধ্যে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে রাজনৈতিক দলগুলো। ফলে আগামী দিনের আন্দোলন সংগ্রামকে টার্গেট করে সরকার বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতারা তৃনমুল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত ঘর গোছানোকেই এখন শ্রেয় মনে করছেন। একইভাবে সরকারী দলের নীতিনির্ধারকরাও সম্ভাব্য রাজনৈতিক ভবিষ্যত বা আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার চিন্তা মাথায় রেখে যোগ্য নেতৃত্ব নির্বাচনের মাধ্যমে দলকে সুসংগঠিত করাকে অধিক গুরুত্ব দিচ্ছেন। কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের একজন দায়িত্বশীন নেতা বলেন,’ দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠনের পর আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারকরা এখনই কেন্দ্র থেকে তৃনমুল পর্যন্ত দলকে সুসংগঠিত করাকে সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ন মনে করছেন।

রাজনীতি টিকে থাকবে দলের শক্ত ভিত্তির উপর। দল দুর্বল হলে রাজনীতি দুর্বল হতে বাধ্য। বিএনপি তার বড় প্রমান। আর আওয়ামী লীগ তো সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে গত সাত বছর ধরে রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। এ দেশের আন্দোলন সংগ্রাম অর্জন ব্যর্থতা সবকিছুতেই আওয়ামী লীগ পথপ্রদর্শকের ভুমিকা পালন করে আসছে। তাই যুগের সাথে তাল মিলিয়ে নেতৃত্ব নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আগামী দিনের রাজনীতির পথ প্রশন্ত করতে হবে। বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমানও দল পুনর্গঠন প্রক্রিয়াকেই এই মুহুর্তে প্রধান করনীয় বলে মত প্রকাশ করেছেন। তার মতে ওয়ান ইলেভেন ও তৎপরবর্তী আওয়ামী লীগের টানা সাত বছরের শাসনামলে মামলা হামলা নিপীড়ন নির্যাতনে বিএনপি নেতাকর্মীরা সংগঠিত হতে পারেনি। জনগন সরকারের অত্যচার নির্যাতনের জবাব দিতে মুখিয়ে থাকলেও সঠিক নেতৃত্ব খুঁজে পাচ্ছেন না। বিএনপিকে আশ্রয় কনে করলেও পলায়নপর নেতৃত্বের উপর ভরসা করতে পারছে না। এ জন্য আমরা দলকে সুসংগঠিত করার মাধ্যমে জনগনকে ঐক্যবদ্ধ করে আগামী দিনের সরকার বিরোধী আন্দোলনের ভিত রচনাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছে। দলের কর্মীবাহিনীকে পরিচালনার জন্য সঠিক নেতৃত্ব নির্বাচন করতে হবে। তারুন্য আর অভিজ্ঞতার সমন্বিত নেতৃত্বের মাধ্যমেই আগামী দিনে সরকার পতনের আন্দোলন বেগবান করতে হবে।

দলীয় সুত্রে জানা গেছে, আগামী মার্চ ও এপ্রিলে দেশের প্রথম সারির বড় তিনটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির জাতীয় কাউন্সিল আয়োজনের তোড়জোড় চলছে। প্রায় কাছাকাছি সময়ে অনুষ্টিতব্য তিন দলের জাতীয় কাউন্সিল নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সরগরম অবস্থা বিরাজ করছে। ইতিমধ্যে দলগুলো কাউন্সিল অনুষ্টানের সর্বাত্ত্বক প্রস্তুতিও সম্পন্ন করেছে। দলীয় নেতাকর্মীরাও কাউন্সিলকে ঘিরে নানমুখী তৎপরতা শুরু করেছে। জেলা পর্যায়ের সিনিয়র নেতাদের অনেকের দৌড়ঝাপ এখন ঢাকার দিকে। কেন্দ্রীয় কমিটির কোন পদে আসতেই চলছে তদবির লবিং।ক্ষমতার স্বাদ কিংবা মামলা হামলার ভয়ে যেসব নেতা এতদিন দল থেকে দুরে ছিল এখন তারাও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। বিএনপির অনেক নেতা দিন দিন প্রকাশ্য হচ্ছেন। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কাউন্সিল হবে ২৮ মার্চ। গত ৯ ফেব্রুয়ারী দলের কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকে সম্মেলনের এই তারিখ নির্ধারন করা হয়।

২০১২ সালের ডিসেম্বরে দলটির সর্বশেষ কাউন্সিল অনুষ্টিত হয়। ইতিমধ্যে ৬০টিরও বেশি জেলায় কাউন্সিল হয়েছে। মার্চের আগে অন্তত আরও ৭টি জেলার কাউন্সিল সম্পন্ন করার কথা রয়েছে। জাতীয় কাউন্সিলকে সামনে রেখে দেশের ৭৩টি সাংগঠনিক জেলার কাউন্সিল সম্পন্ন করা হচ্ছে। অপরদিকে বিএনপি ১৯ মার্চ জাতীয় কাউন্সিল করার প্রস্তুতি শুরু করেছে। ইতিমধ্যে দলটি বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র, সোহরাওয়ার্দি উদ্যান ও ইঞ্জিনিয়ার্স ইনষ্টিটিউশন এ তিনটির মধ্যে যে কোন একটি ভেন্যু বরাদ্দ পেতে আবেদনও করেছে। বিএনপির সর্বশেষ কাউন্সিল অনুষ্টিত হয় ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে। প্রায় ৭ বছর পর অনুষ্টিত হতে যাওয়া বিএনপির কাউন্সিলকে ঘিরে আলোচনায় থাকছে মহাসচিব ও দলটির স্থায়ী কমিটি। দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবার ভারমুক্ত হবেন নাকি অন্য কাউকে মহাসচিব করা হবে এটা নিয়ে দলটির অভ্যন্তরে চলছে জোর আলোচনা। এরশাদ-রওশনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি (জাপা) এপ্রিলে কাউন্সিল করবে বলে ইতিমধ্যে ঘোষনা দিয়েছেন। যদিও সম্প্রতি দলের মহাসচিব পদে রদবদল ও জিএম কাদেরকে কো চেয়ারম্যান করাকে কেন্দ্র করে দলের অভ্যন্তরে টানাপোড়েন চলছে।

এরশাদপন্থী ও রওশনপন্থী হিসেবে আলাদা দুটি পক্ষ গড়ে উঠেছে। দলীয় কাউন্সিলকে সামনে রেখে জাতীয় পার্টির অভ্যন্তরীন নাটকিয়তা ও দ্রুত মেরুকরন শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে ঠেকে তা পরিস্কার হতে হলে কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় যুদ্ধাপরাধের দায়ে দলের কয়েক শীর্ষ নেতার বিচার ও রায় কার্যকরের পর অস্তিত্ব রক্ষার সংকটে পড়েছে জাামায়াত। এদিকে আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার অথবা জাতীয় সংসদে বিল উপস্থাপনের মাধ্যমে জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ হতে পারে যে কোন সময়। এ বিষয়টি মাথায় রেখে দেশের দুয়েকটি জেলা ও কয়েকটি উপজেলা পর্যায়ে জামায়াত নেতারা বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের ব্যানারে জানান দিচ্ছে নিজের উপস্থিতি। রাজনৈতিক বোদ্ধামহলের মতে,’ মার্চ থেকে অনুষ্ঠিতব্য ইউপি নির্বাচন ও দলের কাউন্সিলকে সামনে রেখে প্রান ফিরে পাচ্ছে ঝিমিয়ে থাকা রাজনীতি। রাজপথ এখন প্রায় ফাঁকা, নেতারা ব্যস্ত ড্রয়িংর রুম রাজনীতি আর ফেসবুকে।

এ বিভাগের আরও খবর
আপনার মতামত লিখুন :

Your email address will not be published.